ঢাবির বোস সেন্টারের পরিচালক পদ থেকে কেন পদত্যাগ করেছিলেন অধ্যাপক মামুন?

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:১৭ AM
অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বোস সেন্টার ফর এ্যাডভান্সড স্টাডি এন্ড রিসার্চ ইন ন্যাচারাল সায়েন্স এর পরিচালক থাকাকালীন অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানটির বেহাল অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন। 

তিনি প্রশ্ন করে বলেছেন, টাকা দেওয়া ছাড়া বোস সেন্টারের কোনোই কাজ নেই। অথচ এই কাজ তো রেজিস্ট্রার ভবনের কর্মকর্তারাই করতে পারত। এর জন্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিজ্ঞানীর নাম জড়িয়ে একটি সেন্টার করার কোনো মানে আছে?

বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এ উদ্বেগ প্রকাশ ও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এসময় এ প্রতিষ্ঠান থেকে কেন পদত্যাগ করেছিলেন, তার কারণ সম্পর্কেও জানান তিনি। 

ফেসবুক স্ট্যাটাসে কামরুল হাসান মামুন লেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬টি রিসার্চ সেন্টার নিয়ে একটি ফিচার আর্টিকেল ছাপিয়েছে একটি জাতীয় দৈনিক। তারা শিরোনাম করেছে “ছাপ্পান্নটি গবেষণা কেন্দ্র! নিজের ‘কীর্তি’ নিয়ে দিশেহারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!” এই আর্টিকেলটি লেখার আগে তারা আমার কাছেও এসেছিল। বর্তমান ভিসি নিয়োগ পাওয়ার একদম প্রথম দিকেই আমাকে বোস সেন্টারের পরিচালক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিল। ভেবেছিলাম এই প্রশাসন হয়ত বোস সেন্টারকে উন্নত করতে আন্তরিক হবে। তাছাড়া সেই সময় আমি বোস-আইনস্টাইন তথা কোয়ান্টাম স্টাটিস্টিক্স তত্ত্বের জন্ম শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে একটি কনফারেন্সের আয়োজন করছিলাম। ভাবলাম বোস সেন্টারের পরিচালক হলে কনফারেন্স আয়োজনও সহজ হবে। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে গেল আর আমিও এই নিয়োগ গ্রহণ করি। 

তিনি বলেন, পরিচালক হওয়ার পর দেখলাম আমি যেন ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার। এখানে পদের কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। বোস সেন্টারের বয়স এখন একান্ন বছর। আমি যখন দায়িত্ব নেই তখন এর বয়স ছিল ৫০! এর আউটপুট কী? তার আগে বলে নেই ৫০ বছর পুরোনো একটি সেন্টারের কি আছে! 

প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিজ্ঞান কারখানায় এক রুমের একটি অফিস, আর সেখানে আছে দুজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এবং একজন পরিচালক। কিছু ছাত্রকে ফেলোশিপ দিয়ে মাসে মাসে তাদের টাকার চেক দেওয়া আর প্রতিদিন একগাদা কাগজে স্বাক্ষর দেওয়াই যেন পরিচালকের কাজ। এখানে না আছে ইন-হাউজ পোস্ট-ডক ফেলো, না আছে নিজস্ব পিএইচডি ফেলো, না আছে নিজস্ব গবেষক। যাদের ফেলোশিপ দেওয়া হয়, তারা নিজ নিজ বিভাগে থেকেই গবেষণা করে। টাকা দেওয়া ছাড়া বোস সেন্টারের কোনোই কাজ নেই। অথচ এই কাজ তো রেজিস্ট্রার ভবনের কর্মকর্তারাই করতে পারত। এর জন্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিজ্ঞানীর নাম জড়িয়ে একটি সেন্টার করার কোনো মানে আছে?

নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে অধ্যাপক মামুন বলেন, আমি দায়িত্ব নিতে বেশ উৎসাহ বোধ করেছিলাম। মৃতপ্রায় গবেষণা কেন্দ্রটিকে সক্রিয় করে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম। ১৯২৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক সত্যেন বসু কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিকস তত্ত্ব আবিষ্কার করে চমকে দিয়েছিলেন স্বয়ং আইনস্টাইনকে। পরবর্তীকালে বোস-আইনস্টাইন থিওরি সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের জন্য গবেষণার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা তৃতীয় বা চতুর্থ বছরে এটি না পড়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করতে পারে না। এইরকম একটি তত্ত্বের জন্মস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ। ভাবতে পারছেন এর গুরুত্ব? আমার প্রস্তাব গ্রহণ করলে এই প্রশাসনেরই সুনাম বাড়তো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গুনীদের সম্মানের কমতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাই গবেষণা কেন্দ্রটির পুনরুজ্জীবন জরুরি মনে করেছিলাম। নইলে যে সত্যেন বসুকে অসম্মান করা হয়। ৫০ চোর যার বয়স সেটি একটি রুম ও দুইজন কর্মচারী থেকে বড় হতে পারলো না কি দুঃখজনক না? ইন ফ্যাক্ট, এই রুমটিও ছিল না। অধ্যাপক শামীমা করিম যখন এর পরিচালক হন তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি রুম হয়। আমরা যে গুণীদের সম্মান দিতে জানিনা, এটি তার অন্যতম প্রমান। 

কলকাতার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের স্মৃতিচারণ করে কামরুল হাসান মামুন বলেন, গত বছরই আমি কলকাতার এসএন বোস সেন্টার ফর বেসিক সাইন্স সেন্টারে গিয়েছিলাম। সেখানে কর্মচাঞ্চল্য দেখে মুগ্ধ হয়েছি একই সাথে আমাদের সাথে তুলনা করে লজ্জিত হয়েছি। সেখানে সল্ট লেকে বিশাল জায়গা জুড়ে এই সেন্টার। বিশাল অবকাঠামো। আছে এডমিনিস্ট্রেটিভ ভবন, গেস্ট হাউস, ৩০-৫০ জন পোস্ট ডক, অনেক পিএইচডি ছাত্র এবং প্রায় ৫০ জনের মত ইন হাউস ফ্যাকাল্টি। আছে বিশাল মনোরম গেস্ট হাউস যেখানে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নিয়মিত অতিথিরা এসে কোলাবরেশন গবেষণা করছে। 

বোস সেন্টারকে ঘিরে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমি বোস সেন্টারের জন্য এক মোটামুটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করি। আমি চেয়েছিলাম এটিকে উন্নীত করে একটি অ্যাডভান্সড রিসার্চ সেন্টার করা হউক যেখানে বিশ্বমানের পোস্ট-ডক ও পিএইচডি শিক্ষার্থী থাকবে, মাস্টার্স- এর শিক্ষার্থী থাকবে এবং উচ্চতর কোর্স অফার করা হবে। কর্তৃপক্ষ তার কিছুটা বুঝেছে, অনেকটাই বুঝেনি অথবা সবটাই উপেক্ষা করেছে। কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন ভোট অথবা দলবাজি, যার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন থাকা যায়, সেখানে বোস সেন্টারের উন্নতি-অবনতি খুবই গৌণ বিষয়। একটি জরাজীর্ণ কক্ষে বোস সেন্টার, অথচ এর থেকে ভালো ফল পেতে চাইলে কার্জন হলের পুরো একটি ভবন প্রয়োজন। তাই সিদ্ধান্ত নেই পরিচালক আর থাকব না এবং পদত্যাগ করলাম। 

সবশেষে অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, আসলে আমি অনেকদিন ধরে বলে আসছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬টি রিসার্চ সেন্টারের প্রয়োজন নেই। প্রতি অনুষদে ২টি বা ৩টি রিসার্চ সেন্টার করলেই হয়। সংখ্যা ম্যাটার করে না। গুরুত্ব দিতে হবে মানে। মান পেতে হলে গবেষণার ইকোসিস্টেম তৈরী করতে হবে এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। ভেবেছিলাম গণ অভ্যুথানের পর এইসব সংস্কার হবে। ভেবেছিলাম গো অভ্যুথানের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয় দলান্ধ ছাত্র শিক্ষক রাজনীতির পরিবর্তে শিক্ষা ও গবেষণামুখী হবে। দেখলাম কিচ্ছু হলো। সমাজ এবং সাধারণ ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝেও এই আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু সব ছিনতাই হয়ে গেল। আমাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান বদলাল না।

 

ড. ইউনুসকে নিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস সাবেক ধর্ম উপদেষ্টার
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে স্বামীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপে…
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ব্যাগ ধরে ছিনতাইকারীর টান, পড়ে গিয়ে গৃহবধূর মৃত্যু
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
শুক্রবার চাঁদপুরসহ দেশের যেসব এলাকায় উদযাপন হবে ঈদুল ফিতর
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ঢাবি অধ্যাপকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা নিয়ে নিজ অবস্থান জানালেন হা…
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাকিব হত্যায় অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেফতার ৫
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence