রাবিতে এবনে গোলাম সামাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সেমিনার © টিডিসি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) 'আমাদের সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া ও এবনে গোলাম সামাদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই' শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৯ নভেম্বর) বিকেল ৪টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-এর আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
তাপসী রাবেয়া হল সংসদের বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ইকরা আক্তারের সঞ্চালনায় সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের বিতর্ক ও সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর বলেন, বুদ্ধিজীবী ইবনে গোলাম সামাদ ছিলেন বাংলা সাহিত্য, মুক্ত চিন্তা ও প্রগতিশীল সমাজভাবনার এক উজ্জ্বল প্রদীপ। তাঁর লেখনী শুধু সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতার গভীর বিশ্লেষণ সামনে এনেছে। তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ, নির্ভীক এবং যুক্তিনিষ্ঠ এক চিন্তাবিদ, যিনি কোনো দলীয় সীমারেখায় আবদ্ধ ছিলেন না।
সেমিনারের প্রধান আলোচক বুদ্ধিজীবী ও মনোচিকিৎসক ফাহমিদ-উর-রহমান বলেন, ইবনে গোলাম সামাদ ছিলেন সত্যের নির্ভীক উচ্চারক, বাংলাদেশের এক প্রকৃত অর্গানিক বুদ্ধিজীবী। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও যুক্তিবোধে তিনি প্রাচীন যুগের মহাপণ্ডিতদের স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর চিন্তার ছায়াতলে সমাজ ও রাষ্ট্রের বহু প্রত্যাশা আশ্রয় পেয়েছে এবং সত্য-মানবিকতার প্রতি তাঁর অনুরাগ আজকের প্রজন্মকে পথ দেখায়।
তিনি আরও বলেন, ইবনে গোলাম সামাদের মতো অর্গানিক বুদ্ধিজীবীদের সামনে তুলে ধরতে হবে। ইতিহাসের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে তুর্কিদের মাধ্যমেই ইসলাম বাংলায় আসে— ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজিই সে সময় বাংলায় আগমন করেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার ভিত্তিতে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে সমর্থন করেননি।
তিনি আরও বলেন, ইবনে গোলাম সামাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামকে স্মরণ করে সেমিনার আয়োজনের জন্য রাকসুকে ধন্যবাদ জানাই। গত ১৬-১৭ বছর ধরে বাইরের ব্যক্তিত্বদের প্রাধান্য দেওয়ার ফলে দেশের নিজস্ব অর্গানিক বুদ্ধিজীবীদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। রাকসুর এ উদ্যোগ সেই অবহেলাকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ করে দিয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য প্রফেসর ড. সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, ইবনে গোলাম সামাদ ছিলেন এমন এক মনীষী, যিনি সারাজীবন দেশের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নিয়ে জাতির অগ্রযাত্রায় অবদান রেখে গেছেন। আজকের আলোচনায় আমরা দেখেছি, আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও শ্রমজীবী মানুষ ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় যে চিন্তা প্রকাশ করেছে, তা মূলত ইবনে গোলাম সামাদের বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ইবনে গোলাম সামাদ ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী। তাঁর লেখনী ছিল সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে—যা আওয়ামী-বাকশালী বা তথাকথিত জাতীয়তাবাদী ঘরানার সঙ্গে মেলেনি। এমনকি যাদের বড় অংশকে ইসলামপন্থি বলা হয়, তাঁদের সঙ্গেও তাঁর মতাদর্শের মিল ছিল না। তিনি স্বাধীন চিন্তা ও যুক্তিনিষ্ঠতার পক্ষেই অবস্থান করেছেন।
তিনি আরও বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতার ঘাটতির কারণে দেখা যায় এক কৃষকের সন্তান কঠোর পরিশ্রম করে বিসিএস ক্যাডার হলেও পরে আরেক কৃষকের ওপর অন্যায় আচরণ করতে দ্বিধা করে না। এটি শিক্ষার গভীর সংকট, যা কাটিয়ে উঠতে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা জরুরি।
উক্ত আলোচনার সভাপতি ও ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ইবনে গোলাম সামাদ ছিলেন সত্য, যুক্তি ও মানবতার এক উজ্জ্বল আলো যাঁর চিন্তা আজও তরুণ সমাজকে পথ দেখায়। তাঁর মতো অর্গানিক বুদ্ধিজীবীর স্মরণ আমাদের শিক্ষা-চিন্তার পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করে।
উল্লেখ্য, সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক প্রফেসর আখতার হোসেন মজুমদার, প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান আকন্দ, প্রফেসর ড. মাসউদ আখতার, ড. ফজলুল হক তুহিনসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির, সিনেট সদস্য ফাহিম রেজা এবং প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী।