গাছ উপহার পেলেন মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীরা © সৌজন্য প্রাপ্ত
ভালো ফলাফল শুধু কয়েকটি সংখ্যা কিংবা গ্রেডের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং অভিভাবকদের প্রত্যাশা। সেই সাফল্যের সঙ্গে যখন যুক্ত হয় নৈতিকতা, মানবিকতা ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ, তখন তা হয়ে ওঠে আরও অর্থবহ।
দাখিল পরীক্ষা-২০২৬-এর ফলাফলে এমনই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে পাবনা শহরের ঐতিহ্যবাহী পাবনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ফল প্রকাশের দিন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের হাতে প্রচলিত উপহারের পরিবর্তে গাছের চারা তুলে দিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষার্থীদের বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার এই উদ্যোগে ফলাফলের আনন্দ যেন পরিণত হয়েছে সবুজের বার্তায়।
চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় সারাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর বিপরীতে পাবনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার পাসের হার ৯৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির ১৫৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৬ জন। এ গ্রেড পেয়েছে ৬৪ জন, এ-মাইনাস ২৮ জন, বি গ্রেড ৬ জন এবং সি গ্রেড পেয়েছে ২ জন।
ফলাফলের দিক থেকে বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছে মাদ্রাসাটির বিজ্ঞান ও সাধারণ বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞান বিভাগের ৩৬ জন এবং সাধারণ বিভাগের ১০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। অর্থাৎ ইসলামি শিক্ষার পরিবেশে থেকেও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা মেধার উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে এই ফলাফল তারই উদাহরণ।
তবে এবারের সাফল্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়া। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ প্রিন্সিপাল ইকবাল হোসাইন শিক্ষার্থীদের ফলাফলের আনন্দকে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আরও অর্থবহ করে তুলতে এ উদ্যোগ নেন। প্রচলিত উপহারের বদলে পরিবেশবান্ধব উপহার হিসেবে গাছের চারা হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উৎসাহ। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
একটি উপহার শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া সহজ হলেও সেই উপহারের মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করা এবং একটি সবুজ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো নিঃসন্দেহে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর দায়িত্বের অংশ। এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মাদ্রাসাটি যেন বার্তা দিয়েছে—শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই, শ্রেণিকক্ষ কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নৈতিকতা, মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ব ও পরিবেশ সচেতনতাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী এবং ৮৩ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত পাবনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা দীর্ঘদিন ধরে পাবনার শিক্ষা অঙ্গনে স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে। ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় পর্যায়ে সেরা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের গৌরবও রয়েছে মাদ্রাসাটির।
১৯৯৩ সালে দারুন আমান ট্রাস্টের মাধ্যমে তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদ মাওলানা আব্দুস সুবহান পাবনা শহরে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখে আসছে মাদ্রাসাটি। বর্তমানে মূল শাখার পাশাপাশি রয়েছে মহিলা শাখাও। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সামাদ বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশের পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলাই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের সাফল্যকে সমাজ ও পরিবেশের কল্যাণে কাজে লাগানোর এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
প্রিন্সিপাল ইকবাল হোসাইন বলেন, একজন শিক্ষার্থী শুধু ভালো ফল করবে এটাই শেষ কথা নয়; তাকে ভালো মানুষ হতে হবে, সমাজের জন্য কাজ করতে হবে এবং দেশ ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। তার এই চিন্তার বাস্তব প্রতিফলনই দেখা গেছে ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়ার উদ্যোগে।
পাবনা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার এবারের দাখিল ফলাফল শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের চিত্র নয়; এটি মাদ্রাসা শিক্ষার সম্ভাবনারও একটি উদাহরণ। ইসলামি মূল্যবোধের পাশাপাশি বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও হতে পারে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
ফল প্রকাশের আনন্দে শিক্ষার্থীদের হাতে একটি গাছের চারা তুলে দিয়ে মাদ্রাসাটি যেন একটি প্রতীকী বার্তাই দিয়েছে শিক্ষার আলো যেমন ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে, তেমনি আজকের একটি গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি করতে পারে নিরাপদ ও সবুজ পৃথিবী।