গবেষণা প্রত্যাহার © সংগৃহীত
গবেষণাপত্র প্রকাশিত হওয়ার পর সেটি চূড়ান্ত বা প্রশ্নাতীত হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। গবেষণার তথ্য, বিশ্লেষণ, নৈতিকতা বা প্রকাশনা প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম কিংবা এমন ভুল ধরা পড়লে, যা গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে, তখন সংশ্লিষ্ট জার্নাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই গবেষণাপত্র প্রত্যাহার (রিট্র্যাক্ট) করে। গবেষণার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বৈজ্ঞানিক সততা বজায় রাখতে এই প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোনো গবেষণাপত্র জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার পর সেটিতে গুরুতর সমস্যা ধরা পড়লে জার্নাল কর্তৃপক্ষ পেপারটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করতে পারে। একেই বলা হয় রিট্র্যাকশন।
রিট্র্যাকশন মানে শুধু পেপারে ছোটখাটো ভুল থাকা নয়। সাধারণত এমন ত্রুটি বা অনিয়মের কারণে পেপারটি প্রত্যাহার করা হয়, যা গবেষণার ফলাফল ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রিসার্চ পেপার রিট্র্যাকশনের প্রধান কারণগুলো হলোঃ
১. ডেটা তৈরি বা পরিবর্তন করা: বাস্তবে গবেষণা না করে তথ্য বানানো কিংবা প্রত্যাশিত ফল পাওয়ার জন্য ডেটা ইচ্ছাকৃতভাবে বদলে দেওয়া।
২. প্লেজিয়ারিজম: অন্যের লেখা, ধারণা, ছবি বা গবেষণার ফল যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়া নিজের নামে ব্যবহার করা।
৩. একই পেপার একাধিক জার্নালে প্রকাশ করা: সামান্য পরিবর্তন করে একই গবেষণা বারবার প্রকাশ করাও অনৈতিক।
৪. ছবি বা ফলাফল বিকৃত করা: গবেষণার ইমেজ, গ্রাফ বা পরীক্ষার ফল এমনভাবে সম্পাদনা করা, যাতে প্রকৃত তথ্য গোপন থাকে।
৫. গুরুতর পদ্ধতিগত ভুল: গবেষণার নমুনা, বিশ্লেষণ বা পদ্ধতিতে এমন বড় ভুল থাকা, যার কারণে ফলাফল আর নির্ভরযোগ্য থাকে না।
৬. নৈতিক অনুমোদনের অভাব: মানুষ বা প্রাণীর ওপর গবেষণার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নৈতিক অনুমোদন (এথিকস অ্যাপ্রুভাল) কিংবা অংশগ্রহণকারীদের সম্মতি না নেওয়া।
৭. লেখকত্ব নিয়ে অনিয়ম: গবেষণায় প্রকৃত অবদান না রেখেও কারও নাম লেখক হিসেবে যুক্ত করা অথবা প্রকৃত অবদানকারীকে বাদ দেওয়া।
৮. স্বার্থের দ্বন্দ্ব গোপন করা: কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির অর্থায়ন গবেষণার ফলকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন তথ্য গোপন রাখা বা তা প্রকাশ না করা।
৯. পিয়ার রিভিউয়ে জালিয়াতি: ভুয়া পরিচয় বা ইমেইল ব্যবহার করে নিজের গবেষণাপত্রের অনুকূলে রিভিউ তৈরি করা বা রিভিউ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা।
তবে সব রিট্র্যাকশনই গবেষকের প্রতারণার কারণে হয় না। অনেক সময় গবেষক নিজেই প্রকাশের পর গুরুতর ভুল শনাক্ত করে পেপার প্রত্যাহারের আবেদন করেন। ভুল স্বীকার করে গবেষণা সংশোধন করা বৈজ্ঞানিক সততারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রিট্র্যাকশনকে শুধু একজন গবেষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি পুরো গবেষণা ও প্রকাশনা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। দ্রুত প্রকাশনা, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান (ফান্ডিং) এবং বেশি সংখ্যক গবেষণাপত্র প্রকাশের চাপ অনেক সময় গবেষণার মান ও নৈতিকতাকে দুর্বল করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন গবেষকের প্রকৃত সাফল্য শুধু কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং তাঁর গবেষণা কতটা সৎ, স্বচ্ছ, পুনরায় যাচাইযোগ্য এবং সমাজ ও বিজ্ঞান অঙ্গনের জন্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।