অভিজিৎ দীপক ও নেহা বোরা © সংগৃহীত
ভারতে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) প্রধান নেহা বোরাকে আবারও আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভ ও মিছিলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাদের আটক করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে দুই নেতার মুক্তি দাবি করেছেন বিরোধী দলের নেতারা। তাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে সরকার ও পুলিশ গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দিল্লির বিভিন্ন স্থানে জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভ করেন সিজেপির সদস্য ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা। কনট প্লেস ও মান্ডি হাউস এলাকায় এসব কর্মসূচি পালিত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ১০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
অভিজিৎ দীপক কনট প্লেসে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ শিরোনামে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। এর আগে দিল্লির ঝান্ডেওয়ালানে নিজের বাসা থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। অন্যদিকে, আইসা প্রধান নেহা বোরা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার পথে মান্ডি হাউসের কাছে আটক হন। গত সপ্তাহে যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসেবে দেওয়া স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা হয়।
পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, বিক্ষোভের জন্য কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিধিমালা লঙ্ঘনের আশঙ্কা ছিল। এ কারণে পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে।
তবে পুলিশ পরে জানায়, বারাখাম্বা রোড, মান্ডি হাউস ও অন্যান্য স্থান থেকে প্রায় ১০০ জনকে আটক করা হলেও কনট প্লেসের ইনার সার্কেল থেকে কাউকে আটক করা হয়নি। জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান বজায় রেখে বিক্ষোভকারীদের তিরঙ্গা হাতে মিছিল করতে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করে পুলিশ।
এদিকে, দুই নেতাকে আটকের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব, তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এবং দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ বিরোধী দলের নেতারা পুলিশের সমালোচনা করেছেন।
আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল কেন্দ্রীয় সরকার ও পুলিশের পদক্ষেপকে ‘নিছক স্বৈরাচার’ বলে আখ্যা দেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, ‘তিরঙ্গা ওড়ানো কি অপরাধ? অভিজিতের গ্রেপ্তারি দেখিয়ে দিচ্ছে, মোদিজি তাদের কতটা ভয় পান।’
অন্য একটি পোস্টে কেজরিওয়াল লেখেন, ‘আমরা যদি নিজেদের দেশে তিরঙ্গা ওড়াতে না পারি, তাহলে কি পাকিস্তানে গিয়ে ওড়াব? যারা ভারতের তিরঙ্গা নিয়ে সমস্যায় ভুগছেন, তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত।’
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্সে লেখেন, ‘দিল্লি পুলিশ কী করছে?’
তিনি আরও লেখেন, ‘ভারতের জাতীয় পতাকা হাতে নেওয়ার কারণে অভিজিৎ দীপককে আটক করা হয়েছে। বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন। স্বাধীন ভারতে আমাদের তরুণদের শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার কারণে আটক করা হচ্ছে।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও লেখেন, ‘এটি কার্যত অঘোষিত জরুরি অবস্থার মতো। যে সরকার ভিন্নমতকে ভয় পায়, সেই সরকার এখন পুরো একটি প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটি একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের আচরণ, যে শাসন নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনো কণ্ঠস্বর সহ্য করতে পারে না।’
বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগও তোলেন তিনি। কারাগারে থাকা সিজেপির অন্য দুই নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের নাম উল্লেখ করে মমতা লেখেন, ‘অভিজিৎ, আশুতোষ, সৌরভ—তোমরা ভারতের তরুণদের সাহস, বিবেক ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করো... তোমাদের দিদি দৃঢ়ভাবে তোমাদের পাশে আছেন।’
তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিনও দুই নেতাকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানতে চান। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আটক করার পর তাদের অবস্থান না জানানো স্পষ্টতই বেআইনি এবং গভীরভাবে অমানবিক।’
স্ট্যালিন আরও লেখেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে তাদের মুক্তি দিতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমন বন্ধ করতে হবে। আন্দোলনকে দমিয়ে দেওয়ার প্রতিটি চেষ্টা একে আরও শক্তিশালী করবে।’ এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগেরও দাবি জানান তিনি।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও নেহা বোরাকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশ কেন জানাচ্ছিল না, সেই প্রশ্ন তোলেন।
কংগ্রেস জানিয়েছে, শুক্রবার আটক হওয়া সব বিক্ষোভকারীর পাশে রয়েছে দলটি। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দলটি বলেছে, ‘আজ গ্রেপ্তার হওয়া সব বিক্ষোভকারীর পাশে রয়েছে কংগ্রেস। আমাদের গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে এবং ভোটাধিকার কেড়ে নিতে তাদের এই অশুভ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করব এবং তাদের পরাজিত করব।’
অন্যদিকে, বিজেপি এসব বিক্ষোভকে ‘নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও নাকচ করেছে দলটি। বিজেপির দাবি, নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে না পেরে কংগ্রেস এসব অভিযোগ তুলছে।
বিজেপির মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী বলেন, ‘তাদের উদ্দেশ্য গণতন্ত্র রক্ষা করা নয়, বরং বিদেশি প্রভুদের ইশারায় কাজ করা।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘দেশে নৈরাজ্য ছড়ানো এবং দেশকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।’
প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সর্বশেষ আটকের ঘটনা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলমান বিক্ষোভের অংশ হিসেবে তিনি নিজেও বিভিন্ন মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সব বিক্ষোভই এক।’
দিনের শুরুতে দিল্লি পুলিশের ২০ জনের বেশি সদস্য অভিজিৎ দীপকের বাসায় গিয়ে তাকে একটি নোটিশ দেন। এতে তাকে এমন কোনো কাজ না করতে বলা হয়, যা নাগরিক, ব্যবসায়ী, যাতায়াতকারী, রোগীসহ অন্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে। নোটিশে বলা হয়, কনট প্লেসের আশপাশে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ কার্যকর রয়েছে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত তিরঙ্গা যাত্রার জন্য নতুন দিল্লি পৌর পরিষদ (এনডিএমসি) অনুমতি দেয়নি।
পুলিশ অভিজিৎকে জানায়, জাতীয় পতাকা ওড়ানো বেআইনি নয়। তবে অনুমতি ছাড়া মিছিল করা এবং জনসমাগম ঘটানো বেআইনি হতে পারে। এ সময় অভিজিৎকে বলতে শোনা যায়, ‘নতুন দিল্লি যেতে পারব না, অন্য কোথাও তো যেতে পারি। আমি কোন আইন ভেঙেছি?’
পিটিআইকে পুলিশ সূত্র জানায়, অভিজিৎকে জাফরপুর কালান থানায় নেওয়া হয়েছে। পরে আইসা এক্সে জানায়, নেহা বোরাকে মান্ডানপুরীর অ্যান্টি-নারকোটিকস টাস্কফোর্স কার্যালয়ে একা রাখা হয়েছে। দুটি স্থানই দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত।
এদিকে, দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমার নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যান। কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করে পুলিশ। পার্কের ধাতব রেলিং বরাবর পুলিশ সদস্যরা মানবপ্রাচীর তৈরি করেন। পার্কের ভেতরে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়।
শুক্রবার রাতে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সব মেট্রো স্টেশন ও বাজার খোলা ছিল। অধিকাংশ বিক্ষোভকারী রাজীব চক মেট্রো স্টেশনের ৬ নম্বর গেট দিয়ে এসেছিলেন। ইন্টারনেট সেবা সচল ছিল এবং যান চলাচলও স্বাভাবিক ছিল।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কনট প্লেসে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের একটি মিছিল হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ইনার সার্কেলের তিনটি চক্কর দিয়েছেন। সেন্ট্রাল পার্কে প্রবেশের কোনো চেষ্টা হয়নি।’