চিনি খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক করেন অনেকেই © সংগৃহীত
চিনিকে শরীরের জন্য ‘বিষ’ বলে দাবি করেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমন ধারণার প্রচার দেখা যায়। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, চিনি খেলেই তা সরাসরি ওজন বৃদ্ধি, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ নষ্ট কিংবা হৃদ্রোগের কারণ হয়—এমন ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং খাদ্যতালিকার সামগ্রিক মান, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকার বিষয়গুলো স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
লন্ডনের কিংস কলেজের পুষ্টিবিদ ডা. এমিলি লিমিং বলেন, চিনি শরীরের জন্য বিষ—এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। অনেকেই মিষ্টিজাতীয় খাবার বাদ দিয়ে সুস্থ বোধ করেন। তবে এর কারণ শুধু চিনি বাদ দেওয়া নয়; বরং অতিপ্রক্রিয়াজাত মিষ্টি খাবারের পরিবর্তে ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়াও হতে পারে।
লিমিংয়ের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক প্রভাবক চিনিকে স্বভাবগতভাবেই ক্ষতিকর মনে করেন। তাঁদের ধারণা, ওজন বৃদ্ধি, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এবং হৃদ্রোগের জন্য চিনি একাই দায়ী। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত গবেষণায়, যেখানে মোট ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ একই রাখা হয়, সেখানে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের কারণে ওজন কমানো, বিপাকীয় কার্যক্রম বা স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি ঘটে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্যের মতো খাবারের ঘাটতি থাকলে তা পুষ্টির দিক থেকে আদর্শ নয়। তবে সেই প্রেক্ষাপটে চিনিকে নিজে থেকেই সরাসরি ক্ষতিকর বলা ঠিক হবে না।
চিনির বদনাম কেন?
চিনির প্রতি নেতিবাচক ধারণার পেছনে কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। চিনিযুক্ত অনেক খাবারে ক্যালরির পরিমাণ বেশি থাকে। শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সূচকের মাত্রা বাড়তে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীরে অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্টস (এজিই) নামের যৌগের পরিমাণ বাড়তে পারে। এসব যৌগের সঙ্গে বয়সজনিত পরিবর্তন ও বিভিন্ন রোগের সম্পর্ক রয়েছে।
লিমিং বলেন, মাঝেমধ্যে সামান্য বাড়তি চিনি খাওয়ার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকাই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সব চিনি এক নয়
চিনি গ্রহণের ক্ষেত্রে খাবারের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক ‘ফ্রি সুগার’ গ্রহণের পরিমাণ ৩০ গ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। ফ্রি সুগারের মধ্যে রয়েছে খাবারে যোগ করা চিনি, মিষ্টি ও বিস্কুটের মতো খাবারে থাকা চিনি এবং ফলের রসের চিনি।
তবে আস্ত ফলের মধ্যে থাকা চিনিকে এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। কারণ, আস্ত ফলে চিনি প্রাকৃতিক খাদ্যকাঠামোর মধ্যে থাকে এবং এর সঙ্গে আঁশ ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানও পাওয়া যায়।
লিমিং বলেন, ফলের মধ্যে চিনি আছে বলে তা খাওয়া উচিত নয়—এমন পরামর্শ তাঁকে খুবই হতাশ করে। তাঁর মতে, এটি ভুল পরামর্শ। শুধু চিনির উপস্থিতির কারণে আস্ত ফল এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে ফল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্যের মতো পুষ্টিকর খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।