সেন্ট গ্রেগরী অধ্যক্ষের পরামর্শ
ব্রাদার প্লাসিড পিটার রেবেইরো সিএসই © টিডিসি সম্পাদিত
আগামী মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে শুরু হচ্ছে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শেষ সময়ের প্রস্তুতি ও পরীক্ষার সময়—আগ মূহুর্তে করণীয় নিয়ে পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিয়েছেন রাজধানীর সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রাদার প্লাসিড পিটার রেবেইরো সিএসই।
এসএসসি পরীক্ষা শুরু হতে বাকি মাত্র কয়েক দিন। এই সময়ে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি কোন বিষয়ের ওপর ফোকাস করা উচিত?
অধ্যক্ষ: এত দিনের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ টপিক; বোর্ড প্রশ্ন ও নিজের দুর্বল জায়গা। এই তিনটি জায়গায় ফোকাস করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। পুরো সিলেবাস নতুন করে ধরার চেষ্টা না করে, যেগুলো বারবার পরীক্ষায় আসে, সেগুলো আয়ত্ত করা জরুরি। এই শেষ মুহূর্তে নতুন করে কিছু শিখতে না গিয়ে তোমরা যে বিষয়গুলো আগে পড়েছ সেগুলোর ওপরই সবচেয়ে বেশি ফোকাস কর। বিশেষ করে প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো এবং যেখান থেকে বারবার প্রশ্ন আসে, সেগুলোর ওপর জোর দাও।
এখন নতুন কিছু পড়া উচিত, নাকি আগের পড়া রিভিশন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
অধ্যক্ষ: এখন নতুন কিছু শুরু করা অনেকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ পরীক্ষায় ভালো করতে ভুল না করা—বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ‘নতুন শেখা’ নয়। তাই অবশ্যই আগের পড়া রিভিশন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে নতুন কিছু শিখতে গেলে তোমাদের মস্তিষ্কে চাপ পড়বে এবং আগের শেখা বিষয়গুলো ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তাই যা পড়েছ, সেগুলো বারবার অনুশীলন কর।
জিপিএ-৫ পেতে হলে একজন শিক্ষার্থীর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
অধ্যক্ষ: প্রতিদিন ২-৩টি বিষয় রোটেশন করে পড়া; বোর্ড প্রশ্ন ও টেস্ট পেপার সমাধান করা; সময় ধরে মডেল টেস্ট দেওয়া (সম্ভব হলে স্কুল ড্রেস পরে) নিজের ভুলগুলো নোট করে ঠিক করা, আগের নোট রিভিশন দেওয়া; লেখা অনুশীলন (বিশেষ করে সৃজনশীল প্রশ্ন, প্রতিটি স্তরের প্রশ্নের জ্ঞান যেন নির্ভুল হয়); শুধু পড়া নয়, লেখার গতি ও নির্ভুলতা বাড়ানোই এখানে মূল চাবিকাঠি।
পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীরা সাধারণত কী ধরনের ভুল বেশি করে?
অধ্যক্ষ: প্রশ্ন ভালোভাবে না পড়ে তাড়াহুড়ো করে লেখা: অনেকে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই উত্তর লেখা শুরু করে দেয়, যার ফলে অনেক সময় মূল প্রশ্ন বুঝতে ভুল হয়। এতে সৃজনশীল প্রশ্নের প্রয়োগ স্তরের উত্তর এবং উচ্চতর দক্ষতার ভুল হয়ে যায়—যা বেশি নম্বর প্রাপ্তির অন্তরায়।
সময় ঠিকমত ভাগ না করা; একটি প্রশ্নে বেশি সময় দিয়ে অন্যগুলো অসম্পূর্ণ রাখা; অপ্রাসঙ্গিক লেখা (যা নম্বর বৃদ্ধি করে না); বানান ও উপস্থাপনায় ভুল; সঠিক প্রশ্ন নির্বাচন না করা।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা—দুশ্চিন্তার কারণে জানা উত্তরও ভুলে যায় অথবা লিখতে পারে না; হাতের লেখা অস্পষ্ট হওয়া—দ্রুত লিখতে গিয়ে হাতের লেখা খারাপ হয়ে যায়, যা পরীক্ষকের পক্ষে পড়া কঠিন হয়; সৃজনশীল প্রশ্নের ভুল ব্যাখ্যা—সৃজনশীল প্রশ্নের উদ্দীপক না বুঝে উত্তর লেখা।
সময় ব্যবস্থাপনা (Time Management) ঠিকভাবে করতে না পারলে কী সমস্যা হয়, এটি কীভাবে ঠিক করা যায়?
অধ্যক্ষ: সব প্রশ্ন শেষ করা যায় না; সহজ প্রশ্নও বাদ পড়ে যায়; মানসিক চাপ বেড়ে যায়। সমাধান হলো—আগে থেকেই সময় ভাগ করে নাও—যেমন: সৃজনশীল প্রতি প্রশ্নের উত্তর লিখতে নির্দিষ্ট সময় ১৮-১৯ (যে বিষয়গুলোতে ব্যবহারিক আছে সেগুলো ৩০-৩১ মিনিট); বাসায় বসে ‘টাইম ধরে’ প্র্যাকটিস করো; সহজ প্রশ্ন আগে শেষ কর; সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু—যে প্রশ্নগুলোর উত্তর তুমি সবচেয়ে ভালো জানো, সেগুলো দিয়ে শুরু করো। এতে তোমার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
ঘড়ি অনুসরণ—পরীক্ষার হলে ঘড়ির দিকে খেয়াল রাখো এবং বরাদ্দকৃত সময়ের মধ্যেই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর শেষ করো, কোনো কারণে শেষ না হলে ১ মিনিটের মধ্যে শেষ করে পরেরটি শুরু করো।
সৃজনশীল প্রশ্নের (Creative Questions) উত্তর লেখার সময় কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি?
অধ্যক্ষ: সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় এই বিষয়গুলো মনে রাখবে—উদ্দীপক ভালোভাবে পড়া, উদ্দীপকটি মনোযোগ দিয়ে ২-৩ বার পড়ে এর ভাববস্তু বুঝে নেওয়া। স্তর অনুযায়ী ক, খ, গ, ঘ—এই চারটি অংশের উত্তর স্তরের ধারাবাহিকতায় লেখা। অর্থাৎ সৃজনশীল প্রশ্নের গঠন-কাঠামো অনুযায়ী উত্তর লেখা।
ক. (জ্ঞানমূলক)—সরাসরি বই থেকে উত্তর করা
খ. (অনুধাবনমূলক)—প্রশ্নটির অর্থ বা ব্যাখ্যা।
গ. (প্রয়োগমূলক)—উদ্দীপকের সাথে পাঠ্যবইয়ের অংশের সম্পর্ক/ মিল/অমিল স্থাপন এবং ব্যাখ্যা। জ্ঞান-অনুধাবন-প্রয়োগ—এ স্তর অনুযাীয় লেখা।
ঘ. (উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা)—নিজের মতামত, বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন বা প্রমাণ করা। জ্ঞান-অনুধাবন-প্রয়োগ-উচ্চতর দক্ষতায়—এ স্তর অনুযায়ী লেখা।
অপ্রয়োজনীয় কথা না বাড়ানো; পরিষ্কার হাতের লেখা ও প্যারা বজায় রাখা।
অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে ভয় বা দুশ্চিন্তায় ভোগে—এটা কাটানোর জন্য আপনার পরামর্শ কী?
অধ্যক্ষ: প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম (৭-৮ ঘণ্টা); ‘আমি পারবই’—এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করা; বন্ধুদের সাথে তুলনা না করা; হালকা হাঁটা বা রিলাক্সেশন করা; অতিরিক্ত পড়ার চাপ না নেওয়া; ভয় কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ভালো প্রস্তুতির ওপর বিশ্বাস রাখা; শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা; পর্যাপ্ত পানি পান করা/নিয়মিত পরিমিত খাদ্য গ্রহণ; ইতিবাচক চিন্তা করা; ভয় বা দুশ্চিন্তা অভিভাবক ও শিক্ষকদের জানিয়ে সমাধান নেওয়া।
একজন শিক্ষক হিসেবে আপনি কী বলবেন—কোন ৫টি অভ্যাস থাকলে একজন শিক্ষার্থী নিশ্চিতভাবে ভালো ফল করতে পারে?
অধ্যক্ষ: নিয়মিত অধ্যবসায়—প্রতিদিন নিয়মিত পড়াশোনা করা, শুধু পরীক্ষার আগে নয়; পড়ার রুটিন তৈরি ও অনুসরণ—একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে পড়াশোনা করলে সব বিষয় কভার করা যায়; প্রশ্ন বিশ্লেষণ ও অনুশীলন—বিগত বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ টপিক চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর ওপর অনুশীলন করা; লিখিত অনুশীলন—যা পড়া হচ্ছে তা লিখে অনুশীলন করা, বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে। এর সাথে যেগুলোতে বেশি লিখতে হয়—যেমন: বাংলা, ধর্ম; স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা। সবার জন্য আমার শুভকামনা রইল।