ইরান যুদ্ধের বোঝা বইছে বাংলাদেশ-ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটি মানুষ

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৮ AM
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় © সংগৃহীত

ইরানে মার্কিন আগ্রাসনের প্রায় ৭ মাসে বিশ্বজুড়ে এ সংঘাতের প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে খাদ্যসহ কৃষি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ‘উটকো’ ঝামেলার মধ্যে পড়ে গেছে বিশ্বের জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশগুলো। যার প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমশ বেড়েছে বিশ্বের ২৩ শতাংশ মানুষের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ এশিয়া। বিশ্বের মাত্র ৩ শতাংশ জায়গা দখল করা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বসবাস। আর এ দেশগুলো প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে জ্বালানির জন্য আমদানির উপর নির্ভর করত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরাসরি এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে।

দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত ইরান যুদ্ধের কারণে একের পর এক সরবরাহ পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এখন চার দেশই এর প্রভাব অনুভব করছে। জ্বালানি সরবরাহে চাপের পাশাপাশি বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়।

ভারত তার ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। যুদ্ধের আগে ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী। অন্যদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির অন্যতম প্রধান উৎস কাতার। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় এই সবকটি উৎস এখন কার্যত বন্ধ। যে কারণে ১৪৮ কোটির বিপুলসংখ্যক মানুষের মুখে দু বেলা অন্ন তুলে দিতে প্রয়োজনীয় জ্বালানির সংকুলান করতে হিমশিম খাচ্ছে ভারত।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় ভারতের জ্বালানি সরবরাহের উৎস তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময়। রাশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। যে কারণে তাদের হাতে বিকল্প থাকলেও সেগুলোর সরবরাহ পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

অন্যদিকে পাকিস্তানও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটির অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও এলএনজির চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী। আর দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারী হিসেবে কাতার গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন রয়েছে। তবে দেশে গ্যাসের উৎপাদন চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ক্রমেই আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কাতার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী। পাশাপাশি বাংলাদেশ পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যও আমদানি করে।

নেপালের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরাসরি অপরিশোধিত তেল বা এলএনজি আমদানি করে না। স্থলবেষ্টিত দেশটি প্রায় সব পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য—পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও এলপিজিসহ—ভারতের ওপর নির্ভর করে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সংকট নেপালে সরাসরি নয়, বরং ভারতের সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে প্রভাব ফেলে। ভারতে জ্বালানির দাম বা সরবরাহে চাপ তৈরি হলে তা দ্রুত নেপালের জ্বালানি সরবরাহ ও দামে প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিমাণের দিক থেকে ভারতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিকল্প সরবরাহের সুযোগ কম। নেপালের ক্ষেত্রে নির্ভরতা এক ধাপ পরোক্ষ হলেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব দ্রুত নেপালের বাজারে পৌঁছাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে তৈরি হওয়া সংকটের চাপ দরিদ্র ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষদের ওপর পড়েছে বেশি। পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর করাচির ৪৫ বছর বয়সি গৃহকর্মী সাজিদা জিবরান দীর্ঘ সময় কাজ করেন একটি অভিজাত এলাকায়। তার স্বামী অসুস্থতার কারণে আর কাজ করতে পারেন না। তাদের তিন সন্তান স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে পড়াশোনা করে।

সাজিদা জানান, গত বছরের শেষ দিকে তার বাসাভাড়া ছিল ১৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি। গত মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার রুপিতে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের আগে সবাই খেতে ও পান করতে পারত। আমি মাংস, মুরগি কিনতে পারতাম। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সবজিও এত ব্যয়বহুল হয়ে গেছে যে কেনা কঠিন।’

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিলও বেড়েছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, আগে বিদ্যুতের বিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ রুপি আসত, এখন তা শুরুই হয় ৫ হাজার রুপি থেকে। গ্যাসের বিলও কমপক্ষে ২ হাজার রুপি।

সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত হিসেবে সন্তানদের স্কুলের বেতন দেওয়া বন্ধ করার কথা জানান সাজিদা। তার ভাষায়, ‘আমি সবসময় চেয়েছি আমার সন্তানরা পড়াশোনা করবে, ভালো শিক্ষা পাবে এবং ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবে। এখন আমার পক্ষে কেবল খাবারের ব্যবস্থা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এর বাইরে তাদের জন্য খুব কমই করতে পারছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার সন্তানদের বাড়িতে বসে থাকতে দেখলে, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারলে দিন-রাত কোনো সময়ই ঘুমাতে পারি না। আর্থিকভাবে নিজেকে পুরোপুরি অসহায় মনে হচ্ছে।’

একই পরিস্থিতির শিকার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পাশের শহর নয়ডায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করা ৬৭ বছর বয়সি বালেন্দ্র সিং। ছোট একটি কক্ষে পরিবারের আরও ছয় সদস্যের সঙ্গে থাকেন তিনি।  ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শহরের ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার খরচ কমাতে পরিবারের কয়েকজনকে উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষ্ণৌতে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি।

সিং বলেন, ‘আজ বড় শহরে এত মানুষের খাবারের খরচ চালানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি আমাদের ওপর প্রভাব ফেলেছে। দাম বাড়ায় সবকিছুই এখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, অথচ আমাদের বেতন একই আছে।’

তার নিজের কোনো যানবাহন নেই। কাজে যাতায়াতের জন্য রিকশা ব্যবহার করতে হয়। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে রিকশা ভাড়াও বেড়েছে বলে জানান তিনি। সিং বলেন, ‘রিকশার ভাড়া বেড়েছে। এমনকি পাঁচ টাকা বাড়লেও আমাদের জন্য সেটি অনেক বড় বিষয়। কারণ মাসে যাতায়াতের খরচ প্রায় ৩০০ রুপি বেড়ে যায়।’

পরিবারের ব্যয় সামলাতে খাবারের তালিকাতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে তাকে। তিনি জানান, এখন সপ্তাহে তিনবারের পরিবর্তে একবার মাছ খান এবং রান্নায় পেঁয়াজের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছেন।

যুদ্ধের শুরুর দিকে এলএনজি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে তিনি ও তার প্রতিবেশীরা কাঠের পুরোনো জ্বালানি ব্যবহার শুরু করেছিলেন। এতে ধোঁয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জানলেও বিকল্প ছিল না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানরা ইরানে হামলা করেনি। আমার সন্তানরা এই যুদ্ধকে সমর্থনও করে না। কিন্তু দূরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বোঝা আমাদের বহন করতে হচ্ছে। দাম বাড়ার প্রভাব থেকে আমাদের রক্ষা করতে আমি সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।’

বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও জটিল। কেননা দেশটিতে ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর জনগণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য দায়িত্ব নেওয়া অন্তবর্তীকালীন সরকার পরিস্থিতি কিছুটা সামাল ‍দিতে পারলেও বিগত আমলের আর্থিক লুটপাট পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তারওপর সদ্য দায়িত্ব নেওয়া সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরেই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হয়েছে। যে কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। 

রাজধানী ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন দুই সন্তানের মা আসমা বেগম। একটি বাসায় থালা-বাসন ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালির কাজ করে মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। তবে আরও বেশি আয় করতে চাইলেও গৃহকর্মের সুযোগ কমে গেছে বলে জানান তিনি। আসমা বলেন, ‘ধনী মানুষও আর্থিক চাপে আছেন। তারা গৃহকর্মী না রেখে নিজেরাই ঘরের কাজ সামলানোর চেষ্টা করছেন।’

তার মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার প্রভাব এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে ছড়িয়ে পড়ছে। বেশি খরচের কারণে পরিবারগুলো গৃহকর্মীর মতো সেবায় ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে। এতে নিম্নআয়ের মানুষের কাজের সুযোগও কমছে। তিনি বলেন, ‘সবারই একই সমস্যা। আমরা সবাই কাজ করে বেঁচে আছি।’

আসমা জানান, তার বাবা-মা বরিশালের একটি এলাকায় থাকেন। তার বাবা ও ভাই একই এলাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তার মা ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও একটি মেসে রান্নার কাজ করেন। আসমার ভাষায়, ‘তারা একইভাবে সংগ্রাম করছেন।’

আর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর গৌশালা এলাকায় মালামাল বহনের কাজ করেন ৫৮ বছর বয়সি জ্ঞানু বাসন্ত। ১৫ বছর বয়সি এক সন্তান ছাড়াও তার ওপর বৃদ্ধ বাবা ও ভাই-বোনদের দায়িত্ব রয়েছে। বাসন্ত কখনো স্কুলে পড়াশোনা করেননি। কাজের সন্ধানে তাকে কাঠমান্ডুতে আসতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আগে আমরা কৃষিকাজ করতাম। কিন্তু বানরের কারণে কৃষিকাজ করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া গ্রামের একটি সমবায় প্রতিষ্ঠান আমার বাবার জীবনের সঞ্চয় আত্মসাৎ করেছে।’

বর্তমানে মূলত মালামাল বহনের কাজ করেন তিনি। এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডারসহ বিভিন্ন ধরনের ভার বহন করতে হয় তাকে। তবে নিয়মিত কাজ পান না। বাসন্ত বলেন, ‘আমি প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা আয় করি। তবে নির্দিষ্ট আয় নেই। কাজ কম থাকলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতেও কষ্ট হয়।’

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি নিজে রান্না না করে কম খরচের রেস্তোরাঁয় খাবার খান। এতে পরিবারকে আগের মতো টাকা পাঠাতে পারছেন না। তিনি জানান, একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান তার মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করছে। তার বাবা বয়স্ক ভাতার টাকা দিয়ে চলেন। বাসন্ত বলেন, ‘আমি যা সঞ্চয় করতে পারি, তা দিয়ে মেয়ের জন্য কাপড় ও উপহার কিনি এবং পরিবারকে যতটা সম্ভব সহায়তা করি।’

৯৬ বছর বয়সে পদত্যাগ করলেন ওয়ারেন বাফেট
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘আপনাদের কাছে হাত জোড় করছি আমার ছেলেকে বাঁচান’— কুবি শিক্ষি…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডিবি-ডিজিএফআই পরিচয়ে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা, গ্রে…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইরান যুদ্ধের বোঝা বইছে বাংলাদেশ-ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কো…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শুরু কাল
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সুইডেনের জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী জোটের জয়, স্বস্তিতে অভিবাসী…
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬