‘আমার শরীরের কোন কোন জায়গায় হাত দিছে তা আপনারা শুনতে চান? আপনারা আমাকে সিমপ্যাথি দেখাতে আসবেন না। সিমপ্যাথি নেওয়ার মেয়ে আমি না। আমি ইনটেনশনালি এই আন্দোলনে এসেছি। অ্যাজ এ হিউম্যান, আমার কিছু রাইটস আছে। যদি আমার কোনও অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারতো। আমাকে কোর্টে চালান করে দিতে পারতো। কিন্তু বাইরের ছেলেরা কেন আমাকে তুলে নিয়ে যাবে?
বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই বক্তব্য রাখেন নিগৃহীত মরিয়ম মান্নান ফারাহ। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে এসে গত সোমবার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে লাঞ্ছনার শিকার হন তিনি। মরিয়ম তেজগাঁও কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
এ ছাত্রী বলেন, যাঁদের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন, সেই শিক্ষার্থীরা এখন কোথায়? সংবাদ সম্মেলনে তিনি লাঞ্ছনাকারীদের শাস্তির দাবিও করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার পূর্বে মরিয়ম মান্নান নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
গত সোমবার শহীদ মিনার এলাকায় তার সাথে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। বলেন, ‘যাদের তুলে নেয়া হয়েছে তাদের জন্য আন্দোলনে যোগ দিতে আমি এসেছিলাম। এর কিছুক্ষণ পরে যে ভাইটাকে মেরেছে (ফারুক ভাইকে- যুগ্ম আহ্বায়ক) আমি তাকে কখনো দেখি নাই। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত কোন পরিচয় ছিল না। আমি আসছিলাম মানুষ হিসেবে। কিছু মানুষকে কুকুরের মত মেরে ফেলেছে! আমি কেন? যে কোন মানুষ যদি দেখে একটা মানুষকে রাস্তায় ফেলে কুকুরের মত মারতেছে, তাকে সেফ করবে। আমিও তাই করেছিলাম। ভিড়ের মধ্যে তাকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম।’
‘এরপর আমার সাথে কী ঘটেছিল তা আপনারা সবাই দেখেছেন। এরপরেও যদি আপনাদের বিবেকবোধ না জাগে তবে কি বলব যে, আমাকে কোথায় কোথায় ধরছে, আপনাদের শুনতে ইচ্ছে করতেছে। আমাকে কীভাবে কী করছে, সবাই আমাকে ফোন দিচ্ছে, তোমাকে কী করছে। এখন আমি লাইভে যাব? লাইভে যেয়ে বলব, আমাকে কী করছে? কেমন করে ধরছে? আমি কান্না করব আর সবাই আমাকে সিম্প্যাথি (সহানুভূতি) দেখাবে?’
তিনি যোগ করেন, ‘সিম্প্যাথি দেখানোর মেয়ে আমি না। আমি কোটা সংস্কার আন্দোলনে, একটি যৌক্তিক আন্দোলনে আসছি। একজন মানুষ হিসেবে আমার কিছু অধিকার আছে। এখানে আসার অধিকার আমার আছে। বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আমাকে পুলিশ ধরে নাই। আমার যদি অন্যায় হয় আমাকে কোর্টে চালান করে দিক। আমি সেখানে কথা বলব। বাইরের ছেলেপেলে আমাকে কেন ধরলো? আমার গায়ে কেন টাচ করলো? এগুলো শুনতে ইচ্ছে করতেছে আপনাদের? দেখেন নাই?’
তিনি জানান, ‘আমাকে নারীবাদিরা ফোন দিয়েছে, সাংবাদিকরা ফোন দিয়েছে। তারা বলেছে, ‘তোমার সাথে আছি আমরা। আরেকজন কল দিছে, সে বলছে, তুমি বলবা, একজনকে মারছিল তুমি তাকে বাঁচাতে গেছ, তারপর তোমাকে লাঞ্চিত করছে। আরে বাবা, আমি তো আসছিই এ মানুষগুলোর কাছে। কেন আমি মিথ্যা বলব? আমাকে ছেলে-পেলে যখন ধরলো, ধরার পরে আমাকে থানায় নিয়ে গেল। থানায় নিয়ে আমাকে বলবে না, কেন আমাকে আটক করা হল?’
তিনি বলেন, ‘আমাকে যখন সিএনজিতে তোলা হল, আমি জানি না ওরা কারা। আমাকে বলেছে, ‘ওরা ছাত্রলীগ’। আমি তো জানি না ওরা কী করে। ফারুক ভাইকে যখন নিয়ে গেল, আমি সাইড হয়ে গেলাম। সবাই একদিকে মিডিয়া-প্রেস। আমি সিএনজিতে উঠেছি বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। ওই সিএনজিটা ঘিরে ধরেছে মিনিমাম ২শ মটরসাইকেল। শহীদ মিনার থেকে কিছুটা দূরে ধরার পরে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার ফোন-ব্যাগ নিয়ে গিয়েছে। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। (আমাকে) ধাক্কাচ্ছে। এরপর যে নোংরা কথাগুলো বলেছে সেগুলো আমি বলতে পারবো না।’
তিনি বলেন, ‘সিএনজির ভিতরেও ঢুকছে। তারপরে কী করছে, এগুলোও বলবো? কীভাবে কীভাবে আমাকে টাচ করছে? আমাকে বলছে, আমি শ্যা। এরপরে আমাকে নিয়ে গেল শাহবাগ থানায়। কিন্তু সিএনজির প্রত্যেকটা মুহূর্ত আমার কাছে মনে হয়েছে জাহান্নাম। ওরা যখন বলছে থানায় নিয়ে চল মাটাকে, তখন মনে হয়েছে থানা আমার জন্য সেফ। কিন্তু থানায় যেয়ে মনে হল থানা আমার জন্য সেকেন্ড জাহান্নাম। সাথে সাথে আমার ব্যাগ খুলল। বলল, ‘ও তো ইয়াবা খায়’। তারা আমার ব্যাগ থেকে বের করলো একটা ছুরি। আমি কেন ছুরি নিয়ে আসব? আমি তো বলে আসছি, আমি আন্দোলনে যাচ্ছি, ভাইদের কাছে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘তারা ছুরি বের করলো, লাইটার বের করলো, আরো কী কী বের করলো। বের করে বলল, আমি ইয়াবা খাই। আমাকে জোর করতেছে বলতে যে, আমি ইয়াবা খাই। আমি নেশা করি। আমি বললাম, আমার ব্যাগটা তারা নিয়ে গিয়েছিল। আমার ব্যাগে কিচ্ছু ছিল না, ছিল ওয়াটার পট আর দুটো মেকাপ। আর কিছুই ছিল না। কিন্তু তারা ফোর্স করতে লাগলো। এটা বলে, ওটা বলে, দুজন সাংবাদিকও এলো। আমি তাদেরকে বললাম কী, আমার বাসায় একটু কল দিতে। আমি তখনো জানি না আমার ছবিটা ভাইরাল হয়েছে। এর মধ্যে আমাকে মানসিকভাবে টর্চার তো করেই যাচ্ছে, স্বীকার করানোর জন্য যে, আমি নেশা করি আর ওই জিনিসগুলো আমার।’
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক আফসানা সাফা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর এক শিক্ষার্থী মোছা. মৌসুমী সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তাঁরা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তাঁরা বলেন, গ্রেপ্তার শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে তাঁরা মিছিল করেন। পরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দাঁড়াতে গেলে ছাত্রলীগ তাঁদের সরিয়ে দেয়।