নির্যাতনের চিহ্ন, কোথাও পোড়ানো— ‘একই কায়দায়’ ফেলে রাখা ৯ নারীর মরদেহ

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮ PM
জোহানেসবার্গ

জোহানেসবার্গ © সংগৃহীত

‘আমরা কী করতে যাচ্ছি, আমার কোনো ধারণা নেই। কিন্তু কিছু একটা পরিবর্তন হতেই হবে’—নিজের ভাগনি দিনেও মোটাপানের হত্যার কথা স্মরণ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নকওয়ান্ডা মাতশিকিজা। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের জন্য, অন্য সব নারীর জন্যও; আর কতগুলো মরদেহ পাওয়া গেলে কিছু একটা ঘটবে?’

নিজেদের বাড়ি থেকে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছিলেন নকওয়ান্ডা। বাড়িটি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান শহর জোহানেসবার্গের কাছে অবস্থিত। আত্মীয়রা দিনেওর মরদেহ শনাক্ত করার মাত্র দুই দিন পর তিনি কথা বলেন। দুই সন্তানের ৩৮ বছর বয়সী মা দিনেওকে সর্বশেষ জীবিত দেখা গিয়েছিল রবিবার। পরে এখুরুলেনির একটি আবাসিক এলাকায় নির্যাতনের চিহ্নযুক্ত এবং আংশিকভাবে পুড়িয়ে দেওয়া অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দিনেওর মেয়েকে একসময় তার মায়ের মৃত্যুর খবর জানাতে হবে সেই কঠিন বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নকওয়ান্ডা।

তিনি বলেন, ‘আপনি কীভাবে বোঝাবেন যে তার অভিভাবককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, একটি মাঠে ফেলে রাখা হয়েছে এবং আবর্জনার মতো ফেলে দেওয়া হয়েছে? এটা মেনে নেওয়ার কোনো উপায় নেই। এমন কিছু, যার সঙ্গে কখনো নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন না, কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারবেন না।’

এ সপ্তাহে দিনেওর মৃত্যু এমন এক সময় ঘটেছে, যখন এখুরুলেনিতে একই ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এ সপ্তাহে সেখানে পাওয়া তিন নারীর মরদেহের একটি ছিল তার। মোট হিসেবে, জুলাই মাস থেকে এ অঞ্চলে একই ধরনের পরিস্থিতিতে নয়জন নারীর মরদেহ পাওয়া গেছে।

সমস্যাটি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এসব ভয়াবহ উদ্ধারের ঘটনা আবারও দেশজুড়ে নারী নির্যাতনের ব্যাপকতা নিয়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বের অন্যতম উচ্চ হারে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। থেম্বা কেকানাও প্রিয়জন হারানোর শোক ও আঘাতের মধ্যে দিন পার করছেন। তার বোন ইতুমেলেং ছিলেন এখুরুলেনিতে নিখোঁজ হওয়া প্রথম কয়েকজনের একজন।

৩২ বছর বয়সী ওই দোকানকর্মীর মরদেহ জুলাই মাসে উদ্ধার করা হয়। তাকে সর্বশেষ জীবিত দেখার ১৭ দিন পর মরদেহটি পাওয়া যায়।
তার শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। আংশিক পোশাক পরিহিত অবস্থায় তাকে একটি সেতুর ওপর ফেলে রাখা হয়েছিল। আমরা শোকে ভেঙে পড়েছি,’ বলেন থেম্বা। তার ভেজা চোখে অশ্রু ঝিলমিল করছিল।

তিনি বলেন, ‘আমার বোনের ছোট মেয়ের দিকে তাকালে আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি জানি, তার এই কষ্ট আমি কখনোই দূর করতে পারব না। কোনো পরিবারেরই আমাদের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।’

হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রথম মরদেহ ১৫ জুলাই উদ্ধারের দুই দিন পর তাকে আটক করা হয়। ইতুমেলেং, দিনেও বা এখুরুলেনির অন্য ছয় নারীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আর কাউকে আটক করা হয়নি।

ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই ছিলেন তরুণী। তাদের বয়স ২০ বা ৩০-এর কোঠায়। প্রায় সবাই মৃত্যুর আগে ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, তারা নিশ্চিত নয় যে এখানে কোনো সিরিয়াল কিলার জড়িত কি না। ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নাও হতে পারে। সতবে যেভাবেই দেখা হোক, দক্ষিণ আফ্রিকার বৃহত্তম শহরের পূর্বে অবস্থিত এই আবাসিক জেলায় যা ঘটেছে, তা পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছে। অনেকের মতে, এটি একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ প্রতি তিন মাস পরপর বিস্তারিত অপরাধ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এ বছরের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে পাঁচ হাজার ৪২৭ জন নিহত হয়েছেন বলে সেই পরিসংখ্যানে দেখা যায়। সরকারি তথ্যগুলোতে ভুক্তভোগীদের লিঙ্গভেদে আলাদা করে দেখানো হয় না।

তবে এ সপ্তাহে দেশটির মানবাধিকার কমিশন জানিয়েছে, ওই সময়ে ৫৬৯ জন নারী নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ছয়জন নারী নিহত হয়েছেন। এছাড়া এক হাজার ৫২ জন নারী হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন। অনেক নারী, যারা আগে থেকেই নিজেদের অনিরাপদ মনে করতেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

একই সঙ্গে বিষয়টি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। মন্ত্রীরা এক বছরেরও কম সময় আগে সমস্যার ব্যাপকতা স্বীকার করে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করেছিলেন।

গত নভেম্বরে এ ঘোষণা দেওয়ার সময় সমাজ উন্নয়নমন্ত্রী নকুজোলা সিসিসি তোলাশে বলেছিলেন, বিষয়টিকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করলে সরকার সংকট মোকাবিলায় সহায়তা পাবে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ হয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ‘উইমেন্স শাট ডাউন’ মিছিল। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় জি২০ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। এ সপ্তাহে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবিতে অনেকে কণ্ঠস্বর উঁচু করেছেন।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার নারীদের সুরক্ষার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে নারী-হত্যাকে একটি পৃথক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

এক বিবৃতিতে সংগঠনটির দেশীয় পরিচালক শেনিলা মোহাম্মদ বলেন, ‘প্রতিদিন নারী-হত্যাকে আলাদা অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া মানে নারীদের লক্ষ্য করে হত্যার বিষয়টি মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়া। এটিকে এর প্রকৃত নামে ডাকার সময় এসেছে: নারী-হত্যা। নারী-হত্যা একটি লিঙ্গ-প্রণোদিত অপরাধ। একজন নারীকে নারী হওয়ার কারণেই হত্যা করা হয়।’

অ্যামনেস্টি বলছে, আফ্রিকার গ্যাবন ও মরক্কোসহ ৩৩টি দেশে নারী-হত্যা একটি নির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে আইনগতভাবে স্বীকৃত। দক্ষিণ আফ্রিকায় এমন পরিবর্তন আনা হলে সমস্যাটির ব্যাপকতা বোঝার দিকে আরও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

মোহাম্মদ বলেন, ‘এটি রাষ্ট্রকে নারীদের ও মেয়েদের সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে বাধ্য করবে। যা আপনি পর্যবেক্ষণই করছেন না, তা আপনি ঠিক করতে পারবেন না। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় সবাই একমত যে আরও অনেক কিছু করা প্রয়োজন।

প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এ সপ্তাহে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে এখুরুলেনির অপরাধগুলোর তদন্তে ‘কোনো দিকই অযত্নে রাখা হবে না’।একটি জাতি হিসেবে নারীদের ও মেয়েদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার পক্ষে আমাদের দাঁড়াতে হবে।’

লিঙ্গ ও সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক কর্মী লেবোগাং রামোফোকো বলেন, দেশে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা আরও বড় একটি সমস্যার লক্ষণ। আর তা হলো মানবিকতার প্রতি অবহেলা। এই দেশে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের দেহকে বহুদিন ধরে ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়ার মতো মনে করা হয়েছে। উপনিবেশবাদ থেকে শুরু করে বর্ণবৈষম্যের যুগ পর্যন্ত এর উত্তরাধিকার চলে এসেছে। তিনি ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান আইনগত বর্ণবাদী ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করছিলেন।

তিনি বলেন, ‘নারীদের সঙ্গে যা ঘটছে, তা সেই সব ব্যবস্থার সহিংস উত্তরাধিকারের প্রমাণ, যেসব ব্যবস্থার সৃষ্টি করা মানসিক ক্ষতের কখনো সমাধান হয়নি। এতে এই কথা বলা হচ্ছে না যে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষরা স্বভাবগতভাবে সহিংস। কিন্তু এমন ব্যবস্থায়, যেখানে কয়েক দশক ধরে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রয়োগ করা হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ নারীরাই সেই সহিংসতার প্রধান লক্ষ্য হয়েছেন। সেই চক্র এখনো ভাঙা যায়নি।’

এখুরুলেনির কেম্পটন পার্ক এলাকায় সাম্প্রতিক নয়টি মরদেহের মধ্যে পাঁচটি পাওয়া গেছে। লুমকা মাকহুবেলা গার্ল২উম্যান ফাউন্ডেশনের সদস্যরা সংগঠনের পক্ষ থেকে অপরাধগুলোর বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে বিক্ষোভ করেছেন। আমরা শোকাহত, আমরা ভীত। পুলিশ যদি আর আমাদের সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে সরকারের এগিয়ে এসে কিছু করা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে আমরা নিরাপদ নই। পুলিশ আমাদের শুধু আরও সতর্ক থাকতে বললে হবে না। আমাদের সম্প্রদায়গুলোকে নিরাপদ করতে তাদের আরও বেশি কিছু করতে হবে। আর আমরা কী করব? আমরা কোথাও নিরাপদ নই। ঘরেও না, রাস্তাতেও না। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। ৩২ বছর বয়সী থুলিসিলে সিবান্দে বলেন, ‘আমি অস্বস্তি বোধ করি।’

তিনি বলেন, ‘দোকানে গেলেও আমাকে চারপাশে তাকাতে হয়। আমি হতবাক এবং ভীত। এতটাই ভীত যে এটা একধরনের মানসিক আঘাত। 

৬০ বছর বয়সী থেম্বি মাবেনা বলেন, তিনি দিনেও মোটাপানের একই এলাকায় বাস করতেন। সে প্রতিদিন সবার সঙ্গে হাসত। এখন আমি উদ্বিগ্ন। আমি অনেক শিশু ও মেয়েকে চিনি, যারা বলে একা দোকানে যেতে তারা ভয় পায়। কোনো নিরাপত্তা নেই, আমার জন্যও নয়। আমি বয়স্ক, কিন্তু আমার জন্যও কোনো নিরাপত্তা নেই। দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীরা আর নিরাপদ নন,’ সংক্ষেপে বলেন ২০ বছর বয়সী লেরাতো মজিজি।

কুবি শিক্ষিকার ছেলের মরদেহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে উদ্ধার
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‎জবির দ্বিতীয় গেট জুড়ে বাসের সারি, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে চাকরি, আবেদন ৫ অক্টোবর পর্যন্ত
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‎কে হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মনোনীত জাবি সিন্ডিকেট সদস্য?
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ব্যাটে-বলে ব্যর্থ সাকিব, হারল দলও
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নির্যাতনের চিহ্ন, কোথাও পোড়ানো— ‘একই কায়দায়’ ফেলে রাখা ৯ না…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬