বৈসু উৎসবের বর্ণিল সূচনা, ফুল আর প্রার্থনায় নদী তীরে প্রাণের মেলা

১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৮ PM
প্রার্থনায় নদী তীরে প্রাণের মেলা

প্রার্থনায় নদী তীরে প্রাণের মেলা © টিডিসি ফটো

ভোরের সোনালি আভা তখনো পাহাড়ের কুয়াশা ভেদ করে পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পাহাড়ের শান্ত ঢালে ভোরের স্নিগ্ধতা বিরাজমান। এমন মোহনীয় পরিবেশে চেঙ্গী নদীর তীরে জড়ো হতে থাকেন শত শত ত্রিপুরা নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও শিশুরা। কারও হাতে রঙিন বুনো ফুল, কারও হাতে প্রজ্বলিত প্রদীপ, আবার অনেক শিশুর হাতে নিজেদের বোনা ঐতিহ্যবাহী নতুন ‘রিনাই-রিসা’। একসময় নদীর স্বচ্ছ জলে ভাসতে থাকে ফুল আর রঙিন কাপড়— প্রকৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা। এভাবেই খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসু’র আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো ‘হারি বৈসু’র মধ্য দিয়ে।

ত্রিপুরাদের এই প্রাচীন আচারের পূর্ণ নাম হলো “তৈবুকমা-অ-খুম বকনাই বাই রি কাতাল কাসক-রনাই”, যার আক্ষরিক অর্থ মা গঙ্গার প্রতি পুষ্প অর্পণ এবং নতুন বস্ত্র নিবেদন। সংক্ষেপে ‘হারি বৈসু’ নামে পরিচিত এই দিনটি মূলত বৈসু উৎসবের প্রথম ও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা পর্ব।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল থেকে খাগড়াছড়ির পল্টনজয় পাড়াস্থ চেঙ্গী নদী, খাগড়াপুরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ গঙ্গাদেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রদীপ জ্বালিয়ে এবং পবিত্র নদীতে ফুল ও নতুন রিনাই-রিসা (থামি-খাদি) ভাসিয়ে পুরাতন বছরের সব দুঃখ-গ্লানি মুছে ফেলার প্রার্থনা করেন তারা। বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। উৎসবের উদ্বোধন করেন জেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টার সহধর্মিণী জাকিয়া জিনাত বীথি।

পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা তার বক্তব্যে বলেন, “বৈসু আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি। এই উৎসব নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে এবং আমাদের জাতিগত অস্তিত্বকে শক্তিশালী করে।” উদ্বোধক জাকিয়া জিনাত বীথি বলেন, “ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এই উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি সম্প্রীতি ও সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।” অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদের সদস্য ধনেশ্বর ত্রিপুরা, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার এবং বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরা সাইমন। বক্তারা পাহাড়ের এই ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার আহ্বান জানান।

উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল তরুণ-তরুণীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ। ভোরের আলো ফোটার আগেই চলে ফুল সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। সেই ফুল দিয়ে সাজানো হয় ঘরবাড়ি আর পবিত্র স্থান। ঐশ্বরিক ত্রিপুরা মিম তার অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন, “প্রতি বছরের মতো এবারও আমরা নদীতে ফুল দিয়ে প্রার্থনা করেছি। পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে সব দুঃখ ভুলে নতুন বছরে নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রত্যাশা নিয়েই আমাদের এই ফুল অর্পণ। সবার জীবনে শান্তি ও মঙ্গল আসুক—এটাই আমাদের কাম্য।” ত্রিপুরা তরুণী প্রথমা ত্রিপুরা ও টিনা ত্রিপুরা পিকাই জানান, ফুল তোলা এবং নিজেদের হাতে তৈরি কাপড় নদীতে ভাসানোর মুহূর্তটি তাদের কাছে অত্যন্ত আবেগঘন এবং গর্বের। অন্যদিকে লাইফশ্রী ত্রিপুরা, ঐশীতা ত্রিপুরা, সাধন ত্রিপুরা, ভ্যালেন্টিনা ত্রিপুরা ও ডজি ত্রিপুরার মতো তরুণরা মনে করেন, এই উৎসব তাদের আধ্যাত্মিকতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এই বৈসু উৎসব মূলত তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয়। প্রথম দিন ‘হারি বৈসু’তে ফুল দিয়ে প্রার্থনা ও গঙ্গা পূজা করা হয়। দ্বিতীয় দিন ‘বৈসুমা’র আয়োজনে থাকে ঘরে ঘরে বিশেষ ‘গন্তক’ রান্না ও অতিথি আপ্যায়ন। আর তৃতীয় দিন, ‘বিসিকাতাল’-এ নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয় এবং ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। বিকেলে উৎসবের আমেজ আরও বাড়ে ঐতিহ্যবাহী গরয়া নৃত্যের তালে তালে। তরুণ-তরুণীরা নেচে-গেয়ে উৎসবকে মুখর করে তোলেন। এছাড়া সুকুই (গিলা), ওয়াকরাই, চপ্রিং ও কাংটির মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলায় মেতে ওঠে পাহাড়ের শিশু-কিশোররা। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে “কমা বতই” নামে পবিত্র জল ছিটিয়ে একে অপরের মঙ্গল কামনা করা হয়।

সব মিলিয়ে, পাহাড়জুড়ে শুরু হওয়া বৈসু উৎসব যেন নতুন বছরের আনন্দ, সম্প্রীতি ও মঙ্গলের এক অনন্য বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফুল, প্রার্থনা আর হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যের এই মিলনমেলা ‘হারি বৈসু’ আজ পাহাড়ের সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগে যে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে ইংল্যান্ড
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
রাতে বিরতি দিয়ে সকালে ফের বৃষ্টি নামল ঢাকায়
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
বেসরকারি হাসপাতালে ইউল্যাব শিক্ষার্থীর মৃত্যু, ভুল চিকিৎসার…
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
মা ও দুই শিশু সন্তানসহ সড়কে একসঙ্গে প্রাণ গেল ৪ জনের
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
মেসিকে ছাড়াই অনুশীলনে আর্জেন্টিনা
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে ডুয়ে…
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence