বিশ্বের অর্ধেক সিগারেট পোড়ে চীনে © সংগৃহীত
এক সময় চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ধুমপায়ী ছিলেন। ধুমপান ছেড়েছেন বহু বছর আগেই। ২০১২ সালের বেইজিংয়ে বিল গেটসের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ধূমপান ছাড়ার পর থেকে তিনি অনেক বেশি সুস্থ বোধ করছেন। সেদিনের বৈঠকে তামাক সেবন চীনের অন্যতম বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করে তামাক নিয়ন্ত্রণে 'কিছু একটা করার' প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সিগারেট ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে এখনো শীর্ষে রয়েছে চীন। এ ছাড়া বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সিগারেট পোড়ে এখন খোদ চীনেই।
জানা যায়, ২০১২ সালের পরে শি জিনপিংয়ের স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকেও ধূমপানবিরোধী প্রচারণায় দেখা যায়। কিন্তু ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও চীনে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে খুব সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বেইজিংয়ের ইউনিভার্সিটি অভ ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের অধ্যাপক ঝেং রং-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, চীনা উৎপাদনকারীদের প্রতিটি সিগারেট বিক্রি থেকে আসা আয়ের প্রায় অর্ধেকই যায় সরকারি কোষাগারে।
চীনা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের সাবেক কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠিত এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনে সিগারেট ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তা কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত সিগারেটের প্রায় অর্ধেকই ব্যবহৃত হয় চীনে।
এছাড়া চীনে বছরে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি সিগারেট বিক্রি হয়। যদিও ধূমপায়ীর হার কিছুটা কমেছে, তবে মোট সিগারেট বিক্রি ক্রমাগত বেড়েছে। দেশটিতে সিগারেটের দামও তুলনামূলক কম, ফলে ব্যবহার কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চীনে একটি প্যাকেট সিগারেটের গড় দাম প্রায় ৩ ডলার, যা অনেক উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের রাষ্ট্রীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দেশটির বড় তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাবই ধূমপান কমাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই খাত থেকে সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হয়, যা দেশের মোট আয়ের একটি বড় অংশ। শুধু ২০২৫ সালেই এ খাত থেকে প্রায় ২৪৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা দেশটির মোট সরকারি আয়ের প্রায় ৭ শতাংশের সমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে ২০২৪ সালের শহরের বাজেটের অর্ধেকের বেশিই এসেছে তামাক কর থেকে। মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের শহর চাংদে-তে ২০২২ সালে কর থেকে প্রাপ্ত আয়ের ২০ শতাংশই এসেছিল এই খাত থেকে।
এদিকে সমস্ত ইনডোর পাবলিক স্পেসই ধূমপানমুক্ত করার সুপারিশ ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। কিন্তু সেই প্রস্তাব থেকে রেস্তোরাঁ ও বারগুলোকে আগেই বাদ দেওয়া হয়েছিল। এরপর স্থানীয় তামাক ব্যুরো ধূমপানমুক্ত বিদ্যালয়ের আওতা আরও কমিয়ে নিয়ম কেবল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেই কার্যকর করার কমানোর প্রস্তাব দেয়। অবশ্য প্রবল জনরোষের জেরে ব্যুরোর সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
সরকারি উদ্যোগ থমকে যাওয়ায় তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে নারীরা নিজেদের উদ্যোগে প্রচার শুরু করেছেন। ২৩ বছর বয়সি ইনফ্লুয়েন্সার আলভা ঝাং একটি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউদিয়াও উইচ্যাট গ্রুপ তৈরি করেছেন। প্রকাশ্য স্থানে ধূমপায়ীদের মোকাবিলা করতে এবং কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে তিনি তার অনুসারীদের উৎসাহিত করছেন। আলভা বলেন, 'কিছু নিয়ম থাকলেও শাস্তির ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই আমি এবং আরও অনেকেই প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং অসহায়ত্ব অনুভব করেছি।'
এ ধরনের উদ্যোগে জনসমর্থন ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদের প্রতি উদাসীন ধূমপায়ীদের ব্যঙ্গ করে একটি অনুষ্ঠান করার পর এক নারী কমেডিয়ান দেশজুড়ে নজর কাড়েন। স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর প্রশংসাও কুড়ান। চীন সরকারের সমীক্ষায় শত শত মানুষ ধূমপান-সংক্রান্ত আরও কড়া নিয়মের পক্ষে মত দিয়েছেন।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যাথিউ কোরম্যান চীনে ধূমপান নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি জানান, দেশটির আর্থিক মন্দা সম্ভবত অনেক বেশি মানুষকে নিকোটিনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। 'মুড' ঠিক করতে একে 'কার্যকরী দাওয়াই' হিসেবে দেখছেন তারা। এছাড়া ধূমপানের বিধিনিষেধ প্রয়োগে শিথিলতাও প্রকাশ্য স্থানে সিগারেট সেবনকে আরও সহজ করে তুলেছে।
সিগারেট বিক্রি রোধে ব্যর্থতার কারণ কী
তরুণদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা কমার কারণে গত ১৩ বছরে দেশটিতে ধূমপায়ীর হার আনুপাতিকভাবে কমেছে ঠিকই, কিন্তু সিগারেটের বিক্রি বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। চীনে সিগারেটের দামও বেশ কম। এক প্যাকেট সিগারেটের গড় দাম ৩ ডলারের মতো, যা আমেরিকার তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
সিগারেটের বিক্রি কমানোর ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতার নেপথ্যে রয়েছে চীনের তামাক শিল্পের নিয়ন্ত্রক স্টেট টোব্যাকো মনোপলি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রভাব। পাশাপাশি দেশটির সবচেয়ে বড় সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল টোব্যাকো কর্পোরেশনও তাদেরই আওতাধীন।
চীনের আর্থিক প্রবৃদ্ধির গতি এখন স্লথ। রিয়েল এস্টেট খাতে দীর্ঘ মন্দার জেরে স্থানীয় সরকারগুলোর জমি বিক্রি বাবদ আয়ও তলানিতে। এ পরিস্থিতিতে তামাক শিল্প থেকে আসা রাজস্ব আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। এমনকি শি জিনপিংয়ের একাধিক কৌশলগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়িত করতেও এই সংস্থার বিপুল মুনাফাকে কাজে লাগানো হয়েছে।
গত বছর চীনের আর্থিক ব্যবস্থাকে চাঙা করতে দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি ব্যাংকে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে তারা। পাশাপাশি ১০০ বিলিয়ন ডলারের জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর বিনিয়োগ তহবিলেরও অন্যতম বড় সহায়তাকারী এই সংস্থা।
এই বিপুল আর্থিক প্রতিপত্তি পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবে। সংস্থাটির প্রধান প্রশাসক সরকারি উপমন্ত্রীর সমমর্যাদার। গত সাত বছরে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন সাবেক শীর্ষ প্রশাসক।
২০২২ সালে এই সংস্থা ভেপ-এর উপরও নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। ভেপ বিক্রির স্থান নির্দিষ্ট করে দেওয়া থেকে শুরু করে ফ্লেভারড ভেপ নিষিদ্ধ করার মতো কড়া নিয়ম জারি করে তারা। অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনে কিন্তু ভেপের ব্যবহার সিগারেটের চাহিদাকে কমাতে পারেনি। ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে বেইজিং সই করলেও, তার সবচেয়ে কঠোর বিধানগুলো কখনোই বাস্তবায়িত করেনি।
২০১৭ সালের দিকে প্রশাসন সবচেয়ে বড় জয় পায়। ইনডোর ধূমপান নিষিদ্ধ করার দেশব্যাপী দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে সে সময় তারা রুখে দেয়। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার দায়িত্ব ঠেলে দেওয়া হয় স্থানীয় সরকারগুলোর দিকে। সেই পর্যায়ে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা প্রায়ই দুর্বল।
বর্তমানে স্থানীয় ধূমপান-সংক্রান্ত অনেক নিয়মই কার্যত নখদন্তহীন। বিশেষত দেশটির অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলগুলোতে পরোক্ষ ধূমপান থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আমেরিকা বা অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সিগারেটের প্যাকেটে যেখানে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই এমন কড়া স্বাস্থ্য-সতর্কবার্তা দেওয়া থাকে, চীনে সেখানে পান্ডা বা 'গেট অব হেভেনলি পিস'-এর মতো জাতীয় প্রতীকের ছবির পাশে এক লাইনের নামমাত্র সতর্কবার্তা থাকে।
চীনা সিডিসি-র ২০২২ সালের এক গবেষণাপত্রে উপসংহারে বলা হয়, ধূমপান নিয়ন্ত্রণে দেশের এই ব্যর্থতার মূল কারণ হলো রাষ্ট্রায়ত্ত একচেটিয়া কারবারিদের হস্তক্ষেপ এবং তামাকের প্রতি সরকারের 'দ্ব্যর্থক মনোভাব'।