হরমুজ প্রণালির কাছে জাহাজে হামলা © সংগৃহীত
ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা আঘাত হানছে ইরান। এরই ধারাবাহিকতায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কাছে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। খবর বিবিসি।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে, দুটি জাহাজে সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে এবং তৃতীয় একটি জাহাজের একেবারে কাছে একটি "অজানা প্রজেক্টাইল" বা ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
ইরান ইতিমধ্যে সতর্কতা জারি করে বলেছে, কোনো জাহাজ যেন এই প্রণালী দিয়ে চলাচল না করে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
ইরানের এই হুমকির মুখে প্রণালীর প্রবেশপথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর পরপরই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৯ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
হামলার বিস্তারিত ও বর্তমান পরিস্থিতি
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে যে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ট্যাঙ্কার "ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জ্বলছে"। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে, আরব উপসাগর এবং ওমান উপসাগরজুড়ে "একাধিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা" ঘটেছে। তারা জাহাজগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম 'কিপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫০টি তেলের ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালীর বাইরে খোলা সমুদ্রে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করছে। তবে আজ গুটিকয়েক ইরানি ও চীনা জাহাজকে এই পথ অতিক্রম করতে দেখা গেছে।
কিপলারের বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বিবিসি নিউজকে বলেছেন, "ইরানের হুমকির কারণে প্রণালীটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজগুলো পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সেখানে প্রবেশ করছে না, কারণ ঝুঁকি অনেক বেশি এবং বীমা খরচ আকাশচুম্বী হয়ে গেছে।"
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত জাহাজ চলাচলের পথ সুরক্ষিত করার চেষ্টা করবে। যদি তারা সফল হয়, তবে তেলের দামের এই উল্লম্ফন ঠেকানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু প্রণালীটি দীর্ঘকাল বন্ধ থাকলে তেলের দাম "আরও অনেক বেশি" বেড়ে যেতে পারে।
ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টারের তথ্যমতে, অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে দুটি জাহাজে আগুন ধরে গেছে। তবে জাহাজ দুটির নাম প্রকাশ করা হয়নি। তৃতীয় যে জাহাজটির কাছে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেটির ক্রুরা নিরাপদ ও সুস্থ আছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া চতুর্থ একটি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে যেখানে জাহাজ থেকে ক্রুদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তবে এর সঠিক কারণ এখনও অস্পষ্ট।
বেসরকারি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা 'ভ্যানগার্ড টেক' জানিয়েছে, জিব্রাল্টার, পালাউ, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী জাহাজগুলো এই হামলার শিকার হয়েছে।
এদিকে ডেনিশ শিপিং জায়ান্ট 'মায়েরস্ক' রবিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালী এবং সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখছে। এর পরিবর্তে তারা জাহাজগুলোকে আফ্রিকার 'কেপ অফ গুড হোপ' হয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।
সংঘাতের পটভূমি ও তেলের বাজারে প্রভাব
গত শনিবার মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। রবিবার ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর নতুন করে বিমান হামলা চালায়। দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত), কাতার (দোহা), বাহরাইন এবং কুয়েতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে তেলের লেনদেন শুরু হলে ব্রেন্ট ক্রুড ৯ শতাংশ বেড়ে ৭৯.৫০ ডলারে এবং মার্কিন ক্রুড অয়েল ৮.৪ শতাংশ বেড়ে ৭২.৬৬ ডলারে পৌঁছায়। বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন 'ওপেক প্লাস' গ্রুপ প্রতিদিন ২,০৬,০০০ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এটি খুব একটা কার্যকর হবে না।
ব্রিটিশ অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন -এর প্রেসিডেন্ট এডমন্ড কিং সতর্ক করে বলেছেন, "মধ্যপ্রাচ্যে এই অস্থিরতা এবং বোমাবর্ষণ বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করবে, যার ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়া অনিবার্য। তবে এই দাম কতটা বাড়বে এবং কতদিন বাড়তি থাকবে, তা নির্ভর করছে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।"