ট্রুম্যান থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প: যেভাবে ইসরায়েলি লবির কাছে ‘হাতকড়া’ পড়েছেন মার্কিন নেতারা

০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৯ PM , আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৩ PM
ইসরায়েল লবির জোর প্রচেষ্টার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে পৌছাতে পারেন না মার্কিন নেতারা

ইসরায়েল লবির জোর প্রচেষ্টার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে পৌছাতে পারেন না মার্কিন নেতারা © টিডিসি ফটো (এআই)

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে যখন যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান তখন এক চরম উভয়সংকটের মুখোমুখি হন। একদিকে ছিলেন সিওনিস্ট (ইহুদিবাদী) লবিস্ট এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উপদেষ্টারা, যারা ফিলিস্তিনের যতটা সম্ভব বেশি ভূখণ্ড জুড়ে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনে সমর্থন দেওয়ার জন্য তার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছিলেন। 

অন্যদিকে ছিলেন তার পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তারা, যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ সি মার্শাল। শীর্ষ কর্মকর্তাদের সর্বসম্মত পরামর্শ ছিল—একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধ করা। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেবে এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

জর্জ ওয়াশিংটনকে বাদ দিলে, মার্কিন ইতিহাসে দেশপ্রেমিক গুণাবলী ও মেধার দিক থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্সালের সমকক্ষ কোনো কূটনৈতিক বা সামরিক নেতা ছিলেন না। ট্রুম্যান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মার্শালকে উইনস্টন চার্চিল বিজয়ের মূল কারিগর হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। যুদ্ধের পর ইউরোপ পুনর্গঠনে বিখ্যাত মার্শাল প্ল্যান চালু করেছিলেন তিনিই।

১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্শাল ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিওনিস্ট প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নিরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন। তিনি আশঙ্কিত ছিলেন যে, এতে মার্কিন সমর্থনের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন আরবদের ক্ষোভকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়বে এবং রক্তের বন্যা ও অস্থিরতা ঠেকাতে মার্কিন সেনা পাঠাতে হবে। ট্রুম্যানের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টাদেরও একই মত ছিল।

ট্রুম্যান ব্যক্তিগতভাবে নাৎসিদের চূড়ান্ত সমাধান (হলোকস্ট)-এর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া ইহুদিদের দুর্দশায় গভীরভাবে ব্যথিত ছিলেন। তবে ওয়ার্ল্ড সিওনিস্ট অর্গানাইজেশনসহ বিভিন্ন ইহুদি প্রতিনিধিদল, বন্ধু ও রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে ইহুদি রাষ্ট্রের স্বীকৃতির জন্য আসা ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপে তিনি তীব্র বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হতেন। বিরক্তি সত্ত্বেও তিনি তাদের উপেক্ষা করতে পারতেন না। সামনেই ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নিউ ইয়র্কের গভর্নর থমাস ডিউই। সিওনিস্ট লবির এই চাপ ট্রুম্যানকে এক চরম বিব্রতকর ও কষ্টদায়ক অবস্থায় ফেলে দেয়।

ফিলিস্তিন যখন গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত, আরব দেশগুলো আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে এবং শেষ ব্রিটিশ সেনারা দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন এক প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালের ১২ মে ট্রুম্যান তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক ডাকেন। মার্সালের নিজের বিবরণ অনুযায়ী, তিনি ট্রুম্যানকে সতর্ক করে বলেন যে, তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ক্লার্ক ক্লিফোর্ডের প্রস্তাব মেনে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার আগেই তাকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত হবে না।

মার্শাল স্পষ্ট জানান, এটি হবে কয়েকটি ভোট পাওয়ার জন্য একটি সস্তা কৌশল, যা প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করবে। এমনকি ট্রুম্যান যদি এই রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ট্রুম্যানকে ভোট দিতে পারবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দেন। এতে স্তম্ভিত হয়ে ট্রুম্যান মার্সালের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে বৈঠক শেষ করেন।

কিন্তু মাত্র দুই দিনের মাথায়, নিজের প্রেসিডেন্ট পদের ভঙ্গুর অবস্থা এবং নিউ ইয়র্কের ইলেকটোরাল ভোট রিপাবলিকানদের ঝুলিতে পড়া ঠেকাতে সিওনিস্ট সহানুভূতিশীলদের ক্ষমতার কথা চিন্তা করে তিনি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার নির্দেশ দেন।

আজ ইসরায়েল লবি নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব আরও বহুগুণ শক্তিশালী হয়েছে। ট্রুম্যানের সেই সংকট—জাতীয় স্বার্থ এবং একটি শক্তিশালী লবিকে উপেক্ষা করার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মূল্যের মধ্যবর্তী টানাপোড়েন—পরবর্তী দশকগুলোতে প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধারাবাহিকভাবে অভিজ্ঞতা করতে হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অভিযানের পর, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিনদের এই মারাত্মক অপারেশনে যুক্ত করা। এই সিদ্ধান্তটি ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টাদের মতামত এবং রিপাবলিকান পার্টির ৪৫ শতাংশ সমর্থকের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে নেওয়া হয়েছিল, যারা ইসরায়েলকে ইতিবাচকভাবে দেখে না। এই সিদ্ধান্তকে হয়তো ট্রাম্পের দুই মেয়াদের খামখেয়ালি পলিসি তৈরির আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দ্রুত ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তবে তার পূর্বসূরিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মার্কিন রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়, বরং এটিই নিয়ম।

বাস্তবতা হলো, ট্রুম্যান থেকে শুরু করে ট্রাম্প পর্যন্ত অধিকাংশ মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইসরায়েল ও তার সমর্থকদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেছেন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরাজয়ের ভয়ে তারা প্রায়ই এমন পররাষ্ট্রনীতি বর্জন করেছেন যা তারা এবং তাদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোত্তম স্বার্থে প্রয়োজন বলে মনে করতেন। আর এর বলি হয়েছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ।

বিভিন্ন সংস্থা, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত এই লবি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে সরাসরি ইসরায়েলের স্বার্থে চালিত করে, যা মূলত ইসরায়েলি সরকারগুলোর প্রত্যক্ষ পরামর্শ ও নির্দেশনায় গড়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে বিশাল অর্থ ও মনোযোগ ব্যবহার করে এরা রাজনীতিবিদদের উপহার বা শাস্তি দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে।

ট্রুম্যানের ঘটনার ২০ বছর পর, প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির এক পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেন। ফোর্ড ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার দুই বছরের ব্যর্থ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং ইসরায়েলের অনড় মনোভাবের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

কিসিঞ্জারের গঠিত ওয়াইজ ম্যান কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে পরামর্শ দেয় যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় এক সামগ্রিক শান্তির জন্য পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলকে সরে আসতে চাপ দিতে হবে।

ফোর্ড এই সুপারিশ মেনে নিচ্ছেন—এমন স্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েই কনফারেন্স অব প্রেসিডেন্টস অব মেজর আমেরিকান জুয়িশ অর্গানাইজেশনস এবং আইপ্যাক (Aipac)-এর মতো ইসরায়েলি লবিগুলো প্রবল আন্দোলন শুরু করে। আইপ্যাকের খসড়া করা এক চিঠিতে ৭৬ জন সেনেটর স্বাক্ষর করে ফোর্ডকে বার্তা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যেন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে তারা ইসরায়েলের পাশেই দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

কূটনীতিতে বাধা দিতে ইসরায়েলের এই লবি ব্যবহারের কৌশলে ফোর্ড তীব্র ক্ষুব্ধ হন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যান। পরের বছরের নির্বাচনে নিজের জয়ের সম্ভাবনা রক্ষায় তিনি কমিটিগুলোর সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে পুরোনো কৌশলেই ফিরে যান। এর অধীনে ১৯৬৭ সালে মিসরের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সিনাই উপদ্বীপের কিছু অংশ ইসরায়েলের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সাহায্যের বিনিময়ে কিনে নিয়ে আবার মিসরকে ফেরত দেওয়া হতে থাকে। ফোর্ড ও কিসিঞ্জার ইসরায়েলকে সহায়তার পরিমাণ অভূতপূর্ব মাত্রায় বাড়িয়ে দেন।

১৯৭৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত এক চুক্তি ও গোপন চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিসিঞ্জারের সহযোগীরা তাকে চোখ কপালে ওঠার মতো ও অবিশ্বাস্য বলে বর্ণনা করেছিলেন। ফোর্ড তার আত্মজীবনীতে তিক্ততার সাথে লিখেছেন কীভাবে তিন- চতুর্থাংশ সেনেটরের স্বাক্ষর করা আইপ্যাকের সেই চিঠি তার কূটনৈতিক পরিকল্পনা ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।

পরের নির্বাচনে ফোর্ড জিমি কার্টারের কাছে হেরে যান। কার্টার ৭১% ইহুদি ভোট পেয়েছিলেন, তাই লবি আশা করেছিল তিনি সব ভুলে যাবেন। কিন্তু কার্টার ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়ে ১৯৭৭ সালের মার্চে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন।

প্রো-ইসরায়েল লবি অবিলম্বে কার্টারের শান্তি উদ্যোগের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। জুনের শুরুতে প্রেসিডেন্টের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ৫০ পৃষ্ঠার এক গোপন স্মারকপত্রে কার্টারকে সতর্ক করেন যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নিয়ে কথা বললে তিনি পুনর্নির্বাচনে দলের মনোনয়ন হারানোসহ মারাত্মক পরিণতি ভোগ করবেন। তা সত্ত্বেও কার্টার তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রাবিনের অনমনীয় মনোভাবের সমালোচনা অব্যাহত রাখেন। মে মাসে ক্ষমতায় আসা মেনাখেম বেগিনের সঙ্গে তার মতপার্থক্য আরও তীব্র হয়।

১৯৭৭ সালের অক্টোবরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইরাস ভ্যান্স এবং সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো যৌথভাবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানের ঘোষণা দেন। তবে এই যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলি সরকার এবং লবি এতটাই ক্ষিপ্ত হয় যে প্রশাসন স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক ক্ষতি সামলাতে কার্টার নিউ ইয়র্কে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশে দায়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন।

কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জবিগনিউ ব্রেজেজিনস্কির মতে, ওই বৈঠকে মোশে দায়ান একপ্রকার ব্ল্যাকমেইল করে প্রেসিডেন্টকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন পশ্চিম তীরের বিরোধিতা করবে এবং আমাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেবে—এমন নিশ্চয়তা না দিলে আমি প্রকাশ্যে আমেরিকান ইহুদিদের দরবারে গিয়ে সব বলব। এই সরাসরি হুমকির মুখে কার্টার আত্নসমর্পণ করতে বাধ্য হন।

পরদিনই ভ্যান্স ও দায়ান যৌথ বিবৃতি দিয়ে জানান, ফিলিস্তিনি মাতৃভূমির বিষয়টি বাদ দিয়ে আলোচনা অত্যন্ত সীমিত পরিসরে হবে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল ও মিসরের মধ্যে পৃথক শান্তি চুক্তি হয়, যার জন্য কার্টার, বেগিন ও সাদাত নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তবে এই চুক্তি আরব বিশ্বে মিসরকে একঘরে করে ফেলে এবং সাদাতকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। এটি ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণ এবং পশ্চিম তীর ও গাজাকে কার্যত দখলের পথ প্রশস্ত করে।

১৩ বছর পর প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলন সফল করতে তিনি অধিকৃত অঞ্চলে ঘরবাড়িতে ব্যবহৃত ইসরায়েলের ঋণ গ্যারান্টি স্থগিত করলে লবির তীব্র আক্রমণের শিকার হন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ক্যাপিটল হিলে খুব শক্তিশালী ও কার্যকর কিছু গ্রুপের মুখোমুখি। আজকে আমি শুনেছি প্রায় এক হাজার লবিস্ট সেখানে আমাদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কাজ করছে, আর এখানে আমরা মাত্র একলা একজন লোক লড়াই করছি।’

ওবামা প্রশাসনের আমলে প্রেসিডেন্টদের শান্তি উদ্যোগ নস্যাৎ করার লবির ক্ষমতা আবারও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সম্পর্কে বারাক ওবামার মতো এত বিস্তারিত জ্ঞান ও জানাশোনা নিয়ে আর কোনো প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে আসেননি। তিনি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন পুরোপুরি বন্ধ করার আহ্বান জানান।

কিন্তু এতে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের লবি প্রধানদের মাঝে ক্ষোভের ঝড় ওঠে। ওবামা ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার প্রকাশ্যে বাকযুদ্ধ ওবামার জন্যই বেশি ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। ওবামা দ্রুত তার পথ পরিবর্তন করেন এবং ফিলিস্তিনবান্ধব হিসেবে পরিচিত জর্জ মিচেলকে সরিয়ে লবি ঘনিষ্ঠ ডেনিস রসকে দায়িত্ব দেন। 

উল্টো, জাতিসংঘে যেন ফিলিস্তিন বসতিবিরোধী প্রস্তাব না তোলে, সে জন্য ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ফোন করে ৪৫ কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা বন্ধের হুমকি দেন ওবামা। দ্বিতীয় মেয়াদের জাতিসংঘ ভাষণে ওবামা সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে ইসরায়েলের অবস্থানের সাথে তাল মেলান।

তার আত্মজীবনী ‘এ প্রমিজড ল্যান্ড’-এ ওবামা লিখেছেন, কীভাবে আইপ্যাক মার্কিন নেতাদের ‘অ্যান্টিসেমিটিক’ (ইহুদিবিদ্বেষী) তকমা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘লুইস ফাররাখানের মতো একই এলাকায় থাকা মুসলিম নামধারী এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি" হিসেবে তিনি নিজেও এই হুমকির মুখে কতটা ভঙ্গুর ছিলেন।

সম্প্রতি জো বাইডেনের মধ্যেও ইসরায়েল লবি এমন এক প্রেসিডেন্টকে পেয়েছিল, যিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ সম্পর্ক প্রাপ্য। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর ইসরায়েলের নির্বিচার আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে সেই বিশ্বাসের কঠিন পরীক্ষা হয়।

ওবামা ইসরায়েলকে কঠিন ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে কী পরিমাণ রাজনৈতিক শাস্তির মুখে পড়েছিলেন তা বাইডেন ভুলেননি। ফলে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের সব কার্যকর পরামর্শ তিনি বাতিল করে দেন। তিনি যখনই বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে মৃদু আপত্তি তুলেছেন বা অস্ত্র সরবরাহে সামান্য বিলম্ব করেছেন, অমনি রিপাবলিকান জুয়িশ কোয়ালিশন ও আইপ্যাক তার ওপর তীব্র আক্রমণ চালিয়েছে।

আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের অসাধারণ দূরদর্শিতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এসব ঘটনা। তার বিদায়ী ভাষণে ওয়াশিংটন সতর্ক করেছিলেন যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি ‘অন্ধ আবেগ বা তীব্র অনুরাগ’ থাকলে মার্কিন শাসনব্যবস্থা খুব সহজেই সেই গোষ্ঠীর দ্বারা ব্যবহৃত হতে পারে। এমন গোষ্ঠী দেশকে নিজের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে বিপজ্জনক প্রতিশ্রুতি ও যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে।

গাজা, লেবানন ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি গণহত্যা ও তাণ্ডবের পর আমেরিকার রাজনীতির দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। গাজায় সহিংসতা বন্ধ না করায় জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিসকে রাজনৈতিকভাবে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। ২০২০ সালে বাইডেনকে ভোট দেওয়া কিন্তু ২০২৪ সালে হ্যারিসকে ভোট না দেওয়া ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশ জানিয়েছেন, গাজায় ইসরায়েলি সহিংসতা বন্ধ না হওয়াটাই ছিল তাদের সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। উভয় দলের সমর্থকদের মধ্যেই ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে; ৬০ শতাংশ আমেরিকানই এখন ইসরায়েলকে নেতিবাচক চোখে দেখে।

অবশ্য এই ক্ষতি সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এড়িয়ে চলার ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাতিল করতে লবি তাদের চেষ্টা থামায়নি। তারা রাজনীতিতে ইসরায়েল-সমালোচকদের উত্থান ঠেকাতে কোটি কোটি ডলার খরচ করে চলেছে।

অবশ্য আমেরিকান সমর্থকদের মতপ্রকাশের পুরো অধিকার রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টদেরও নিজস্ব স্বাধীনতা আছে, যেমন জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন বা ট্রাম্প নিজেও ইসরায়েলি চাপের কাছে নতি স্বীকারের জন্য দায়ী।

তবে অ্যান্টিসেমিটিজম বা ইহুদিবিদ্বেষের তকমার ভয় ছাড়া অন্য গোষ্ঠীগুলো যদি মুক্তভাবে কাজ করতে না পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতি মারাত্মকভাবে বিকৃতই থেকে যাবে। বিদেশে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং দেশে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা—উভয় কারণেই আমেরিকানদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে কোনো বিদেশি শক্তি মার্কিন নীতিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।

তথ্যসুত্র: দ্য গার্ডিয়ান

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে বেসামরিক ৩৪২ পদে বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
রাত ১২টায় শেষ হচ্ছে ‘রোবোফিশন ১.০’-এর নিবন্ধন
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রেসিডেন্টস চ্যালেঞ্জ কাপে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিল…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
বিক্রয় ও মুনাফায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিতে কর্মকর্তাদের পুরস…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক মো. আকিকুর রহমান আর নেই
  • ০২ আগস্ট ২০২৬
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অং…
  • ০২ আগস্ট ২০২৬