যে পাঁচ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হলো ট্রাম্পের

০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৮ AM
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে রিপাবলিকানদের

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে রিপাবলিকানদের © সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিকরা। তাতে বড় ব্যবধানে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে দলটি। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে কিছুটা বেকায়দায় পড়তে হয়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের ব্যাপকতাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের বিরুদ্ধে ভোটারদের জোরালো প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ক্ষুব্ধ ভোটার থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া—বিভিন্ন কারণে রিপাবলিকানরা এত আসন হারিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দলটির পরাজয়ের পেছনে পাঁচটি কারণ:

১. জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া

যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত—সবখানেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের চাপে ছিলেন ভোটাররা। গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে নির্বাচনের আগে ভোটারদের ক্ষোভও ছিল স্পষ্ট।

নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার নির্বাচনের আগে বলেন, ‘গ্যাসের দাম, মুদি পণ্যের দাম—সবকিছুর দামই বাড়ছে।’ তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে দেশটিতে খুচরা ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ৫২ ডলারের রেকর্ড দামের কাছাকাছি পৌঁছায়। গত সেপ্টেম্বরে এই রেকর্ড দাম দেখা গিয়েছিল।

ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ জনের মধ্যে আটজন (৭৯ শতাংশ) বলেছেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে তারা ও তাদের পরিবার মাঝারি থেকে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এ ছাড়া ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের বেশি ভোটার এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের নীতির কারণেই পণ্যের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়েছে।

২. ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে।

এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষকে পেট্রল পাম্পে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে।

যুদ্ধটি অধিকাংশ মার্কিনির কাছেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে এই যুদ্ধ সাংঘর্ষিক বলেও মনে করেছেন তার সমর্থকদের একটি অংশ। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো যুদ্ধে জড়ানো হবে না।

ভোটারদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। অন্যদিকে, ৭৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ বা বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।

নির্বাচনের পরদিন ট্রাম্প স্বীকার করেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা ছিল। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা ঠেকাতে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া তার সামনে অন্য কোনো উপায় ছিল না।

৩. ডেমোক্র্যাটদের সুসংগঠিত নির্বাচনী প্রচার

ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পেছনে দলটির শক্তিশালী প্রার্থীদের ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে এসব প্রার্থী ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিয়ে তারা সুসংগঠিত প্রচার চালান। সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো ও যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন টেক্সাস ও কানসাসে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়টি এমনভাবে তুলে ধরেন, যা ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলে।

সাউথ ক্যারোলাইনায় অপ্রত্যাশিত জয় পান ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। সাবেক এই শিশু চিকিৎসক স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টিকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোটারদের কাছে তার এই অবস্থান গ্রহণযোগ্যতা পায়।

মিশিগানে জয় পাওয়া সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল এল-সাইয়েদ প্রচারের অন্যতম স্লোগান করেন, ‘রাজনীতি থেকে অর্থ সরিয়ে মানুষের পকেটে অর্থ ফেরানো’।

জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতিকে প্রচারের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। ট্রাম্পের টানা দুইবার জয় পাওয়া অঙ্গরাজ্যটিতে ৩৯ বছর বয়সী অসফের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জয়কে কেন্দ্র করে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জন আরও জোরালো হতে পারে। এমনকি ট্রাম্প নিজেও ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করেছেন। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ‘তারা ভালো করেছে।’

অন্যদিকে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো রিপাবলিকান প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দুর্বল প্রচার চালানোর অভিযোগ ওঠে। ভোটারদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় তাদের প্রচার কৌশল সমালোচনার মুখে পড়ে।

৪. ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা

ভোটারদের অসন্তোষের অন্যতম দুটি বিষয়—পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধ—সরাসরি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা কমেছে। ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও রিপাবলিকান প্রার্থীরা ঝুঁকিতে পড়েন।

নিজের সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে ট্রাম্প ভোটারদের বলেছিলেন, যেন তারা কল্পনা করেন এবারের নির্বাচনে তিনিও প্রার্থী হয়েছেন।

তবে এক দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে থাকা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে। ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের মধ্যে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে রাখার কৌশল উল্টো দলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্বাচনের আগের কয়েক মাসের জরিপেও দেখা যায়, অধিকাংশ মার্কিনি চেয়েছেন, ট্রাম্প যেন তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত উদ্বেগকে বেশি গুরুত্ব দেন। নির্বাচনের আগে সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে দেওয়া শেষ নির্বাচনী ভাষণে ট্রাম্প দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন হোয়াইট হাউসের পেছনে অবস্থিত রিফ্লেক্টিং পুলের বিতর্কিত সংস্কার প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে।

৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের অবস্থান পরিবর্তন

দুই বছর আগে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে পড়া ট্রাম্পের বড় জয়ে ভূমিকা রেখেছিল। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই প্রবণতা উল্টে গেছে বলে মনে হচ্ছে। টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক-অধ্যুষিত তিনটি কংগ্রেসনাল আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। দেশটির অন্য বড় জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন তথ্য বিশ্লেষক জেফ অ্যাডেলসন।

অভিবাসনবিরোধী আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) কার্যক্রম নিয়েও ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশ মার্কিনি সংস্থাটির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।

এদিকে, কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মিসিসিপিতে সিনেট নির্বাচন এখনো হাড্ডাহাড্ডি অবস্থায় রয়েছে। অঙ্গরাজ্যটিতে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের হার যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনো অঙ্গরাজ্যের তুলনায় বেশি, প্রায় ৩৭ শতাংশ। সেখানে স্কট কলম জয়ী হলে ১৯৮২ সালের পর প্রথম ডেমোক্র্যাট হিসেবে মিসিসিপি থেকে সিনেটর নির্বাচিত হবেন তিনি।

যে পাঁচ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবি হলো ট্রাম্পের
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
এইচএসসির ফলাফলে ধস, শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরাতে মাইকিং
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
দুই যুগেও মেলেনি এমপিও, ঋণের চাপে সর্বস্বান্ত হয়ে প্রাণ গেল…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামানের ছেলেকে ছুরিকাঘাত
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
হামের টিকা নিয়ে তদন্ত করছে সরকার
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
জায়গা দখল করে ছাত্রদল নেতার অবৈধ দোকান, নিউজ করায় সাংবাদিকে…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950