পশ্চিম তীরে গুলিতে একই পরিবারের ৪ ফিলিস্তিনিসহ ২ ইসরায়েলি নিহত

২৫ জুলাই ২০২৬, ১০:১১ AM
 ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স

ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স © সংগৃহীত

অধিকৃত পশ্চিম তীরের তাল গ্রামে ভয়াবহ সংঘর্ষে একই পরিবারের চার ফিলিস্তিনিসহ দুই ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। কয়েক মাসের মধ্যে পশ্চিম তীরে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক সহিংসতার ঘটনা। তবে সংঘর্ষ কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে।

শুক্রবার উত্তরাঞ্চলের তাল গ্রামে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের দাবি, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা (সেটলার) গ্রামে হামলা চালালে তাদের প্রতিরোধ করতে এগিয়ে যান বাসিন্দারা। পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালায়।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা ওই এলাকায় ভ্রমণে যাওয়া কয়েকজন ইসরায়েলির ওপর হামলার খবর পেয়ে সেখানে যায়। সেনাবাহিনীর দাবি, এক ফিলিস্তিনি একটি নিরাপত্তারক্ষীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করেন। পরে সেনারা ওই হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করে। আইডিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত চার ফিলিস্তিনি একই পরিবারের সদস্য ছিলেন।

এ ঘটনায় আরও একজন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন। তবে কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

ঘটনার পর আইডিএফ জানায়, এলাকায় তারা ‘বিস্তৃত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর থেকেই পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ও তাদের সম্পত্তির ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আহমেদ জেইদান বিবিসিকে বলেন, শুক্রবার সকালে প্রায় ৩০ জন বসতি স্থাপনকারী তাল গ্রামের ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের প্রতিরোধ করতে এগিয়ে যান।

তার ভাষ্য, ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতিতেই দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাসীন ফাতাহ আন্দোলনের স্থানীয় নেতা ইসাম সাইফি রয়টার্সকে বলেন, বসতি স্থাপনকারীরা প্রথমে গুলি চালায়। পরে ইসরায়েলি বাহিনী ঘটনাস্থলে এসে তারাও গুলি শুরু করে।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের পাশাপাশি আরও কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

তবে আইডিএফ দাবি করেছে, হামলার সূচনা করেছিলেন ফিলিস্তিনিরাই।

সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা খবর পায় যে ওই এলাকায় ঘুরতে যাওয়া ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা হয়েছে। ওই এলাকার একটি অংশ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং অন্য অংশ প্রশাসনিকভাবে ফিলিস্তিনিদের অধীনে থাকলেও নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসরায়েলের।

আইডিএফ আরও জানায়, ওই ভ্রমণের বিষয়ে আগে থেকে তাদের জানানো হয়নি।

তাদের দাবি, কাছের একটি বসতি থেকে আসা এক নিরাপত্তারক্ষীর অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় এক ফিলিস্তিনি। পরে সেই অস্ত্র দিয়েই নিরাপত্তারক্ষীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

আইডিএফ জানায়, এরপর সেনারা ‘সন্ত্রাসী হামলা চালানো ব্যক্তিকে নির্মূল করে’। সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ বলেন, একই পরিবারের চার সদস্য ‘গুলিবিনিময়ের সময়’ নিহত হয়েছেন।

ঘটনার দুটি ভিডিও স্থানীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও বিবিসি স্বাধীনভাবে ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনা ও বেসামরিক পোশাকে থাকা সশস্ত্র ইসরায়েলিদের মুখোমুখি অবস্থান। গুলির শব্দের মধ্যে কয়েকজন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক, এমনকি শিশুরাও ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে। পরে বেসামরিক পোশাকে থাকা সশস্ত্র কয়েকজন ইসরায়েলি দুই ফিলিস্তিনিকে ধাক্কা ও লাথি মারছে।

অন্য ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ফিলিস্তিনি একটি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের একজন অস্ত্রটি নিজের দখলে নিতে সক্ষম হন। এরপর চারদিকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং একের পর এক গুলির শব্দ শোনা যায়। ওই ব্যক্তি অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়েন, একই সময় সেনারাও পাল্টা গুলি চালায়।

আইডিএফ জানিয়েছে, ২৭ বছর বয়সী এক ইসরায়েলি সেনা ‘অভিযান চলাকালে’ নিহত হয়েছেন। তবে তার মৃত্যুর পরিস্থিতি এখনো স্পষ্ট নয়।

ইসরায়েলের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, নিহতদের পাশাপাশি আরও দুই ইসরায়েলি আহত হয়েছেন।

ঘটনার পর ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাল গ্রামের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

তারা বলেছে, ‘সেটলারদের সন্ত্রাসবাদের এই ভয়াবহ বৃদ্ধি ইসরায়েলি সরকার ও দখলদার বাহিনীর দেওয়া সুরক্ষা, রাজনৈতিক সমর্থন এবং সম্পূর্ণ দায়মুক্তির সরাসরি ফল।’

আরও বলা হয়েছে, ‘ইসরায়েলের সরকারি উসকানি অব্যাহতভাবে এসব অপরাধকে উৎসাহিত করছে এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কোনো জবাবদিহি ছাড়াই বেড়ে চলেছে।’

বার্তা সংস্থা এএফপির একজন প্রতিবেদক জানিয়েছেন, নাবলুস শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘটনাস্থলের আশপাশে সেনারা সড়ক অবরোধ করেছে এবং আরও সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করতে তল্লাশি চালাচ্ছে।

পরে আইডিএফ জানায়, তারা নাবলুসের একটি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে গুলির ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চিকিৎসা নিতে আসা দুই ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী এবং তাদের পরিকল্পনাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ব্যবস্থা নেব।’

এরপর তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন এবং হাভাত গিলাদ বসতির কাছে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেন।

নেতানিয়াহুর কার্যালয় ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাল গ্রামের অভিযুক্ত ফিলিস্তিনি হামলাকারীর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন ইহুদি বসতি বৈধ করার এবং নতুন বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা হবে।

এই ধরনের বসতিগুলো সাধারণত পাহাড়ের চূড়ায় কয়েকটি অস্থায়ী ঘর বা ক্যারাভ্যান বসিয়ে গড়ে তোলা হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এগুলো অবৈধ। এমনকি সরকারি অনুমোদন ছাড়া নির্মিত এসব বসতি ইসরায়েলের নিজস্ব আইনেও বৈধ নয়।

ইসরায়েলের ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা এবং আইডিএফের রিজার্ভ মেজর জেনারেল ইয়াইর গোলান এক্সে লিখেছেন, ‘নেতানিয়াহু ও কাটজের যৌথ বিবৃতি স্পষ্টভাবে পুরো অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

তাল গ্রামের ঘটনার পর উত্তর পশ্চিম তীরের আরও কয়েকটি গ্রামে সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফারাতা গ্রামে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত একজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, ‘হত্যাকারীদের গ্রামগুলোর সঙ্গে গাজার মতোই আচরণ করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক নিহত ইহুদির বিনিময়ে শত্রুপক্ষকে জমি ও ঘরবাড়ি হারানোর মূল্য দিতে হবে।’

ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সংঘর্ষে পশ্চিম তীরে নিয়মিত হতাহতের ঘটনা ঘটলেও, ফিলিস্তিনিদের হাতে ইসরায়েলি নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ১ হাজার ১১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৩৫টি মৃত্যু বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত।

একই সময়ে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের হামলা অথবা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ৪১ জন ইসরায়েলি—যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন—নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। এরপর থেকে সেখানে শত শত ইহুদি বসতি গড়ে উঠেছে, যেখানে বর্তমানে প্রায় সাত লাখ ইহুদি বসবাস করছেন। একই এলাকায় প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনিও বসবাস করেন। ফিলিস্তিনিরা পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ।

বঙ্গোপসাগরে ফের লঘুচাপ—উপকূলে সতর্কতা জারি
  • ২৫ জুলাই ২০২৬
মাছ ধরে কনটেন্ট বানান, সাগরে ডুব দিতেই হাঙরের হামলা; ৪ অস্ত…
  • ২৫ জুলাই ২০২৬
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়াই যে কারণে অনশন ভাঙলেন সোনম ওয়াং…
  • ২৫ জুলাই ২০২৬
রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে যুবদল কর্মী নিহত, গুলিবিদ্ধ ২
  • ২৫ জুলাই ২০২৬
মেট্রোরেল দেখে শেখ হাসিনা কেঁদেছিলেন আজ
  • ২৫ জুলাই ২০২৬
আসামে বন্যায় আরও ১৪ জনের মৃত্যু, মৃত বেড়ে ৬১
  • ২৫ জুলাই ২০২৬