বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করা উপাচার্যরা © টিডিসি সম্পাদিত
দক্ষিণবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) উপাচার্য পদটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে অস্থিতিশীল পদগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এ পদে নিয়োগ পাওয়া পূর্ণকালীন ৬ উপাচার্যের মধ্যে চারজনই তাদের মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেননি। এ ছাড়া দুজন খণ্ডকালীন বা রুটিন উপাচার্যের (ভিসি) দায়িত্ব পালন করেছেন।
সর্বশেষ বুধবার (১৪ মে) এ পদে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মামুন অর রশিদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, বার বার ভিসি পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। অবকাঠামো উন্নয়নসহ, প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হবে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো ফল বয়ে নিয়ে আসবে না বলে মনে করেন তারা।
মাহাবুব নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বারবার ভিসি পরিবর্তন হওয়ার কারণে আমাদের সেশনজট ও শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। দেখা গেছে, চার বছরের অনার্স শেষ করতে ৬-৭ বছর ও লেগে যাচ্ছে। এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
ববি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, ‘বার বার ভিসি পরিবর্তনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে। আগে ভিসিদের কি হয়েছে সেটা বলতে পারব না, তবে ৫ আগস্টের পর যে দুজন ভিসি এসেছিলেন, তারা দুইজনই ফ্যাসিস্টের মতো আচরণ করেছেন।’
২০১১ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি ৫৩ একর জায়গার ওপর কীর্তনখোলা নদীর তীরে কর্ণকাঠিতে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি)। বারংবার উপাচার্য পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়েটি রীতিমতো সংবাদের শিরোনামে পরিণত হয়েছে। গত ১৫ বছরে ছয় পূর্ণকালীন ও দুই খণ্ডকালীন উপাচার্য দেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। তবে সদ্য নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যকে নিয়ে আমরা আশাবাদী। সরকার তাকে যেহেতু নিয়োগ দিয়েছেন, সবকিছু বিবেচনা করেই দিয়েছেন। ফলে আমরা আশা করছি বার বার ভিসিবিরোধী আন্দোলনের কালচার আর থাকবে না।’
২০১১ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি ৫৩ একর জায়গার ওপর কীর্তনখোলা নদীর তীরে কর্ণকাঠিতে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি)। বারংবার উপাচার্য পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়েটি রীতিমতো সংবাদের শিরোনামে পরিণত হয়েছে। গত ১৫ বছরে ছয় পূর্ণকালীন ও দুই খণ্ডকালীন উপাচার্য দেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
এর মধ্যে ৪ জন উপাচার্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পড়েন। আর বাকি দুজন চার বছরের পূর্ণাঙ্গ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পেরেছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পড়া চারজন উপাচার্যের মধ্যে একজন পদত্যাগ করেন, অন্যজনকে অপসারণ করা হয়। আরেকজনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। আর সর্বশেষ উপাচার্যকে শিক্ষকরা অবাঞ্ছিত ঘোষণার পরে বিদায় নিতে হয়।
নবনিযুক্ত সপ্তম উপাচার্য
গত ১৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত ও সপ্তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবকে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মামুন অর রশিদ। এর আগে তিনি ২০২৪ সালে ১৯ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ২০২৫ সালে ১৩ তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক শুচিতা শরমিনসহ উপ-উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী এবং কোষাধ্যক্ষ (বর্তমান উপাচার্য) অধ্যাপক মো. মামুন অর রশিদকে অপসারণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে উপাচার্য পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া একটি নজিরবিহীন ঘটনা। তবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য।
ষষ্ঠ উপাচার্য তালা খুলে প্রবেশ করেন এবং তালা খুলে বিদায় নিলেন
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালে ১৩ মে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম। ওই বছরে ১০ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে চার বছরের পূর্ণকালীন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
গত বছরের ১৫ মে যোগদানের পর শিকল দিয়ে তালাবদ্ধ থাকা উপাচার্য বাসভবনের গেট শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে খোলেন তিনি। তার এক বছরের মাথায় শিক্ষকদের আন্দোলনে তালা ঝোলানো রেজিস্ট্রার ও অর্থ দপ্তরের কার্যালয়ে মিস্ত্রির সাহায্যে খোলেন তিনি। যোগদানের শুরুর দিকে তিনি শিক্ষার্থীবান্ধব উপাচার্য হয়ে উঠেছিলেন। পরবর্তীতে তার কার্যক্রমে তিনি তা বজায় করার অপ্রাণ চেষ্টাও করেছেন।

সে সময় তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনেক প্রশংসা পেয়েছেন। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ তার সততার প্রশংসা করেন। তবে তিনি পদোন্নতির বোর্ডসহ কয়েকটি ভুল পদক্ষেপ নেওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করেন এবং তার সীমাবদ্ধতার কথা জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ উপাচার্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন, শিক্ষার্থীদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন আন্দোলন, নিজ মেয়েকে পোষ্য কোটায় ভর্তি, নিয়োগ-পদোন্নতি সংক্রান্ত জটিলতা, মাঠ সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও জবাবদিহিতার মধ্যে পড়েন। শিক্ষার্থীরা তাকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মাঠ সংস্কারের অগ্রগতির জেরে ‘মুলাচাষি’ হিসেবে আখ্যায়িতও করেন।
৫ম ও প্রথম নারী উপাচার্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ও ৫ম উপাচার্য হিসেবে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নিয়োগপ্রাপ্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক শুচিতা শরমিন। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৩ মে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে অপসারণ করে। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নানান অভিযোগ ছিল। তিনি (১৬ ফেব্রুয়ারি) সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদেরকে ফ্যাসিস্ট আমলের বলে প্রথম বিতর্ক জন্ম দেন।
আরও পড়ুন: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে ঢাবির একচেটিয়া আধিপত্য আরও কমল
পরবর্তীতে তিনি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলন দমনের জন্য তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও জিডি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জেবুন্নেছা হক জিমি (মৃত) চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্যের আবেদন করেন। কিন্তু উপাচার্যের স্বাক্ষর না পাওয়ায় তিনি কোনো সাহায্য পাননি। অধ্যাপক শুচিতা শরমিনের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন করার অভিযোগও রয়েছে।
৪র্থ উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ বদরুজ্জামান
বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য, যিনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ থেকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান, অধ্যাপক মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া। এটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিরল ঘটনা বলে জানা যায়। তিনি ২০২৪ সালের ৪ মার্চ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে ২০ আগস্ট পদত্যাগ করেন।
তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, তিনি জুলাই আন্দোলনে সব শিক্ষক নিয়ে এক জুম মিটিং করে বিতর্ক জন্ম দেন। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা তাকে ফ্যাসিস্টদের দোসর বলে আখ্যায়িত করেন।
তৃতীয় উপাচার্য
বিশ্ববিদ্যালয়টির তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন। তিনি উপাচার্যের পূর্ণাঙ্গ মেয়াদ সম্পূর্ণ করতে পেরেছেন। তবে তার অদূরদর্শিতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফেইসের কাজ শুরু করতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এজন্য শিক্ষার্থীরা তাকে ‘গোপাল ভাঁড়’ বলে ডাকেন।
আরও পড়ুন: পবিপ্রবিতে শিক্ষকদের আন্দোলনে হামলার নেপথ্যে ‘ভিসি-প্রোভিসি দ্বন্দ্ব’, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
দ্বিতীয় উপাচার্য ও রুটিন উপাচার্য
বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় উপাচার্য শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এস এম ইমামুল হক ২০১৫ সালের ১৫ মে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পান। জানা যায়, তিনি সবচেয়ে বেশি আন্দোলনের মুখে পড়েন এবং শিক্ষকদের একাংশ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। দুই দফায় তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনে একবার ১৫ দিন ও আরেকবার টানা ৪৪ দিন বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্বেচ্ছায় ছুটির আবেদন করেন। একপর্যায়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে বাধ্যতামূলক তিন মাসের ছুটিতে পাঠান। ছুটিতে থাকাকালীন তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হয়। তখন তার অনুপস্থিতিতে রুটিন দ্বায়িত্ব হিসেবে প্রাক্তন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ কে এম মাহবুব হাসান দায়িত্ব পালন করেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দেন। এর ঠিক ২৭ দিন পর লিখিতভাবে আবার শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলেন।
প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন ও প্রথম উপাচার্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল, ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. হারুনর রশিদ খান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পূর্ণাঙ্গ চার বছর মেয়াদ সম্পূর্ণ করতে পেরেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর রাহাত হোসেন ফয়সাল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পক্ষকে উদার, সহনশীল হতে হবে। শিক্ষার্থীদের ধৈর্যশীল হতে হবে। যারা উপাচার্য হয়ে আসেন, তারাও নিয়ম-নীতির মধ্যে থাকবেন।'
ঘন ঘন আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রভাব পড়ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রভাব তো অবশ্যই পড়ে। আমরা অতিরিক্ত ক্লাস পরীক্ষা নিয়ে, অমানুসিক পরিশ্রম করে তা উত্তরণের চেষ্টা করেছি।’