বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ ঘিরে গরু পালন দীর্ঘদিনের একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে গরু কোরবানির সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে কোরবানির জন্য গরু প্রস্তুত করা খামারিদের মধ্যেও বাড়ছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেকেই গরু পালন কমিয়ে দেওয়ার কিংবা খামার বন্ধ করার চিন্তা করছেন। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের কৃষক শেখ ফরিদ বলেন, এবার তিনি ব্যাংক ঋণ নিয়ে একটি গরু কিনেছেন। গত বছর কোরবানির ঈদে চারটি গরু পালন করেছিলেন এবং সবগুলো বিক্রি করলেও লাভ পাননি। লোকসানের অভিজ্ঞতায় এবার গরুর সংখ্যা কমিয়ে এনেছেন। তার ভাষায়, গরু পালনের পেছনে সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, অথচ ক্রেতারা দাম বলছেন এক লাখ টাকার মতো। এতে বছরের পর বছর শ্রম, পরিবারের পরিশ্রম ও খাবারের খরচ সবই লোকসানে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শেখ ফরিদ বলেন, তার গোয়ালে সাতটি গরু রাখার ব্যবস্থা থাকলেও এখন আর আগের মতো গরু পালন করতে ইচ্ছা করে না। এবারও যদি ভালো দাম না পান, তাহলে ভবিষ্যতে খামার বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করছেন।
খামারিদের এমন হতাশা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। অনেকেই বলছেন, কোরবানির গরু বিক্রিতে আগের মতো লাভ হচ্ছে না। ফলে তারা গরু পালন কমিয়ে দিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে জবাইকৃত পশুর বড় অংশই গরু। এছাড়া দেশটিতে গরুর মাংসের চাহিদাও সবসময় বেশি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে কোরবানিকৃত গরুর সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩ লাখ ৯১ হাজারে এবং ২০১৯ সালে আরও বেড়ে হয় ৫৬ লাখ ৫৯ হাজার। তবে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় থেকে এই সংখ্যা কমতে শুরু করে। ওই বছর গরু কোরবানি নেমে আসে ৫০ লাখে এবং ২০২১ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪০ লাখে।
আরও পড়ুন: ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে সড়কে ঝরে গেল ১০ প্রাণ
পরবর্তীতে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার কিছুটা বৃদ্ধি দেখা যায়। ২০২২ সালে কোরবানিকৃত গরুর সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ ৬৫ হাজার, ২০২৩ সালে ৪৫ লাখ ৮১ হাজার এবং ২০২৪ সালে ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার। তবে ২০২৫ সালে আবারও কমে তা দাঁড়ায় ৪৬ লাখ ৫০ হাজারে। অর্থাৎ, ২০১৯ সালের তুলনায় এখনও প্রায় ১০ লাখ কম গরু কোরবানি হচ্ছে দেশে।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, গরু কোরবানি কমে যাওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন খরচ বাড়ায় গরুর দামও বেড়েছে। তৃতীয়ত, ব্যয় কমাতে অনেকে গরুর পরিবর্তে ছাগল বা ভেড়া কোরবানি দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি বাড়ায় বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই এখন এক লাখ বা তার বেশি টাকা খরচ করে গরু না কিনে কম খরচে ছাগল কিনছেন। ফলে গরুর চাহিদা আগের তুলনায় কমে গেছে।
কেরানিগঞ্জের একটি খামারের ব্যবস্থাপক মো. কবির জানান, এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। তবে খরচ বেড়ে যাওয়ায় গরুর দামও আগের বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, খাবার, শ্রমিক ও বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কম দামে গরু বিক্রির সুযোগ নেই।
একই ধরনের কথা বলেছেন মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের খামারি কুদ্দুস মোল্লা। তিনি বলেন, গ্রামে খামারিরা প্রত্যাশিত দাম পান না। কারণ অধিকাংশ সময় গরু বেপারিদের কাছে বিক্রি করতে হয় এবং তারা কম দাম দেওয়ার চেষ্টা করেন। এবার তিনি নিজেই হাটে গরু তোলার পরিকল্পনা করছেন, যাতে ভালো দাম পাওয়া যায়।
একদিকে গরুর দাম বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে কোরবানির সংখ্যা। ফলে অনেক খামারি এবার গরু পালনের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছেন। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, চাহিদার তুলনায় এবারও পশুর সরবরাহ বেশি রয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবছর কোরবানির জন্য সারাদেশে প্রায় ৫৭ লাখ গরু ও মহিষ প্রস্তুত করা হয়েছে। গত বছর যেখানে ৪৬ লাখ গরু কোরবানি হয়েছিল, সেখানে এবার প্রস্তুত পশুর সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ বেশি। এছাড়া গরু-মহিষ, ছাগল ও ভেড়াসহ মোট কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা এক কোটি ২৩ লাখ, বিপরীতে কোরবানি হতে পারে প্রায় এক কোটি এক লাখ পশু। সে হিসেবে প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
তবে উদ্বৃত্ত পশু বিক্রি না হলে খামারিদের ক্ষতি হবে কিনা—এমন প্রশ্নে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) মো. শরীফুল হক বলেন, প্রতিবছরই কিছু পশু উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু গরুর মাংসের চাহিদা সারাবছরই থাকায় খামারিদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তার ভাষায়, বছরে যত গরু জবাই হয় তার প্রায় অর্ধেকই কোরবানির সময়ে এবং বাকি অর্ধেক সারা বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিয়ে ও দৈনন্দিন চাহিদায় ব্যবহৃত হয়।
তবে খামারিরা বলছেন, কোরবানির বাজারের বাইরে সাধারণ মাংসের দামে গরু বিক্রি করলে তাদের উৎপাদন খরচ ও শ্রমের সঠিক মূল্য ওঠে না। ফলে দিন দিন অনেক খামারি গরু পালন থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।