অর্থের বিনিময়ে খাতায় লিখিয়ে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ পরীক্ষকের বিরুদ্ধে © প্রতীকী ছবি
পরীক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে নিয়ে অর্থের বিনিময়ে খাতায় লিখিয়ে তার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের তদন্তে কমিটি গঠন করেছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার একজন পরীক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রউফ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়, ‘দৈনিক আজকের পত্রিকা’র ১৭ সেপ্টেম্বরের সংখ্যায় ‘বাসায় ডেকে পরীক্ষার্থীকে খাতায় লেখালেন পরীক্ষক’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা-২০২৬-এর পরীক্ষক মো. সেকেন্দার আলী (হাজী জমির উদ্দিন শাকিনা মহিলা ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী) ফোনের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের ডেকে টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার খাতায় লিখিয়ে নম্বর বৃদ্ধি করেছেন।
এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের জন্য বোর্ডের নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) মো. ইব্রাহিম হোসেনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রধান মূল্যায়ন অফিসার (চলতি দায়িত্ব) এস.এম. গোলাম আজম, প্রোগ্রামার মো. সিরাজুল ইসলাম, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (উচ্চ মাধ্যমিক) (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোছা. সেলিনা পারভীন এবং উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) মো. জাহিদুর রহিম।
অফিস আদেশে তদন্ত কমিটিকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারীর কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
যা ঘটেছিল
এইচএসসি পরীক্ষার খাতায় নিজের মোবাইল নম্বর লিখে এসেছিল এক পরীক্ষার্থী। সেই নম্বরের সূত্র ধরেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন পরীক্ষক। পরে পরীক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে খাতা দেখিয়ে জানান, এতে নম্বর হয়েছে ২৫। এরপর ২ হাজার টাকা দিলে খাতা তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় লেখার জন্য। পরীক্ষার্থীর দাবি, ভুলগুলো ঠিক করে ও ফাঁকা জায়গা পূরণ করে খাতা জমা দেওয়ার পর তাঁর নম্বর ৫০-এর বেশি হয়েছে।
গত ১৪ আগস্ট সকালে রাজশাহীতে ঘটে এ ঘটনা। ওই পরীক্ষার্থীর নাম মেহেদী হাসান। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর এলাকার আইডিয়াল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী এবার মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। পুরো ঘটনার কথা স্বীকার করেছে সে।
সেদিন রুহুল আমিন নামের এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ওই পরীক্ষকের বাসায় গেলেও পরীক্ষকের পরিচয় জানাতে পারেনি মেহেদী। তবে ‘আজকের পত্রিকা’র অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই পরীক্ষকের নাম সেকেন্দার আলী। তিনি রাজশাহী নগরের হাজী জমির উদ্দীন সাফিনা মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইংরেজির প্রভাষক। মেহেদীর সঙ্গে সেকেন্দার আলীর কথোপকথনের রেকর্ড শুনে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হক মণ্ডলও নিশ্চিত করেছেন, রেকর্ডের কণ্ঠটি সেকেন্দার আলীর।
পরীক্ষকের সঙ্গে দেখা করার আগেই মেহেদীর মোবাইলে তাঁর সঙ্গে কথোপকথন হয়। ওই ফোনকলের রেকর্ডে শোনা যায়, সেকেন্দার আলী টাকা নিয়ে মেহেদীকে তাঁর কাছে যেতে বলেন। একইসঙ্গে বিষয়টি অভিভাবকদের জানাতেও নিষেধ করেন তিনি।
একপর্যায়ে মেহেদী বলে, টাকা দিতে হলে বিষয়টি অভিভাবককে জানাতে হবে। জবাবে পরীক্ষক বলেন, ‘একজন ভিক্ষুকের কাছেও ২-১০-২০ হাজার টাকা থাকে।’ এর জবাবে মেহেদী বলে, ‘স্যার তো বুঝতে পারছেন, আমরা তো বেকার ছেলে, ভিক্ষুক না। ভিক্ষুকের কাছে তো টাকা থাকবেই, আমরা তো বেকার।’ এরপর পরীক্ষক বলতে থাকেন, ‘না না ঠিক আছে। আরও ক্যান্ডিডেটদের নিয়ে আসো।’
গত ১৪ আগস্ট সকালে মেহেদী, ইমন আলী, সৌরভ, রুহুল, সোহাগ ও সামিসহ ছয়জন রাজশাহীর বিনোদপুর বাজারে যায়। কিছুক্ষণ পর একটি মোটরসাইকেলে করে সেখানে আসেন পরীক্ষক। তিনি মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ছিলেন। এরপর তাঁকে অনুসরণ করে পরীক্ষার্থীরা তাঁর বাড়িতে যায়। সেখানে পরীক্ষার্থীদের খাতা বের করে দেওয়া হয়।
মেহেদীর মোবাইল নম্বর লেখা খাতাটি সহজেই পাওয়া গেলেও রুহুলের খাতা পাওয়া যায়নি। বাজারে অপেক্ষা করা অন্য সহপাঠীদের খাতাও পাওয়া যায়নি।
১৪ আগস্ট দুপুরে মেহেদীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। সে জানায়, মোটরসাইকেলে প্রায় ১০ মিনিটে পরীক্ষকের বাড়িতে পৌঁছায় তারা। তবে জায়গাটি সে চেনে না। খাতায় লেখা শেষ হওয়ার পর পরীক্ষক নিজেই তাঁদের বিনোদপুরে রেখে যান।
মেহেদীর ভাষ্য, পরীক্ষক তাঁদের নিজের নাম জানাননি। এমনকি তাঁর মোবাইল নিয়ে নিজের নম্বরটিও মুছে দেন। মেহেদী বলে, ‘আমার খাতায় ২৫ মার্ক ছিল। স্যার ২ হাজার টাকা নিয়েছে। খাতায় লিখতে দিল। যেগুলো ভুল লিখেছিলাম, সেগুলো ঠিক করে দিয়েছি। আর যেটা লিখিনি, সেটা ফাঁকা জায়গায় লিখে দিয়েছি।’ এখন কত নম্বর হয়েছে জানতে চাইলে সে বলে, ‘৫০ প্লাস হবে।’
পরীক্ষককে শনাক্ত করতে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, ১৪ আগস্ট পরীক্ষক যে মোটরসাইকেলে এসেছিলেন, সেটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর রাজশাহী-হ ১৫-২৪০৫।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলটির রেজিস্ট্রেশন সুজন কুমার বিশ্বাসের নামে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অনেক আগেই তিনি মোটরসাইকেলটি বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, মোটরসাইকেলটি তিন হাত বদল হয়েছে। একপর্যায়ে এর বর্তমান মালিক রফিকুল ইসলাম সেন্টুর সন্ধান পাওয়া যায়। সেন্টু ওই প্রভাষকের আত্মীয়। তাঁর বাড়ি চারঘাট উপজেলার কাকালকাটি গ্রামে। গত ৫ সেপ্টেম্বর সেন্টুর বাড়ির সামনেই মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়। স্থানীয় এক ব্যক্তিকে মোটরসাইকেলের ছবি দেখানো হলে তিনি প্রভাষক সেকেন্দার আলীর পরিচয় নিশ্চিত করেন। তাঁর বাড়ি বেলঘরিয়া গ্রামে।
সেদিন বিকেলে সেকেন্দার আলীকে তাঁর বাড়িতেই পাওয়া যায়। তাঁকে মেহেদীর সঙ্গে হওয়া ফোনকলের রেকর্ড ও মোটরসাইকেলের ছবি দেখানো হয়। তবে পরীক্ষার্থীকে বাসায় নিয়ে টাকার বিনিময়ে খাতায় লেখানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
হাজী জমির উদ্দীন সাফিনা মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হক মণ্ডল বলেন, অনেক আগে থেকেই তাঁর কলেজের ইংরেজির প্রভাষক সেকেন্দার আলী এইচএসসির খাতা দেখেন। তবে তিনি এ ধরনের কাজ করেন এ বিষয়ে তিনি জানেন না। শিক্ষা বোর্ড এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে বললে তিনি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। মেহেদীর সঙ্গে সেকেন্দার আলীর কথোপকথনের রেকর্ড শুনেও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কণ্ঠটি সেকেন্দার আলীর বলে নিশ্চিত করেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. শামীম আরা চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘এমন হলে এটা তো খুবই ভয়াবহ ঘটনা। আমরা এটা কোনোভাবেই বরদাশত করব না।’ পরে পরীক্ষকের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে যথাযথ প্রমাণ পায় রাজশাহী বোর্ড। এরই প্রেক্ষিতে আজ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।