দুবাইয়ে নতুন বন্দর নির্মাণ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড © সংগৃহীত
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট সংকট ও এর ওপর নির্ভরতা কমাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব উপকূলে নতুন বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করছে দেশটির বহুজাতিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ লক্ষ্যে ফুজাইরাহ উপকূলে একটি নতুন বহুমুখী বন্দর এবং একই আমিরাতের বিদ্যমান বন্দরে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সাথে আলোচনা চলছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বিগত দুই দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দর ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে ডিপি ওয়ার্ল্ড আমিরাতের অন্যতম শীর্ষ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে দুবাইয়ের বিখ্যাত ‘জেবেল আলি বন্দর’ প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, যা দুবাইকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা রেখেছে। তবে এই প্রথম বন্দরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম দুবাইয়ের বাইরে অন্য কোনো আমিরাতে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা দেশটির লজিস্টিকস ও বাণিজ্য খাতে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি মোকাবিলায় হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর যে বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আবুধাবি নিয়েছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই উদ্যোগ মূলত তারই অংশ। বিশেষ করে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এবং অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই বিকল্প ভাবা হচ্ছে।
ফুজাইরাহ উপকূলে নতুন বন্দরটি নির্মিত হলে ওমান উপসাগরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জাহাজগুলোকে আর হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমা ব্যবহার করতে হবে না। ওমান উপসাগরের নতুন বন্দরে পণ্য খালাসের পর সেগুলো সরাসরি সড়কপথে ট্রাকে করে দুবাই, আবুধাবি এবং প্রতিবেশী অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিরাপদে পরিবহন করা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করলে অঞ্চলটির বৃহত্তম কনটেইনার বন্দর জেবেল আলির বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এরপর থেকেই বিকল্প পথের জন্য তীব্র চাপ তৈরি হয়। সংঘাতের সময় আমিরাতও ইরানের হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল। দেশটির দিকে প্রায় তিন হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল। সংঘাতের শুরুতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দ্বারা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় সেটির জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ জেবেল আলি বন্দরে আছড়ে পড়লে সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছিল।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানান, এই নতুন বন্দরটির নির্মাণকাজ শুরু হলে তা আগামী মাত্র দেড় বছরের (১৮ মাস) মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব। বর্তমানে প্রকল্পের শর্তাবলি ও রূপরেখা নিয়ে আমিরাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত কাঠামো ও অর্থায়নের বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, ফুজাইরাহতে নতুন বন্দর নির্মাণের অর্থ এই নয় যে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের গুরুত্ব বা ঐতিহ্য কমে যাবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, জেবেল আলি জেবেল আলিই থাকবে। এর বাণিজ্যিক পরিধি বা কার্যক্রম কখনও ছোট করা হবে না।’
তিনি আরও যোগ করেন, প্রাথমিকভাবে ফুজাইরাহতে নতুন স্থাপনাগুলো গড়ে তোলা হবে। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অতিরিক্ত সক্ষমতার প্রয়োজন হলে সেগুলো আরও সম্প্রসারণ করা হতে পারে। তবে বর্তমানের যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেলে এটি মূলত একটি কৌশলগত ‘প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে কাজ করবে।