বিদেশী শিক্ষার্থীদের ফি বাড়ানোয় ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ © সংগৃহীত
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দেশ থেকে ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি কয়েক গুণ বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিতে সীমিত ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও এই সিদ্ধান্তকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে আন্দোলন করেন তারা।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নতুন এই নীতির ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা আরও ব্যয়বহুল ও সীমিত হয়ে পড়বে।
মঙ্গলবার (১২ মে) রাজধানী প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। প্যারিসের ঐতিহাসিক লাতিন কোয়ার্টারে আয়োজিত বিক্ষোভে কয়েকশ আন্দোলনকারী সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানান।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল স্নেসুপ-এফএসইউ, ইউনেফ, ফাজ ও ইউনিয়ন এতুদিয়ঁত। আন্দোলনকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘সামাজিক বৈষম্য নয়, বিদেশি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে’ এবং ‘সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান অধিকার।’
ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত সম্প্রতি ঘোষণা দেন, নতুন ফি কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কিছুটা নমনীয়তা দেওয়া হবে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত টিউশন ফি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ পাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
আরও পড়ুন: পানিতে ডুবে তিন মাসের ব্যবধানে শাবিপ্রবির দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু
এর আগে গত ২০ এপ্রিল ‘চুজ ফ্রান্স ফর হায়ার এডুকেশন’ পরিকল্পনার আওতায় সরকার জানায়, ২০১৯ সালে চালু হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের পৃথক ফি কাঠামো এবার কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে। যদিও এতদিন অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই নীতির পূর্ণ বাস্তবায়ন থেকে বিরত ছিল।
সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফরাসি ডিগ্রির মূল্য আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি আর্থিকভাবে সক্ষম ও মেধাবী বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করাও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই নীতির মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। তাদের মতে, উচ্চ টিউশন ফি আরোপের ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রান্সে পড়াশোনার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়বে।
প্যারিসে ফিজিও প্যাথলজিতে মাস্টার্স অধ্যয়নরত আলজেরিয়ার শিক্ষার্থী বুসাদ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের ফলে ফ্রান্স আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আগের মতো আকর্ষণীয় থাকবে না। বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে আগামী শিক্ষাবর্ষে বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়টি বিবেচনা করছেন।’
অন্যদিকে মালির শিক্ষার্থী কানুতে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে আইন বিষয়ে পড়তে ফ্রান্সে আসার পর থেকেই তাকে পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে সুযোগ নেওয়ার জন্য আসিনি, পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ গড়তে এসেছি।’
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের ব্যাচেলর বা লাইসেন্স পর্যায়ে বছরে ২ হাজার ৮৯৫ ইউরো টিউশন ফি দিতে হবে। বর্তমানে এই ফি ১৭৮ ইউরো। একইভাবে মাস্টার্স পর্যায়ে ফি ২৫৪ ইউরো থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৯৪১ ইউরো করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ফরাসি পার্লামেন্টে বক্তব্য দিতে গিয়ে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত বলেন, ‘নির্ধারিত এই ফি এখনো শিক্ষার প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। একজন শিক্ষার্থীর পেছনে মোট ব্যয়ের বড় অংশ এখনো রাষ্ট্র বহন করছে।’
এর আগে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চে (সিএনইএসইআর) উপস্থাপিত প্রথম খসড়ায় মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ফি মওকুফের সুযোগ রাখার প্রস্তাব ছিল। তবে তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার পরে সেই সীমা বাড়িয়ে ২০ শতাংশে উন্নীত করে।
এ ছাড়া ধাপে ধাপে নতুন নীতি কার্যকর করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ছাড় দিতে পারবে, যা ২০২৭ সালে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা রয়েছে।
তবে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো বলছে, আংশিক ছাড় দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। তারা পুরো নীতিমালা বাতিলের দাবি জানিয়ে আগামী ২৬ মে আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।