যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও শুভেন্দু অধিকারী © টিডিসি ছবি
পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যাপকদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলির সুযোগ রেখে সংশোধনী বিল পাস করেছে রাজ্য সরকার। বিলটি পাসের পরই এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, এই বিল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে আনা হয়নি। বরং নতুন ও দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গড়ে তুলতে অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের কাজে লাগানো হবে। তবে বিলটির নেপথ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি রয়েছে বলে মনে করছে শিক্ষামহলের একাংশ।
বৃহস্পতিবার বিধানসভার জরুরি অধিবেশনে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ পাস হয়। বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৭১টি। বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৫টি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রায় ৩৩ মিনিটের বক্তব্যের পর উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য শেষে ধ্বনিভোটে বিলটি পাস হয়।
বিলটি নিয়ে বিধানসভায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন শুভেন্দু। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’ হিসেবে গড়ে তুলতে কেন্দ্র ১ হাজার কোটি টাকা দেবে। রাজ্যও দেবে আরও ৩০০ কোটি টাকা।
যাদবপুরের পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখতে হবে ঋষি অরবিন্দের তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা সেন্টার অফ এক্সেলেন্স করতে চাইছি। এ জন্য ১০০০ কোটি টাকা দেবে কেন্দ্র। রাজ্য দেবে আরও ৩০০ কোটি। কিন্তু আপনারা সেখানে হস্টেল থেকে পড়ুয়াদের জোর করে বের করে নিয়ে যাবেন, বলবেন ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজ়াদি’, ‘ভারত তেরে টুকড়ে হোঙ্গে’— আমরাই টুকরো করে দেব আপনাদের।’
শুভেন্দুর দাবি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে দেশবিরোধী কথাবার্তা লেখা হয়। কোনো কোনো শিক্ষকও এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ইন্ধন দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিধানসভায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন জুটা-র নাম করেও হুঁশিয়ারি দেন শুভেন্দু। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য গোপালচন্দ্র সেন হত্যার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘উপাচার্য গোপাল সেনকে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা। প্রয়োজন হলে কমিশন বসাব। আগের ঘটনা বের করব। আমি নিয়ে এসেছি সব। কবে, কী করেছিলেন আপনারা। এই নামধারী জুটা-র লোকেরা কী কী করেছিলেন, সব ইতিহাস রয়েছে।’
তবে গোপালচন্দ্র সেন হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সংশোধনী বিল প্রয়োগ করা হবে না বলেও জানান শুভেন্দু।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, এই বিল কারও বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য নয়। বরং নতুন তৈরি হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শক্তিশালী করতেই এর ব্যবহার করা হবে। তাঁর দাবি, পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে সেগুলোকে গড়ে তোলা সম্ভব।
শুভেন্দু বলেন, ‘তাঁরা গিয়ে ওই দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে তৈরি করে দিন। আপনাদের এত জ্ঞান, এত পাণ্ডিত্য, সমাজতন্ত্র, কৃষকের রাজত্ব, শ্রমিকের রাজত্ব, সকলের সমান রোজগার চাই— এই সমাজবাদ আনতে গেলে, পুরনো আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠিত, তথাকথিত সমাজবাদ যারা প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাদের নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যেতে হবে। আমরা চাই তাঁদের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যকে কাজে লাগাতে।’
এভাবে অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে ছোট ও নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোও বিকশিত হবে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিলের বিষয়ে শুভেন্দুর বক্তব্য, রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর সরকারের কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকা স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ‘এই আইন শুধুমাত্র রাজ্য সরকারের আর্থিক সাহায্য প্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সরকারি অর্থ পায় তাদের ক্ষেত্রে সরকারের কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকা স্বাভাবিক।’
শিক্ষা ভারতের সংবিধানের যুগ্ম তালিকাভুক্ত বিষয় উল্লেখ করে রাজ্যের আইন করার ক্ষমতার কথাও তুলে ধরেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘আপনাদের জেনে রাখা দরকার, শিক্ষা ভারতীয় সংবিধানের সপ্তম তফসিলের অধীন। অর্থাৎ, রাজ্য বিধানসভার সম্পূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে এ বিষয়ে আইন প্রণয়নেরয় ক্ষমতা রয়েছে।’
অধ্যাপকদের বদলির কারণে গবেষণার কাজে কোনো সমস্যা হবে না বলেও দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কোনো শিক্ষক স্বেচ্ছাবসর নিলে, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ হলে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগ দিলে কিংবা মারা গেলে গবেষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে নির্দেশক পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে হয়। তাই বদলির ক্ষেত্রেও গবেষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে বলে দাবি করেন তিনি।
বিলটিতে ২০১৭ সালের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ আইনে সংশোধন করে নতুন ১৪-এ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রশাসনিক প্রয়োজনে রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে আচার্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করতে পারবেন।
বদলি হওয়া কর্মী নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী চাকরির সুযোগ-সুবিধা পাবেন। কোনো কর্মী চাইলে তাঁর প্রাথমিক নিয়োগ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে লিয়েন বজায় রাখতে পারবেন। আবার যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হয়েছেন, সেখানেও স্থায়ীভাবে থাকতে পারবেন।
জনস্বার্থে বদলি হওয়া কোনো কর্মী পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে লিয়েন না রাখলে তাঁর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে সংশ্লিষ্ট পদে প্রাথমিক নিয়োগের তারিখ অনুযায়ী। এ ক্ষেত্রে আচার্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের নীতি পশ্চিমবঙ্গে নতুন নয়। কর্ণাটক, উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রেও রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলির ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে বিলটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে শিক্ষক সংগঠন আবুটা। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গৌতম মাইতির দাবি, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধিবদ্ধ নিয়োগব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে গিয়ে কর্মরত শিক্ষকদের বদলি করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আবুটা আরও বলেছে, শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরা নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট পদে নিয়োগ পান। তাঁরা রাজ্যব্যাপী বদলিযোগ্য ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে নিয়োগের সময় নির্ধারিত শর্ত পরে বদলে দেওয়া যায় কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, প্রশাসনিক প্রয়োজন, মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং শিক্ষার গুণমান বৃদ্ধির যুক্তিতে বদলির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক সরিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালে সামগ্রিক শিক্ষক-সংকট আরও বাড়তে পারে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন জুটা-ও বিলটির বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন ও পরিচালনবিধি অনুযায়ী নিয়োগ হয়। সেই নিয়ম উপেক্ষা করে নতুন শর্তে শিক্ষককে কাজ করতে বাধ্য করা স্বাভাবিক আইনের পরিপন্থী।
বদলির কারণে গবেষণার কাজে সমস্যা হতে পারে বলেও দাবি করেছে জুটা। তাদের মতে, বিজ্ঞান গবেষণার প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে না। ফলে কোনো শিক্ষককে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে তাঁর গবেষণার কাজ ব্যাহত হতে পারে। তাঁর অধীনে থাকা গবেষকরাও সমস্যায় পড়তে পারেন।
জুটা আরও দাবি করেছে, সরকার পুরো ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীভূত করতে চাইছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসনের ভিত্তি দুর্বল হবে। সংশোধনী বিলটি ইউজিসির মৌলিক নীতিরও পরিপন্থী বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
বিলটির বিরোধিতা করেছে সর্বভারতীয় ডিএসও-ও। সংগঠনটির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, বিলটি আইনে পরিণত হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ দলতন্ত্র কায়েম করবে।
এদিকে সংশোধিত বিলে শুধু অধ্যাপক ও কর্মীদের বদলির বিষয়ই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রভিডেন্ট ফান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। রাজ্যের ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভিডেন্ট ফান্ড পরিচালনায় অভিন্ন আইনি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যেই এই সংশোধন আনা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মীদের জন্য গঠিত প্রভিডেন্ট ফান্ডের ক্ষেত্রে ১৯৮৩ সালের সংশ্লিষ্ট আইন কার্যকর হবে। প্রয়োজনীয় বাজেটের ব্যবস্থা অর্থ দপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে করা হবে বলেও বিলে উল্লেখ রয়েছে।