উড়ন্ত কার উন্মোচন করলেন ইলন মাস্ক © সংগৃহীত
উড়তে সক্ষম গাড়ি উন্মোচন করেছেন টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে স্পেসএক্সের একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে নতুন টেসলা রোডস্টার মডেলের গাড়িটি প্রদর্শন করেন তিনি। মাস্কের দাবি, দুই আসনের এই স্পোর্টস কারটি সড়কে দ্রুতগতিতে চলার পাশাপাশি বাতাসে লাফিয়ে উঠতে, উল্টে যেতে এবং বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে আবার মাটিতে নামতে পারবে। ২০২৮ সালে গাড়িটির উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে গাড়িটি সত্যিকার অর্থে কতটা উড়তে পারবে, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
প্রদর্শনীতে মাস্ক দেখান, নতুন রোডস্টার গাড়িটি ঘণ্টায় শূন্য থেকে ৬০ মাইল (প্রায় ৯৭ কিলোমিটার) গতিতে পৌঁছাতে এক সেকেন্ডেরও কম সময় নিতে পারে। গাড়িটির নিচে বিশেষ শোষণপ্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি খাড়া ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠার পর সেটিকে উল্টো অবস্থায় ঝুলে থাকতে দেখা যায়। এরপর গাড়িটি ঢাল থেকে ঘুরে বেরিয়ে বাতাসে ডিগবাজি খেয়ে বিশেষ এয়ার জেটের সাহায্যে মাটিতে নামে।
তবে পুরো প্রদর্শনীতে গাড়িটিতে কোনো চালক ছিলেন না। দর্শকদের উদ্দেশে মাস্ক বলেন, ‘কেউ যেন আহত না হন, তা নিশ্চিত করতেই’ চালক ছাড়া গাড়িটি প্রদর্শন করা হয়েছে। গাড়িটির সক্ষমতা নিয়ে নিজের অনিশ্চয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। মাস্ক বলেন, ‘সাফল্য নিশ্চিত নয়। আমি সত্যিই বলছি। সম্ভবত এটি কাজ করবে। তবে কাজ না করলে আমরা নিরাপদ দূরত্বে থাকব।’
বৃহস্পতিবারের প্রদর্শনীর পরবর্তী অংশে রোডস্টারকে টেসলার কয়েকটি প্রচলিত মডেলের পাশাপাশি রাখা গাড়ির সারির ওপর দিয়ে লাফিয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর গাড়িটির পেছনের এয়ার জেট ব্যবহার করে অতি অল্প সময়ে ঘণ্টায় ৬০ মাইল গতিতে পৌঁছানোর প্রদর্শনীও করেন মাস্ক।
অনুষ্ঠানে প্রদর্শনী সফল হলেও গাড়িটি বাস্তবে মালিকদের উড়তে পারার সুবিধা দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে গাড়িটি শুধু অল্প সময়ের জন্য বাতাসে লাফিয়ে ওঠার বদলে দীর্ঘ সময় উড়তে পারবে কি না এবং একই সঙ্গে সাধারণ সড়কে দ্রুতগতিতে চলার উপযোগী থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
টেসলার নতুন রোডস্টারে রয়েছে ১০টি নজল বা বায়ু নির্গমনের মুখ এবং মাস্কের ভাষায় ‘অতি উচ্চচাপের বায়ুর ট্যাংক’। এসব ব্যবস্থার সাহায্যে গাড়িটি বাতাসে ওঠার পাশাপাশি মাটিতে চলার সময় দ্রুত গতি অর্জন করতে পারবে বলে দাবি করেছেন তিনি।
টেসলা গাড়ি নির্মাণ করে, আর স্পেসএক্স রকেট ও মহাকাশযান তৈরি করে। দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন রোডস্টার তৈরি করা হয়েছে বলে মাস্কের বক্তব্যে উঠে এসেছে। প্রযুক্তিটির বর্ণনা দিতে গিয়ে মাস্ক বলেন, ‘বিশ্বের সেরা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের সেরা রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা হলে যে ফল পাওয়া যায়, এটি তারই উদাহরণ।’
গাড়িটির উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন মাস্ক। তবে টেসলার ইতিহাসে নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য বাজারে আনার বিষয়ে তার একাধিক ঘোষণা নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কয়েক বছর পিছিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। ফলে নতুন রোডস্টারের উৎপাদনও ঘোষিত সময়েই শুরু হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রদর্শনী দেখতে আসা টেসলার উৎসাহী সমর্থকদের উদ্দেশে মাস্ক বলেন, ‘এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সিমুলেশন নয়, তা প্রমাণ করতে আমাদের দর্শক দরকার। আপনারা মানুষকে বলতে পারবেন, নিজের চোখে এটি দেখেছেন। কারণ, নিজের চোখে যা দেখবেন, তা-ও বিশ্বাস করতে পারবেন না।’
তবে বৃহস্পতিবারের প্রদর্শনীতে গাড়িটি দীর্ঘ দূরত্ব উড়তে পারে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গাড়িটির বাতাসে ওঠা ও লাফিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখানো হলেও দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে উড়ে যাওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদ্যুতিক উল্লম্ব উড্ডয়ন ও অবতরণকারী উড়োজাহাজের প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এ ধরনের যানকে ‘ইলেকট্রিক ভার্টিক্যাল টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং’ বা ইভিটিওএল বলা হয়। এ প্রযুক্তির কিছু কার্যকর মডেল তৈরি হলেও সাধারণ সড়কে চলার উপযোগী এবং একই সঙ্গে সত্যিকার অর্থে উড়তে সক্ষম গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু প্রকৌশলগত বাধা রয়েছে।
অনুষ্ঠানের আগে বৃহস্পতিবার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের উল্লম্ব উড্ডয়নবিষয়ক কিউরেটর রজার কনর বলেন, উড়োজাহাজ তৈরির ক্ষেত্রে ওজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, সড়কে চলার গাড়িতে বাম্পার, দুর্ঘটনার সময় আঘাত কমানোর জন্য বিশেষ কাঠামোসহ বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখতে হয়।
কনর বলেন, ‘উড়োজাহাজ ও সড়কে চলার গাড়ি—দুটির সমন্বয়ে তৈরি কোনো যান উড়োজাহাজ হিসেবেও ভালো করবে না, আবার গাড়ি হিসেবেও ভালো করবে না। পাশাপাশি এর দামও অনেক বেশি হবে।’
ক্যালিফোর্নিয়ার স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান আলেফ এমন একটি উড়ন্ত গাড়ি তৈরি করছে, যেটি আটটি প্রপেলারের সাহায্যে মাটি থেকে ওপরে উঠতে পারে। গাড়িটির সামনে চারটি এবং পেছনে চারটি প্রপেলার রয়েছে। তবে এর ওজন মাত্র ২৫৪ পাউন্ড, যা টেসলার রোডস্টারের সম্ভাব্য ওজনের তুলনায় অনেক কম। আলেফের গাড়িটিতে মাত্র একজন যাত্রী বসতে পারেন এবং ওই যাত্রীর ওজন গাড়িটির নিজের ওজনের চেয়ে কম হতে হয়।
টেসলার প্রদর্শনীর আগে আলেফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিম দুখোভনি সিএনএনকে বলেন, রোডস্টারকে অনুষ্ঠানে মাটি থেকে ওপরে উঠতে দেখলে তিনি অবাক হবেন না। তবে গাড়ি বাতাসে উঠতে পারলেই সেটিকে সত্যিকার অর্থে উড়তে সক্ষম বলা যায় না।
দুখোভনি বলেন, ‘এটি পুরোপুরি সম্ভব। তবে সব ইভিটিওএল যান তৈরির ক্ষেত্রেই সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো উল্লম্বভাবে ওপরে ওঠা থেকে সামনের দিকে চলার অবস্থায় রূপান্তর। এ সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়, যাতে উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উত্তোলনক্ষমতা হারিয়ে না যায় এবং যানটি স্থিতিশীল থাকে।’
রজার কনরও সন্দেহ প্রকাশ করেন, রোডস্টারের মতো সড়কে চলার অনুমতিপ্রাপ্ত কোনো গাড়ি চালক যেখানে যেতে চাইবেন, সেখানে উড়ে যেতে পারবে কি না। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে উড়ে থাকার কথা বলছি না। আমরা আক্ষরিক অর্থেই লাফিয়ে ওঠার কথা বলছি।’
ফলে টেসলার নতুন রোডস্টার গাড়িটি প্রযুক্তির দিক থেকে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। গাড়িটি সত্যিকার অর্থে উড়তে পারবে, নাকি কেবল বিশেষ ব্যবস্থায় অল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে ওপরে উঠতে পারবে, তা নির্ধারণে আরও পরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ প্রয়োজন।