সাবিনা আহমেদ © সংগৃহীত
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। হামলা এখন বহুমুখী রূপ ধারণ করেছে। ইরান পাল্টা আক্রমণ করেছে ইসরায়েলে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, বাহারাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতেও হামলা চালিয়েছে দেশটি। খামেনিকে হত্যার প্রতিবাদে হিজবুল্লাহও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলে। এই পর্যায়ে যুদ্ধের ‘ইন্টারেস্টিং’ ১১ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্রনীতি ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ সাবিনা আহমেদ।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন।
পয়েন্টগুলো হলো:
১) ইরান তার পাল্টা আক্রমণ চালু রেখেছে, বরং আরও জোরদার করেছে। খামেনির মৃত্যুর পর তাদের যুদ্ধের নেতৃত্ব এখন ডিসেন্ট্রালাইজড। আর সেটাই তাদের যুদ্ধের আগে থেকে ঠিক করা ছিল। অর্থাৎ, যদি খামেনি কিংবা সেন্ট্রাল কমান্ড স্ট্রাকচার ধ্বংস হয়, তাহলে ডিসেন্ট্রালাইজড ভাবে তারা যুদ্ধ চালাবে। সব সময় দেখা গেছে কমান্ড স্ট্রাকচার ডিসেন্ট্রালাইজড করা হয় যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদী করার জন্য এবং সেক্ষেত্রে যুদ্ধ থামানো খুব কঠিন হয়ে পড়বে।
২) এই যুদ্ধে ইরান সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে ইউএই কে। আমিরাতকে লক্ষ্য করে ইরান ১৩৭টি মিসাইল আর ২০৯টি ড্রোন লঞ্চ করেছে। ইরান UAE-কে সবচেয়ে বেশি টার্গেট করার কারণ UAE ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আরব মিত্র, যারা সর্বপ্রথম ২০২০-এর আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সাইন করেছে, এবং এখানে আল ধাফরা এয়ার বেসে মার্কিন F-35 যুদ্ধবিমান আছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহার হয়েছে বলে ইরান মনে করে। এছাড়া দুবাইয়ের বুর্জ আল আরব, পাম জুমেইরাহ, এয়ারপোর্ট ইত্যাদিকে “পশ্চিমা ধনতন্ত্রের প্রতীক” হিসেবে আক্রমণ করে ইরান প্রতীকী আঘাত দিচ্ছে। এতে UAE-এর ফ্লাইট বন্ধ, AI ডাটা সেন্টার সহ অন্যান্য ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৩) ইরানি হামলায় দ্বিতীয় স্থানে আছে ইসরায়েল, যাকে লক্ষ্য করে ইরান ১৫০–২০০টি মিসাইল আর মাত্র ডজন খানেক ড্রোন ক্ষেপণ করেছে, লক্ষ্য টেল আভিভ আর হাইফার মতো শহরগুলো। বেশ কয়েকটি ইরানিয়ান মিসাইল লক্ষ্য হিট করেছে।
৪) তৃতীয় স্থানে আছে বাহরাইন। যাকে লক্ষ্য করে ইরান প্রায় ৬১টি মিসাইল আর ৩৪টি ড্রোন ক্ষেপণ করেছে। এখানে US Fifth Fleet-এর হেডকোয়ার্টার আছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক শক্তির কেন্দ্র। ইরান দাবি করছে তারা এই হেডকোয়ার্টার ধ্বংস করেছে। এছাড়া বাহরাইনও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সাইন করে ইসরায়েলের পরম মিত্র।
৫) ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর হেজবোল্লাহ পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরায়েলে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। যদিও হুথিরা এখনও এই যুদ্ধে সরাসরি জড়ায়নি। উল্লেখ্য, ইসরায়েল আর হেজবোল্লাহদের মাঝে যুদ্ধবন্ধের চুক্তি থাকলেও, ইসরায়েল কখনোই লেবানন আক্রমণ বন্ধ করেনি।
৬) ইরানের ড্রোন আর মিসাইল থামাতে মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশের যে পরিমাণ এয়ার ডিফেন্স মিসাইল ব্যবহার করতে হচ্ছে, একটা মিসাইলের বিরুদ্ধে ২-৫টা ইন্টারসেপ্ট মিসাইল। যা দিয়ে ইরান অ্যাটাক চালালে সেসব দেশের ইনকামিং মিসাইল আর ড্রোন থামানোর ক্যাপাসিটি কমে যাবে। সেক্ষেত্রে সেসব দেশের ডিফেন্সিভ ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হবে।
৭) আমেরিকা ইতালির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানকে অনুরোধ করেছে বলে সংবাদ আসলেও তা ভেরিফাই করা যায়নি। আমার মতে, ইরান ভালো করেই জানে যুদ্ধবিরতি মানে আমেরিকা রি-সাপ্লাই করে ফের ইরানকে আক্রমণ করবে। ইরানের এবারের লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার বিদায় এবং অন্যান্য দেশগুলো তাদের দেশ থেকে আমেরিকান বেস উঠিয়ে দেবে।
৮) কন্টিনিউয়াস আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণ চলছে। আমেরিকা মুখে স্বীকার করেছে কুয়েতের একটি ঘাঁটিতে ড্রোন স্ট্রাইকে ৩ জন আমেরিকান সেনার মৃত্যু। আনঅফিশিয়াল সংখ্যাটা অনেক বেশি বলে দাবি আছে, কিন্তু কনফার্মড নয়। এখন পর্যন্ত ইরানের পাল্টা মিসাইল হামলায় কেন্দ্রীয় ইসরায়েলের বেত শেমেশ এলাকায় একটি বম্ব শেল্টারে আঘাত লেগে ৯ জন ইসরায়েলি নিহত এবং ১২১+ জন আহত হয়েছে।
৯) ইসরায়েল মূলত F-35 আর এফ-15 দিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে, আর আমেরিকান মেইনলি জাহাজ থেকে টমা হক এবং অন্যান্য মিসাইল আক্রমণ করছে।
১০) ইরান প্রথম দুই দিন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা আমেরিকান সার্ভেইলেন্স ইকুইপমেন্ট, লাইক রাডার সিস্টেমস কে টার্গেট করছে । এগুলো সব হচ্ছে আমেরিকা-ইজরায়েলের জন্য আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। এই ওয়ার্নিং সিস্টেম ইকুয়েসন থেকে বের হয়ে গেলে ইরানের লক্ষ্য বস্তু হিট করার অনুপাত বেড়ে যাবে। আর সেই পথেই আগাচ্ছে ইরান।
১১) আমেরিকা-ইজরায়েল ইরানের 500+ মিসাইল বেস, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, কমান্ড সেন্টার, নিউক্লিয়ার সাইটসহ ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। আমেরিকা দাবী করেছে তারা ৯টি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে।