জাবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা
জাবি ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান © সংগৃহীত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১৯ শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। এর মধ্যে ১৩ জনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) বিকেল ৪টা থেকে আজ মঙ্গলবার ভোর পৌনে ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে টানা ১৩ ঘণ্টার ম্যারাথন সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্তে এসেছে কর্তৃপক্ষ।
একই সভায় জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেওয়া শাস্তি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজনকে অব্যাহতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কয়েকজনের শাস্তির মেয়াদ কমিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ম্যারাথন সিন্ডিকেট সভা শেষে ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘২০২৫ সালের ১৭ মার্চ গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দীর্ঘ আলোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পান এবং কোনো অপরাধী যেন পার না পেয়ে যান, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত কমিটির ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির যে রিপোর্ট ছিল সেটার ভিত্তিতে সিন্ডিকেট স্ট্রাকচার কমিটি করেছে এবং সেখানে আমরা ১৯ জন শিক্ষক এবং দুইজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জ করেছি। কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করেই আজকে সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’
ভিসি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন ভিসি, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) ও কোষাধ্যক্ষের ভূমিকাও উঠে এসেছে। তবে তাদের নামে তখন কোনো স্ট্রাকচার কমিটি গঠন করা হয়নি। তাই সিন্ডিকেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাদের প্রত্যেকের নামে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন। অভিযুক্ত ১৯ শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার মধ্যে একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। ৯ শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে পদাবনতি ও বেতন অবনমন করা হয়।
এ ছাড়া দুই শিক্ষককে সতর্কীকরণ এবং সাতজন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে অভিযোগ থেকে। পাশাপাশি তৎকালীন ভিসি, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) ও কোষাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি স্ট্রাকচার কমিটি গঠন হবে বলেও জানানো হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে।
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসরাফিল আহমেদ রঙ্গন, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. আলমগীর কবির, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান, অধ্যাপক বশির আহমেদ, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজউদ্দিন শিকদার, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনের বেতন নিম্নধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে।
কয়েকজনকে আগামী পাঁচ বছর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হয়েছে এবং শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দুই বছর পর পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে প্রভাষক পদে এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে। তারা দুই বছর পর শর্তসাপেক্ষে পদোন্নতির আবেদন করতে পারবেন।
ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ মামুনকে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি ড. এ মামুনকে পাঁচ বছর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
আইবিএ-জেইউর সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহা, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জহিরুল ইসলাম খন্দকার, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ছায়েদুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মনির উদ্দিন শিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার খসরু পারভেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার রাজীব চক্রবর্তীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: জাবির ১৩ শিক্ষকের শাস্তি, সাবেক ভিসি-প্রোভিসি-কোষাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কমিটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান সিন্ডিকেট সভা পরবর্তী ব্রিফিংয়ে বলেন, আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে মোট ৪৩ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে দেওয়া শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থায়ী বহিষ্কারপ্রাপ্ত ২১ শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঁচজনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আটজনের স্থায়ী বহিষ্কারাদেশ কমিয়ে দুই বছর এবং পাঁচজনের স্থায়ী বহিষ্কারাদেশ কমিয়ে এক বছর করা হয়েছে। বাকি তিনজনের ক্ষেত্রে পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, দুই বছরের জন্য বহিষ্কৃত আট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছয়জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অপর দুইজনের বিরুদ্ধে পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
ভিসি বলেন, সনদ বাতিল সংক্রান্ত ১২টি সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। চারজনের ক্ষেত্রে এক বছরের জন্য এবং তিনজনের ক্ষেত্রে দুই বছরের জন্য সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী সিন্ডিকেট সভায় সব বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, আপিল এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিবেচনা করে কোথাও শাস্তি হ্রাস করা হয়েছে, আবার কোথাও পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।’
দণ্ড পুনর্বিবেচনা করা শিক্ষার্থীদের নামের তালিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও সিন্ডিকেট সচিব বলেন, ‘বিস্তারিত তালিকা এখনও হাতে পাইনি। সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে এক-দুই দিনের মধ্যে পেলে তা নিশ্চিত করে জানানো সম্ভব হবে।’