ড. মুহাম্মদ ইউনুস © সংগৃহীত
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে নিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। আজ বৃহস্পতিবার ফেসবুকে নিজ ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানান তিনি।
ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে প্রায় দেড় বছর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ আমার জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়। এ সময়ের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। রাষ্ট্রপরিচালনার ভেতরের নানা দিক কাছ থেকে দেখার যে সুযোগ পেয়েছি, তা নিঃসন্দেহে আমার জীবনের মূল্যবান অর্জন। এ অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে সারাজীবন আমার স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে প্রফেসর ইউনুসের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো পরিচয় ছিল না। কখনো তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ বা আলাপের সুযোগও হয়নি। অথচ আমাদের কর্মজীবনের প্রেক্ষাপটে একটি দূরবর্তী সংযোগ অবশ্যই ছিল। আমি যখন ১৯৭৬–৭৭ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু সে সময়েও আমাদের মধ্যে কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি।
এমন পরিস্থিতিতে তিনি আমাকে কীভাবে বা কোন বিবেচনায় উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—তা আজও আমার কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে পরে বিভিন্ন সূত্র থেকে জেনেছি, আমাকে উপদেষ্টা হিসেবে মনোনয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে সুপারিশ ছিল। বিশেষত ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত আন্দোলনসহ বিভিন্ন মহল থেকে ইতিবাচক মতামত ব্যক্ত করা হয়েছিল বলে শুনেছি। এছাড়া জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাগণ এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও সমর্থন ছিল বলে আমাকে জানানো হয়েছে। আরও কারও সুপারিশ থাকতে পারে, যা হয়তো আমার জানা নেই।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমার দৃঢ় বিশ্বাস—ক্ষমতা দেওয়া ও গ্রহণ করার প্রকৃত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা। মানুষের চোখে নানা কারণ, প্রক্রিয়া ও সুপারিশ দৃশ্যমান থাকলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছুই তাঁর ইচ্ছার অধীন। বাহ্যিকভাবে কিছু কারণ ও উপলক্ষ থাকে, কিন্তু চূড়ান্ত ফয়সালা হয় সৃষ্টিকর্তারই সিদ্ধান্তে।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ধরন ছিল অত্যন্ত মানবিক, সহজ ও অনাড়ম্বর। উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে তাঁর আচরণে সব সময়ই আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যের ছাপ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো। দু–একজন সিনিয়র সদস্য ছাড়া তিনি প্রায় সবাইকে Ôতুমি করে সম্বোধন করতেন। এতে তাঁর ভেতরের আন্তরিকতা, স্নেহ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দূরত্বহীন সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠত। এই সম্বোধনের মধ্য দিয়েই তিনি একটি পারিবারিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতেন। আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি সবার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে সংযুক্ত ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো দ্রুত সেখানে আদান–প্রদান হতো। কোনো উপদেষ্টা পরামর্শ বা নির্দেশনা চাইলে তিনি সাধারণত খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তর দিতেন। কখনো কখনো প্রয়োজন হলে সরাসরি ফোন করেও বিষয়টি ব্যাখ্যা করে দিতেন বা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করতেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যেমন দ্রুত হতো, তেমনি কাজের গতিও বজায় থাকত।
তাঁর নেতৃত্বের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল শালীনতা ও সংযম। সহকর্মী কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি কখনো ধমকের সুরে বা কঠোর কমান্ডিং টোনে কথা বলতেন না। বরং সব সময় বিনয়ী ও হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে আলোচনা করতেন। তাঁর এই স্বভাবসুলভ আচরণ উপদেষ্টাদের মধ্যেও এক ধরনের স্বস্তি ও ইতিবাচক কর্মস্পৃহা সৃষ্টি করত। তিনি নিজেও সব সময় হাসিখুশি থাকতেন এবং নানা প্রসঙ্গ তুলে পরিবেশকে প্রাণবন্ত রাখার চেষ্টা করতেন, যাতে দায়িত্বের চাপের মধ্যেও সবাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারেন।
এই আন্তরিক ও প্রাণবন্ত পরিবেশের প্রভাব উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত সভাগুলোতেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো। প্রতি সপ্তাহের ক্যাবিনেট মিটিংগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকত না; বরং সেখানে প্রাণচাঞ্চল্য ও উচ্ছ্বাসের এক স্বতঃস্ফূর্ত আবহ তৈরি হতো। সময়ের মূল্য সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তাই নিজে কখনো দীর্ঘ বক্তব্য দিতেন না এবং উপদেষ্টাদেরও সংক্ষিপ্ত ও মূল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে উৎসাহ দিতেন। আলোচনাকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ রাখার জন্য তিনি প্রায়ই Ôটু দি পয়েন্ট’ বক্তব্য রাখার নির্দেশনা দিতেন।
সব মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদের কাজের পরিবেশ ছিল সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে সমৃদ্ধ। এই মানবিক নেতৃত্বের ধরণ প্রশাসনিক কার্যক্রমকে যেমন গতিশীল করেছিল, তেমনি সহকর্মীদের মধ্যেও একটি ইতিবাচক ও উদ্দীপনাময় কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল।
২৩ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সময় একটি বিষয় খুব স্পষ্ট ছিল—এটি কোনো একক রাজনৈতিক ধারা, মতাদর্শ বা সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী পরিষদ নয়। বরং সমাজের বিভিন্ন বলয়, চিন্তাধারা ও পেশাগত পরিমণ্ডল থেকে আগত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এই পরিষদ গঠিত হয়েছিল। উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ ছিলেন বামধারার চিন্তায় প্রভাবিত, কেউ সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধি, কেউ ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী, আবার কেউ নারীবাদী চিন্তার ধারক। একইভাবে পেশাগত দিক থেকেও ছিল বৈচিত্র্য—কেউ ছিলেন আইনজীবী, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, কেউ এনজিও wd‡ì দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, কেউ অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, আবার কেউ ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতার প্রতিফলনই যেন এই পরিষদের গঠনে প্রতিফলিত হয়েছিল।
এই মতাদর্শিক ও পেশাগত বৈচিত্র্য অনেকের কাছে প্রথমে বিস্ময়ের কারণ হতে পারে। কারণ সাধারণত ধারণা করা হয় যে, ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে গেলে মতবিরোধ বা দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে উপদেষ্টা পরিষদের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্নতর। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা বজায় রেখেছিলাম। কেউ কারও মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করেননি; বরং ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমন্বিত অবস্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিষদের বৈঠকগুলোতেও এ ধরনের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো। কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে তা ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ নেয়নি; বরং যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের আলোকে আলোচনা হয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে মতামত দিয়েছেন, আবার অন্যের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। এভাবেই গণতান্ত্রিক চর্চার একটি ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে উঠেছিল।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিল এক ধরনের পারিবারিক উষ্ণতা। আমরা একে অপরকে আনুষ্ঠানিক সম্বোধনের পরিবর্তে ÔভাইÕ বা ÔআপvÕ বলে ডাকতাম। এই সম্বোধনের মধ্য দিয়ে একটি আন্তরিক সম্পর্কের বন্ধন তৈরি হয়েছিল, যা আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের গণ্ডি অতিক্রম করে মানবিকতার জায়গায় পৌঁছেছিল। অনেক সময় বৈঠকের বাইরেও আমরা পারস্পরিক খোঁজখবর নিয়েছি, প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করেছি এবং একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছি।
এই পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বিশ্বাসের পরিবেশই উপদেষ্টা পরিষদের কাজকে সহজ ও ফলপ্রসূ করে তুলেছিল। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ থাকা সত্ত্বেও আমরা সবাই উপলব্ধি করেছিলাম যে, আমাদের মূল লক্ষ্য একটিই—রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে দায়িত্ব পালন করা। সেই অভিন্ন লক্ষ্যই আমাদেরকে একটি টিম হিসেবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
দেড় বছর সময় খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু এই সময়ের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। মতাদর্শের বৈচিত্র্য সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং টিম স্পিরিট থাকলে একটি দল কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে—উপদেষ্টা পরিষদের অভিজ্ঞতা তার একটি বাস্তব উদাহরণ। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এই সময়ের স্মৃতি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি সহমর্মিতা, সহাবস্থান এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধের এক মূল্যবান অধ্যায়।
ড.মুহাম্মদ ইউনুস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে হস্তান্তরের বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয় এবং রাষ্ট্রে আর কোনো নতুন স্বৈরশাসকের জন্ম না নিতে পারে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের উদ্যোগ নেন। প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও শাসন কাঠামোর নানা দিক পর্যালোচনার জন্য একাধিক সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটি তাদের দায়িত্ব পালন করে পর্যায়ক্রমে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়, যদিও কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ তখনও চলমান ছিল।
প্রফেসর ইউনুসের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল—সংস্কারের প্রধান ধাপগুলো সম্পন্ন করে ২০২৬ সালের শেষের দিকে নির্বাচন আয়োজন করা, যাতে একটি অধিকতর শক্তিশালী ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। রাজনৈতিক দলগুলা বিশেষত বিএনপি এর অব্যাহত চাপ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
একান্ত আলাপচারিতায় আমি তাঁকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম—পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অধীনে কোনো সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ আছে কি না। তিনি খুব স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে জবাব দেন যে, কোনো সরকারেই তিনি আর দায়িত্ব পালন করতে চান না। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হলে তিনি তাঁর পুরোনো কাজেই ফিরে যাবেন।
তাঁর এই বক্তব্যে ক্ষমতার প্রতি অনাসক্তি এবং ব্যক্তিগত সততার একটি স্বচ্ছ প্রতিফলন ফুটে ওঠে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বকে তিনি কখনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে তিনি একটি সাময়িক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন—যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে দেওয়া।
তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় ছিল—তিনি জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী ছিলেন না, যাতে অপ্রয়োজনীয় সামাজিক উত্তেজনা বা জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়। নারী সংস্কার কমিটি তাদের প্রতিবেদন সরকারকে জমা দেওয়ার পর দেশের আলিম-ওলামা এবং বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল ওই প্রতিবেদনের কয়েকটি ধারা ও উপধারা নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানান। বিষয়টি দ্রুত জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দেয় এবং বিভিন্ন স্থানে মিছিল-মিটিং শুরু হয়। এ পরিস্থিতিতে সমাজের একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয় যে সরকার হয়তো এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে একদিন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আমি নারী সংস্কার কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা উত্থাপন করি। আমার যুক্তি ছিল, বিষয়টি নিয়ে জনমনে যে বিভ্রান্তি ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে, তা দূর করার জন্য সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার। জবাবে প্রধান উপদেষ্টা অত্যন্ত শান্ত ও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, Ôকমিশন তো মাত্র তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাদের সুপারিশগুলো আমরা এখনো গ্রহণ করিনি। সুতরাং এ মুহূর্তে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার মতো কোনো বিষয়ও তৈরি হয়নি।
এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন যে কোনো কমিশনের সুপারিশ সরকার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তা সরকারি নীতিতে পরিণত হয় না। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে সরকার বিষয়টি বিবেচনা-পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে এবং তাড়াহুড়া করে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যা সমাজে অযথা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
ঘটনাটি থেকে তাঁর নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়—তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরস্থির, প্রক্রিয়াভিত্তিক এবং জনমতের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। তাই তাঁর সময়ে এমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি, যা সরাসরি জনমতকে উপেক্ষা করে নেওয়া হয়েছে।
যমুনা ও সচিবালয় ঘেরাও: বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় আঠারো মাসের শাসনামলে রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনাকে ঘিরে একাধিকবার বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি ও ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ধরনের কর্মসূচি মোট কতবার সংঘটিত হয়েছে—তার কোনো সুনির্দিষ্ট বা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
তবে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে নানা গোষ্ঠী সচিবালয় বা যমুনার সামনে অবস্থান নিয়েছে। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী সংগঠন, পেশাজীবী গোষ্ঠী, এমনকি সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেও কেউ কেউ তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এ ধরনের কর্মসূচি পালন করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এসব স্থান আন্দোলনকারীদের কাছে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। তারা মনে করেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী কেন্দ্রের সামনে অবস্থান নিলে দাবি দ্রুত সরকারের নজরে আসবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।
তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কিছু কর্মসূচি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। অনেক সময় আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ বা কোনো পক্ষের ইন্ধন থাকার আশঙ্কাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে কিছু গোষ্ঠী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে আন্দোলনকে ব্যবহার করতে পারে—এমন ধারণা রাজনীতির বাস্তবতায় অস্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে সরকারও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কখনো কঠোর, কখনো নমনীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই সরকার সংলাপের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং কিছু দাবি-দাওয়া মেনে নিয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যমুনা বা সচিবালয় ঘেরাওয়ের ঘটনাগুলো ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতারই প্রতিফলন। গণতান্ত্রিক সমাজে দাবি-দাওয়া প্রকাশের অধিকার যেমন স্বীকৃত, তেমনি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তায়। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।