ডোনাল্ড ট্রাম্প © সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি আরও জোরদার করেছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘আর পিছু হটার সুযোগ নেই’ ও ‘গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য’।
এর আগে হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, গ্রিনল্যান্ড দখলে তিনি কত দূর যেতে ইচ্ছুক?
তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আপনারা তা দেখতে পাবেন’।
এদিকে সুইজারল্যান্ডে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক বৈঠকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো সতর্ক করে বলেন, ‘নিয়মবিহীন এক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব।'’
অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ‘পুরোনো বিশ্ব ব্যবস্থা আর ফিরে আসছে না।’
বুধবার ট্রাম্পের দাভোসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, সেখানে ‘গ্রিনল্যান্ড নিয়ে অনেক বৈঠকের সূচি রয়েছে।’
দীর্ঘসময় ধরে চলা এই প্রেস ব্রিফিং এ রিপোর্টারদের কাছে আশাপ্রকাশ করে ট্রাম্প আরও বলেন, গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে ‘সবকিছু বেশ ভালোভাবেই মীমাংসা হয়ে যাবে।’
গ্রিনল্যান্ডের জন্য নেটো জোট ভেঙে যাওয়ার মতো মূল্য দিতে তিনি প্রস্তুত কি না, বিবিসির এমন এক প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘নেটোর জন্য আমার মতো এত কিছু আর কেউ করেনি, সব দিক থেকেই।’
তিনি বলেন, ‘নেটো খুশি থাকলে, আমরাও খুশি থাকব,’ উল্লেখ করে ট্রাম্প আরো বলেন, ‘বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যই এটা আমাদের প্রয়োজন।’ তবে এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, প্রয়োজন হলে নেটো আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় এগিয়ে আসবে কি না।’
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি জানি আমরা (নেটোর) সহায়তায় এগিয়ে যাব, কিন্তু তারা আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে কি না, এটা নিয়ে সত্যিই আমার সন্দেহ আছে।’
নেটো- একটি উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা, বর্তমানে ৩২টি দেশ যেটির সদস্য। যার মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠাতা দেশের মধ্যে একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।সম্মিলিত প্রতিরক্ষার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা করার লক্ষ্যে গঠিত তৈরি এই নেটো জোটের মূল নীতি হলো অনুচ্ছেদ -পাঁচ।
এতে বলা হয়েছে, এক বা একাধিক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেননি ট্রাম্প।
গতকাল যখন এনবিসি নিউজ তাকে ওই অঞ্চল দখলের জন্য বলপ্রয়োগ করবেন কি না, এমন প্রশ্ন করে তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উত্তর ছিল, ‘নো কমেন্ট।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিবিসি নিউজ নাইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডের শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয়ক মিনিস্টার নাজা নাথানিয়েলসন বলেন, “প্রেসিডেন্টের দাবিতে গ্রিনল্যান্ডবাসীরা ‘বিস্মিত’। আমরা আমেরিকান হতে চাই না এবং এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট।আমাদের সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতে আমাদের সাথে কী ঘটবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের কতটা মূল্য আপনি দেন?”
দাভোসে অনুষ্ঠিত এই ফোরামের প্রথম দিন ছিলো মঙ্গলবার। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া তার এক বক্তব্যে এই বিষয়টি সরাসরি তুলে ধরেন। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপ যে ‘সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ তা জোর দিয়ে বলেন তিনি।
যদিও লিয়েন বলেছেন, এই লক্ষ্য কেবল একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব এবং ট্রাম্পের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপকে ‘একটি ভুল’ বলে চিহ্নিত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রস্তাবের বিরোধিতা করলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপের আটটি দেশ থেকে আমদানি করা ‘যেকোনো এবং সব পণ্যের’ ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
ভন ডার লিয়েন আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে ‘পূর্ণ সংহতির’ সাথে আছে এবং তাদের সার্বভৌমত্ব ‘দরকষাকষির বিষয় নয়’।
তিনি বলেন, নেটোর পাঁচ অনুচ্ছেদ যেখানে এক বা একাধিক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা বলে বিবেচনা করা হবে, সেটির প্রতি তার দেশ অঙ্গীকারে ‘অটল’।
কার্নি বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে আমরা দৃঢ়ভাবে আছি এবং গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যত নির্ধারণে তাদের অনন্য অধিকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাই।’
ম্যাক্রোঁ তার বক্তব্যে, ‘নিষ্ঠুরতার চেয়ে আইনের শাসনকে’ প্রাধান্য দেন তিনি। গাজা ‘বোর্ড অব পিস বা শান্তি বোর্ড’-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণে মঙ্গলবার সাড়া দেননি ম্যাক্রোঁ।
এমন খবরের পর ট্রাম্প ফরাসি মদ ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
‘নতুন নতুন শুল্কের অবিরাম সংযোজনকে’ মৌলিকভাবে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন ফ্রান্সের এই প্রেসিডেন্ট। বিশেষ করে যখন এই শুল্ক একটি ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যারা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আহ্বান জানাচ্ছেন ম্যাক্রোঁ তাদের মধ্যে একজন। এর মধ্যে ‘ট্রেড বাজুকা বা বাণিজ্য বাজুকা’ নামে বলপ্রয়োহ বিরোধী হাতিয়ার রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট জুলাই মাসে সম্মত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করার পরিকল্পনা করছে। যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা