গরু © সংগৃহীত
ভারতে ‘গো-রক্ষার’ নামে মুসলিমদের ওপর চলমান সহিংসতা বন্ধ করতে বাঘের পরিবর্তে গরুকে ‘জাতীয় পশু’ হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলেছে দেশটির বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় মুসলিম সংগঠন। হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী এবং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষ থেকে এই দাবি দীর্ঘকাল ধরে করা হলেও, এবার মুসলিম সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এমন অবস্থান আসায় বিষয়টি নতুন করে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগ মুহূর্তে মুসলিম নেতাদের পক্ষ থেকে এই দাবি তোলা হলো।
দেশটির মুসলিম নেতাদের মতে, গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করা হলে সারা দেশে গো-হত্যার বিষয়ে একটি অভিন্ন ও একক আইনি কাঠামো তৈরি হবে, যার ফলে ‘গো-রক্ষার’ নামে মুসলিমদের ওপর দেশজুড়ে যে সহিংসতার ঘটনা ঘটে, তা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
অল ইন্ডিয়া মুসলিম জামায়াতের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা শাহাবুদ্দিন রাজভি বার্তা সংস্থা পিটিআইকে জানান, এ বিষয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে একটি যৌথ স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তারা এবং এর জন্য দিল্লিতে মুসলিম সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বৈঠকের আহ্বান করা হয়েছে। একই সুর শোনা গেছে অল ইন্ডিয়া শিয়া পার্সোনাল ল বোর্ডের মাওলানা ইয়াসুব আব্বাসের কণ্ঠেও, তিনি বলেন, গো-রক্ষার বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সব রাজ্যে একই রকম হওয়া উচিত, বৈষম্যমূলক নয়।
অন্যদিকে, জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দের একাংশের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানি জানান, তিনি ২০১৪ সালেও মুম্বাইয়ের একটি সর্বধর্ম সম্মেলনে এই দাবি তুলেছিলেন এবং তিনি গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করার পাশাপাশি এর জবাই ও ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের মাওলানা খালিদ রশিদ ফারাঙ্গি মাহালিও মনে করেন, হিন্দু ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই গরুকে এই মর্যাদা দেওয়া উচিত।
এই দাবির মাধ্যমে মুসলিম নেতারা আসলে মোদী সরকারের গো-রক্ষা রাজনীতির ভেতরের চরম বৈষম্যকে সামনে এনেছেন। কারণ ভারতে গো-রক্ষা দীর্ঘকাল ধরেই বিজেপি এবং তার মাতৃসংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা হলেও গরুর মাংস নিয়ে বিজেপির নীতিতে চরম বৈষম্য ও দ্বিমুখী আচরণ রয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিজেপি ভারতের সাংস্কৃতিক হেরিটেজ রক্ষার অংশ হিসেবে গো-রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। চলতি মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেখানেও ১৪ বছরের বেশি বয়সের গরু জবাইয়ের অনুমতি দেওয়ার আইন কার্যকর করার দাবি উঠেছে।
তবে মুসলিম নেতা এবং বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজ্যগুলোতে বিজেপি সরকার গো-হত্যার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপালেও গোয়া এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে, যেমন অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় তাদের অবস্থান বেশ শিথিল। সেখানে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ফ্রিজে গরুর মাংস পাওয়ায় ১১ জনের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া, কিংবা গরুর মাংস বহনের সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করার পর ৩ জনকে গ্রেফতার করার মতো ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয় না।
সমালোচকরা আরও বলছেন, একদিকে দেশে গো-হত্যার নামে কড়াকড়ি চলছে, অন্যদিকে বিজেপি সরকারের আমলেই ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং ভারতের শীর্ষ গরুর মাংস রপ্তানিকারকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ অনুদান পায় মোদীর বিজেপি।
ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের কাউসার হায়াত খান এই দাবিকে সমর্থন করে বলেন, বিজেপিশাসিত গোয়া, আসাম এবং উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে অবাধে গরুর মাংস খাওয়া হচ্ছে, অথচ উত্তর প্রদেশ বা উত্তরাখণ্ডে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, দেশজুড়ে একটি একক জাতীয় আইন থাকলে এই দ্বিমুখী নীতি, বিভ্রান্তি এবং গো-রক্ষার নামে মুসলিম যুবকদের পিটিয়ে হত্যার রাজনীতির চিরতরে অবসান ঘটবে।