‘সাম্রাজ্যবাদী’ এজেন্ডা: ট্রাম্পের গাজা উন্নয়ন পরিকল্পনা আসলে কী?

২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:১০ PM
 ট্রাম্পের গাজা উন্নয়ন পরিকল্পনা

ট্রাম্পের গাজা উন্নয়ন পরিকল্পনা © সংগৃহীত

ভূমধ্যসাগরের উপকূলজুড়ে সারিবদ্ধ ঝকঝকে সুউচ্চ অট্টালিকা, গড়া হবে ‘নতুন গাজা’ ও ‘নতুন রাফাহ’, যেখানে থাকবে এক লাখেরও বেশি আবাসন ইউনিট, সুশৃঙ্খল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, এমনকি একটি নতুন বিমানবন্দরও। তবে এই সব পরিকল্পনাই করা হয়েছে সেইসব মানুষদের সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই, যাদের কল্যাণের কথা বলে এই উন্নয়ন সাজানো হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা এবং আবাসন ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনার যুদ্ধোত্তর গাজা পুনর্গঠনের এই ‘মাস্টারপ্ল্যান’ বা মূল নকশা উপস্থাপন করেছেন। এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা উন্মোচন করে কুশনার বলেন, ‘এর কোনো বিকল্প পরিকল্পনা (প্ল্যান বি) নেই।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের শুরু করা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে গাজায় এ পর্যন্ত ৭১,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন— ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ রয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। গত বছরের ১০ অক্টোবর ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও অন্তত ৪৭০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পুনর্গঠনের পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপিত ট্রাম্প প্রশাসনের এই প্রস্তাবে সম্পত্তির অধিকার বা জমির মালিকানার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এমনকি আনুমানিক ৬৮ মিলিয়ন টন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজার হাজার লাশের সুবিচারের প্রশ্নেও এই পরিকল্পনা নীরব; বরং সেই ধ্বংসস্তূপের ওপরই গড়ে তোলা হবে চকচকে সব ইমারত।

দাভোসে ট্রাম্প নিজেও দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। তিনি এই উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রশংসা করে দাবি করেন যে, গাজা যুদ্ধ ‘সত্যিই শেষের পথে’। যদিও গত বৃহস্পতিবারও ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশু ও তিন সাংবাদিকসহ অন্তত ১১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি অন্তরে একজন রিয়েল এস্টেট (আবাসন) ব্যবসায়ী, আর সবকিছুই নির্ভর করে অবস্থানের (লোকেশন) ওপর।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলেছি, সমুদ্রতীরবর্তী এই চমৎকার অবস্থানটি দেখুন, এই সুন্দর এক টুকরো জমি কত মানুষের জন্য কী হতে পারে তা একবার ভেবে দেখুন।’

তবে বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের এই তথাকথিত মাস্টারপ্ল্যানকে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি বলে কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের সাথে কোনো পরামর্শ করা হয়নি এবং চলমান ভয়াবহ গণহত্যাকে স্রেফ একটি ‘বিনিয়োগের সুযোগ’ হিসেবে দেখা হয়েছে।

ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লেখিকা সুসান আবুলহাওয়া এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, ট্রাম্পের এই প্রস্তাব ‘গাজার জন্য সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার’ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তিনি আরও লেখেন, ‘এটি গাজার আদিবাসীদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার একটি পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে গাজার অবশিষ্ট মানুষকে তাদের শিল্পাঞ্চল পরিচালনার জন্য সস্তা শ্রমিকে পরিণত করা হবে এবং পর্যটনের জন্য একটি বিশেষ সমুদ্র সৈকত তৈরি করা হবে।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা বোমাবর্ষণে ইসরায়েল গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রধান হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট এবং পৌর পরিষেবা—সবই এখন ধ্বংসস্তূপ। গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত।

বোর্ড অফ পিস বা শান্তি বোর্ড কী? 

গত বৃহস্পতিবার দাভোসে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ‘বোর্ড অফ পিস’ বা শান্তি বোর্ডের ঘোষণা দেন। একে তিনি তাঁর প্রশাসনের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ এবং গাজা পুনর্গঠন তদারকির একটি মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেন। এই বোর্ডের সদস্যপদ তিন বছরের জন্য। তবে যারা স্থায়ী আসন চান, তাদের ১ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে।

বোর্ডের ১১ পৃষ্ঠার নীতিমালায় গাজার উল্লেখ নেই এবং এটি এখন একটি আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি ফোরাম বা জাতিসংঘের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এই নির্বাহী বোর্ডে সদস্য হিসেবে রয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং কুশনার। ট্রাম্প নিজে এই বোর্ডের চেয়ারম্যান, যাঁর হাতে রয়েছে ‘ভেটো’ ক্ষমতা। গাজায় যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিজে) থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও এই বোর্ডে রাখা হয়েছে।

চীন ও রাশিয়ার মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীসহ অন্তত ৫০টি দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন যোগ দিতে রাজি হয়েছেন। তবে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থানের সমালোচনা করায় কানাডার আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, এই বোর্ড গাজায় ‘খুব সফল’ হবে এবং এই সফলতার পর ‘আমরা অন্যান্য বিষয়েও ছড়িয়ে পড়ব’। এরপর কুশনার গাজা পুনর্গঠনের বিস্তারিত তুলে ধরেন, তবে সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো পথের কথা উল্লেখ ছিল না।

গাজা শাসনকারী হামাস এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ‘গাজা উপত্যকার আমাদের জনগণ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেবে না।’

গাজা পরিকল্পনায় কী কী আছে? 

ট্রাম্পের এই উন্নয়ন পরিকল্পনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে গাজার জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। অথচ যুদ্ধের কারণে ২০২৪ সালে গাজার অর্থনীতির আকার মাত্র ৩৬২ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এছাড়া ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান এবং আধুনিক পরিষেবা খাতে অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে।

কুশনার এই পুনর্গঠনের অর্থায়ন কে করবে তা স্পষ্ট করেননি। তবে তিনি ব্যবসায়ের চেয়ে মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে গাজার এই শান্তি প্রচেষ্টাকে ‘খুবই উদ্যোক্তাসুলভ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘এক নম্বর বিষয় হবে নিরাপত্তা।’ কুশনারের মতে, ‘নিরাপত্তা ছাড়া কেউ সেখানে বিনিয়োগ করবে না বা নির্মাণ কাজ করতে আসবে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আমাদের বিনিয়োগ প্রয়োজন।’

তিনি আরও জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলিদের সাথে উত্তেজনা হ্রাসের বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে এবং পরবর্তী ধাপে হামাসের সাথে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কাজ করা হবে। তবে ফিলিস্তিনি বা তাদের নেতাদের সাথে এই পরিকল্পনা নিয়ে কোনো আলোচনার প্রমাণ নেই। গাজার ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ শাওয়া বলেন, ‘ফিলিস্তিনি অভিনেতা হিসেবে আমরা অবাক হয়েছি যে, ১০ বছরের কাজ এবং বিশেষ করে গাজায় গত দুই বছরের কাজের পরেও কেউ আমাদের সাথে গাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কোনো পরামর্শ করেনি।’

উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো:

১. উন্নয়নের চার ধাপ: রাফাহ থেকে শুরু হয়ে গাজার উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার চার ধাপের একটি সময়রেখা উপস্থাপন করেন কুশনার। প্রথম ধাপে রাফাহ ও খান ইউনিসের কিছু অংশ, দ্বিতীয় ধাপে খান ইউনিসের বাকি অংশ, তৃতীয় ধাপে মধ্য গাজার শরণার্থী শিবির এবং চতুর্থ ধাপে উত্তর গাজার গাজা সিটি উন্নয়ন করা হবে। কুশনার জানান, এই সব এলাকায় নির্মাণ কাজ শেষ করতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। তবে পুনর্গঠন চলাকালীন ফিলিস্তিনিরা কোথায় থাকবে বা নতুন বাড়িগুলো কীভাবে বণ্টন করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

২. উপকূলীয় পর্যটন পরিকল্পনা: গাজার মানচিত্রে দেখা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন গাজার প্রায় পুরো সমুদ্রতীরকে গোলাপী রঙ দিয়ে ‘উপকূলীয় পর্যটন’ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন থাকবে। এছাড়া মিশরের সীমান্তের কাছে একটি বন্দর এবং ২০ বছর আগে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া গাজা বিমানবন্দরের কাছে একটি নতুন বিমানবন্দরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

৩. কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ: ২০২৫ সালের অক্টোবরের রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজায় বেকারত্বের হার ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ কর্মহীন। কুশনার দাবি করেছেন, নির্মাণ, কৃষি ও উৎপাদন খাতে ৫ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে এবং দেড় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে। গাজার জন্য একটি ‘লজিস্টিক করিডোর’ এবং রাফাহতে একটি ত্রিপক্ষীয় সীমান্ত পারাপারের (গাজা, ইসরায়েল ও মিশর যেখানে মিলিত হয়েছে) পরিকল্পনাও উন্মোচন করা হয়েছে।

৪. ‘নতুন রাফাহ’ ও ‘নতুন গাজা’: কুশনার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ‘নতুন রাফাহ’র ছবি দেখান, যেখানে ১ লাখ স্থায়ী আবাসন ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ২০০টি স্কুল ও ৭৫টিরও বেশি চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরির দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘নতুন গাজা’ স্লাইডে গাজাকে একটি আধুনিক শিল্প ও ডিজিটাল অবকাঠামো কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা দেখানো হয়েছে।

নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কুশনারের বক্তব্য: কুশনার স্পষ্ট করেছেন যে, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করলে এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করলেই এই পুনর্গঠন পরিকল্পনা শুরু হবে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাসের ভারী অস্ত্র অবিলম্বে জমা দিতে হবে এবং হালকা অস্ত্রগুলো ধাপে ধাপে নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে। যেসব হামাস সদস্য সহযোগিতা করবে এবং অস্ত্র সমর্পণ করবে, তাদের ক্ষমা বা নিরাপদ প্রস্থানের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে হামাস এখনো নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং গাজা শাসনে পিএ-এর কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিশ্চিত করে এই শান্তি পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।

সংবাদসূত্র: আল জাজিরা 

ব্লেড-ক্ষুর নিয়ে চাকসু নেতার ওপর হামলা
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন খুবি ছাত্রী
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
সংসদে নামাজ পড়তে গিয়ে জুতো খোয়ালেন এমপি হানজালা
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
ঢাবি এলাকা থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
চট্টগ্রামে স্ত্রীর ফাঁস নেয়ার মুহুর্ত ভিডিও করছিলেন স্বামী,…
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়াল ইউরোপীয় ইউনিয়ন
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence