এসএসসি-২০২৬
আতাউর রহমান সায়েম, সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা), মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ © ফাইল ফটো
এসএসসি পরীক্ষায় বাংলা ১ম পত্র বিষয়ে ভালো নম্বর পাওয়ার কিছু কৌশল আছে। কীভাবে পাবে, তা জেনে নাও। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি যেহেতু একটি বিশেষ ধরনের পরীক্ষাপদ্ধতি, এর উত্তর লেখার কৌশলও বিশেষ ধরনের। তাই উত্তর হবে সুনির্দিষ্ট, পরিমিত ও প্রাসঙ্গিক। পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিয়েছেন রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা) আতাউর রহমান সায়েম।
এসএসসি পরীক্ষা শুরু হতে আর মাত্র দুই দিন বাকি আছে। আশা করি তোমাদের প্রস্তুতি এর মধ্যেই গুছিয়ে নিয়েছ। আমি তোমাদের প্রস্তুতিকে আর একটু সহজ করার জন্য বাংলা প্রথম পত্র বিষয়ে কিছু পরামর্শ তুলে ধরছি। তোমরা বেশি টেনশন না করে সিলেবাস অনুযায়ী বোর্ড-বইয়ের অধ্যায়গুলো ভালোভাবে রিভিশন দিবে।
অধ্যায়ের ভিতরে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বাক্য কিংবা চরণ রয়েছে, সেগুলোর অর্থসহ ব্যাখ্যা দেখে হবে এবং প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে যেসব শব্দার্থ, টীকা, পাঠের উদ্দেশ্য ও পাঠ-পরিচিতি রয়েছে, সেগুলো ভালোভাবে পড়ে নিবে। কেননা, জ্ঞান স্তর ও অনুধাবন স্তররের প্রশ্নগুলো সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত সংশ্লিষ্ট অধ্যায় থেকে আসবে। আর প্রয়োগ স্তর ও উচ্চতর দক্ষতা স্তরের প্রশ্নগুলো উদ্দীপক ও বইয়ের সংশ্লিষ্ট অধ্যায় মিলে হবে। তাই এক্ষেত্রে ভালো করে প্রস্তুতি নিতে চাইলে বইয়ের একটি অধ্যায় পড়ার পর ওই অধ্যায়ের কয়টি দিক রয়েছে এবং যেসব চরিত্র রয়েছে, সেগুলোর কার কী ভূমিকা রয়েছে তা ভালোভাবে আত্মস্থ করে নিবে।
তোমার জানো যে, প্রত্যেক উদ্দীপকে চিন্তন দক্ষতার চারটি স্তরের প্রশ্ন থাকে। পরীক্ষার খাতায় উত্তরপত্রে নিম্নো পরামর্শগুলো অনুসরণ করলে তোমাদের ভালো ফল অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
ক. জ্ঞানমূলক—অধ্যায়ের ভিতর থেকে সাধারণত সরাসরি আক্ষরিক অর্থে যেগুলো এক কথায় প্রশ্নোত্তর হয়, সেখান থেকে জ্ঞান স্তরের প্রশ্ন হবে। এ স্তরের মান-বণ্টন হবে— খাতার মধ্যে শুধু একটি শব্দ দিয়ে জ্ঞান স্তরের আক্ষরিক অর্থটির উত্তর না লিখে বাক্যে লেখার চেষ্টা করবে।
খ. অনুধাবনমূলক—প্রশ্নপত্রে অনুধাবন স্তরের মান ‘২’ লেখা থাকলেও তোমরা দুটি অংশে উত্তর লিখবে। অর্থাৎ প্রথম অংশে জ্ঞান স্তরের ১ নম্বরের জন্য একটি বাক্যে ভাবার্থে এবং দ্বিতীয় অংশে অনুধাবন স্তরের ১ নম্বরের জন্য বইয়ের নির্দিষ্ট অধ্যায়ের আঙ্গিকে ৩-৪টি বাক্যের মধ্যে উত্তর লিখবে।
গ. প্রয়োগমূলক— প্রয়োগ স্তরের মান-বণ্টন ৩ (জ্ঞান স্তর=১, অনুধাবন স্তর=১ ও প্রয়োগ স্তর=১)। তোমরা উত্তরে জ্ঞান স্তরটি একটি বাক্যে লিখবে বই ও উদ্দীপকের ক্রসের ভাবানুবাদে, দ্বিতীয় প্যারায় অনুধাবন স্তরটি ৫-৬টি বাক্যে লিখবে বইয়ের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের আঙ্গিকে এবং তৃতীয় প্যারায় প্রয়োগ স্তরটি ৫-৬টি বাক্যে লিখবে আলোচ্য উদ্দীপক থেকে (উদ্দীপকের কথা হুবুহু লেখা যাবে না, নিজের ভাষায় বর্ণনা করতে হবে) এবং ওই প্যারার শেষে তাই বলে প্রয়োগের জ্ঞানটি অর্থাৎ বই ও উদ্দীপক উভয় জায়গাতে যে দিকটি ফুটে উঠেছে কিংবা যে চরিত্রের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে, সেটা ১ বাক্যে মিলে লিখলে ভালো হবে। এভাবে তিনটি স্তর তিনটি প্যারায় লেখা উত্তম হবে।
ঘ. উচ্চতর দক্ষতামূলক—উচ্চতর দক্ষতা স্তরের মান-বণ্টন ৪ (জ্ঞান স্তর = ১, অনুধাবন স্তর = ১, প্রয়োগ স্তর = ১ ও উচ্চতর দক্ষতা = ১)। তোমরা উত্তরে জ্ঞান স্তরটি কারণসহ ১-২ বাক্যে লিখবে সিদ্ধান্তের ভাব অনুযায়ী। দ্বিতীয় প্যারায় অনুধাবন স্তরটি ৫-৬টি বাক্যে লিখবে বইয়ের নির্দিষ্ট অধ্যায়ের আঙ্গিকে, তৃতীয় প্যারায় প্রয়োগ স্তরটি ৫-৬টি বাক্যে লিখবে প্রদত্ত উদ্দীপক থেকে এবং চতুর্থ প্যারায় উচ্চতর দক্ষতার স্তরটি ৫-৬টি বাক্যে লিখবে বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশ এবং উদ্দীপকের অংশের সমন্বয় সাধন করে জ্ঞান স্তরে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা উল্লেখ করে।
এখানে চারটি প্যারা করলে ভালো হয়। ‘ঘ’ নম্বর প্রশ্নোত্তরের জ্ঞান স্তরের উত্তরটিও খুবই সাবধানে দিতে হবে। কেননা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলে ওই প্রশ্নের অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতার দক্ষতা স্তরের ভুল উত্তরের প্রভাব পড়বে। তখন হয়ত পরীক্ষকগণ ওই প্রশ্নোত্তরে খুবই কম নম্বর এমনকি শূন্য নম্বর দিতে পারেন। ‘ঘ’ নম্বর প্রশ্নে উচ্চতর দক্ষতা স্তরের মধ্যে জ্ঞানের উত্তরের সঙ্গে কারণটি লেখা উত্তম হবে। আর হ্যাঁ, মূলভাব কিংবা চরিত্র নিয়ে উদ্দীপক তৈরি হলে উচ্চতার দক্ষতা স্তরের প্রশ্নোত্তরে শেষ প্যারায় প্রাসঙ্গিক নৈতিকতার কোনো কথা এক বাক্যে লিখলে আরও ভালো হবে।
২০২৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় বাংলা প্রথম পত্রের লিখিত সৃজনশীল প্রশ্নে গদ্য ও কবিতা—এ দুটি বিভাগ থেকে মোট ৮টি সৃজনশীল প্রশ্ন থাকবে। গদ্য অংশ থেকে ন্যূনতম দুটি, কবিতা অংশ থেকে ন্যূনতম দুটিসহ মোট ৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তাই একজন পরীক্ষার্থীকে ৫০ নম্বরের পূর্ণ উত্তরে একটি উদ্দীপকের চারটি প্রশ্নোত্তরের (ক, খ, গ আর ঘ) জন্য প্রায় ৩৫টি বাক্যে গড়ে ২২ মিনিট সময় ভাগ করে নিলে ভালো হবে; অন্যথায় বাকি উত্তরগুলো ঠিকভাবে লিখে রিভিশন দেওয়ার সুযোগ পাবে না।
আরও পড়ুন : শেষ মুহুর্তে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য করণীয়
সৃজনশীল উত্তর লেখার সময় (ক, খ, গ ও শেষে ঘ নম্বর প্রশ্নের উত্তর) ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা করবে। আর গ—বিভাগে সহপাঠে (‘১৯৭১’ উপন্যাস) সংক্ষিপ্ত (৩ নম্বর) ও বর্ণনামূলক (৭ নম্বর) উত্তরের প্রাসঙ্গিতা ও উত্তরের পরিধির দিকে গুরুত্ব দিবে। আর বানানের ব্যাপারে সব লিখিত প্রশ্নোত্তরে খুব সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে ‘ক’ নম্বর প্রশ্নের জ্ঞান স্তরের উত্তরে বানান ভুল হলে সাধারণত নম্বর দেওয়া হয় না। সম্মানিত ব্যক্তির নামের পরিবর্তে সম্ভ্রাত্মক সর্বনামে তাঁর বানানে চন্দ্রবিন্দু (ঁ) দিতে হবে। যেকোনো কবিতা/প্রবন্ধ/গল্পের নাম লিখতে হলে অবশ্যই উদ্ধরণ চিহ্ন (যেমন—‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতা) দেওয়া উচিত। অন্যান্য বিরামচিহ্নের ব্যাপারেও ঠিকভাবে লক্ষ রাখতে হবে। কেননা শুদ্ধভাবে বিরামচিহ্নের ব্যবহার না করলে অনেক সময় অর্থ পরিবর্তন হতে পারে।
এবার বহুনির্বাচনি অংশ নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। তোমাদের পাঠ্যপুস্তক ভালোভাবে পড়া থাকলে বহুনির্বাচনি প্রশ্নে সর্বোৎকৃষ্ট উত্তর নির্বাচন করতে তেমন সমস্যা হবে না বলে মনে করি। তবে বহুপদী সমাপ্তিসূচক ও অভিন্ন তথ্য ভিত্তিক অংশে অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা স্তরে একাধিক অপশন থাকতে পারে বলে একটু কঠিন মনে হতে পারে; অবশ্য ঠান্ডা মাথায় ভেবে উত্তর নির্বাচন করলে তেমন কোনো কঠিন মনেই হবে না বলে আশা করি। ২০২৬ সালে বহুনির্বাচনি প্রশ্নপত্রে গদ্যাংশ (১৫টি) ও কবিতাংশ (১৫টি) থেকে মোট ৩০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন থাকবে। এই ৩০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন থেকে তোমরা ৩০টির উত্তর ওএমআর—এ বৃত্ত ভরাট করবে। আর বহুনির্বাচনি পরীক্ষার সময় একটি প্রশ্নোত্তরে কখনই একাধিক বৃত্ত ভরাট করবে না, ফ্লুয়িড ব্যবহার করবে না কিংবা ব্লেড দিয়ে ভুল উত্তরটির আস্তরণ তুলে 0MR-এ নতুন বৃত্ত ভরাট করবে না এবং ভাজ করবে না।
পরিশেষে বলতে চাই—তোমাদের পাঠ্য-পুস্তক খুব ভালো করে পড়তে হবে এবং সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কেও ঠিক নিয়ম জানতে হবে। পরীক্ষায় যেকোনো উদ্দীপক/ দৃশ্যকল্প এবং প্রশ্ন দেওয়া হোক না কেন, পাঠ্য-পুস্তকের প্রতিটি অধ্যায়ের শিখনফল ভালোভাবে আত্মস্থ করা থাকলে ভালো মানের উত্তর দেওয়া তোমাদের পক্ষে খুব সহজ হবে। পরীক্ষার খাতায় হাতের লেখা সুন্দর করার চেষ্টা করবে, শুদ্ধ ও যথার্থভাবে প্রাসঙ্গিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে এবং শেষে রিভিশন দেওয়ার চেষ্টা করবে। তাহলেই আশা করি—তোমরা পরীক্ষায় অর্জন করতে পারবে কাঙ্খিত ফল। আর তোমাদের প্রতি আমার সেই আর্শীবাদই রইল।