প্রতীকী ছবি © ফাইল ফটো
স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালু করলেই দেশে ইন্টারনেট শাটডাউন ঠেকানো যাবে—এ ধারণা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও মেটার সাবেক বাংলাদেশ বিষয়ক কর্মকর্তা সাবহানাজ রশীদ দিয়া। তার ভাষায়, ‘স্টারলিংক দিয়ে ইন্টারনেট বন্ধ ঠেকানো সম্ভব না’, বরং টেলিকম নীতিমালার কাঠামোগত সংস্কারই এ ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নতুন দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখেন।
তার লেখা পোস্টটি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
‘নবনিযুক্ত পোস্ট, টেলিকম এবং প্রযুক্তি মন্ত্রী দেখে অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, উনাকে চিনি কি না বা তার প্রযুক্তিবিষয়ক ব্যাকগ্রাউন্ড কী। না, উনাকে আমি চিনি না। তবে না চেনাকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখি। হয়তো এই সেক্টরকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ হবে উনার, এই বেনেফিট অফ ডাউট আমি আপাতত উনাকে দিতে চাই।
তবে এই জায়গায় আজ পর্যন্ত যত মন্ত্রী এসেছেন, সবাইকে একটা ইনিশিয়াল ওরিয়েন্টেশনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রত্যেককেই নতুন করে বুঝাতে হয়, কোন সিস্টেম কীভাবে কাজ করে, চাইলেই কিছু কিছু জিনিস কেন করা সম্ভব না। আগেও বলেছি, প্রযুক্তি সেক্টরে দেশি-বিদেশি নানা কম্পিটিং ইন্টারেস্ট কাজ করে তাই যত দ্রুত কিছু ভুল ধারণা থেকে বের হয়ে আসা যায়, তত দ্রুত মূল কাজে এগিয়ে যাওয়া যায়। তাই এ জায়গায় প্রযুক্তি নিয়ে কিছু ভুল ধারণা শুরু থেকেই কাটিয়ে উঠা জরুরি। এটাকে আমি মিথবাস্টিংই বলি আপাতত।
১। না, হোয়াটসঅ্যাপে বলে দিলেই কোন সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি কন্টেন্ট সরিয়ে দিবে না। কন্টেন্ট টেকডাউন বা অপসারণ একটা আইনী প্রক্রিয়া। এখানে মূল অথরিটি বিটিআরসির, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট চ্যানেলে কন্টেন্ট অপসারণের রিকোয়েস্ট বিবেচনায় ধরা হবে। এর ভেতর >৫০% কন্টেন্টও সরবে না।
২। না, বিটিআরসি ছাড়া অন্য কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কথা কোন বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি শুনবে না। নতুন নতুন, আজগুবি আইন বানিয়ে নানান অথরিটির কথা বলা থাকলেও সেটি অনবোর্ড করা হবে না। তবে এটিও মাথায় রাখতে হবে, বিটিআরসি রেগুলেটর। কন্টেন্ট মনিটরিং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। তাদের কাছে রিসোর্স আছে। বিটিআরসি শুধুমাত্র ভেরিভাই এবং ভেটিং করে রিকোয়েস্ট পাঠায়।
৩। না, বিটিআরসি বা সরকারের কাছে এমন কোন প্রযুক্তি নাই যা দিয়ে চাইলেই তারা নিজেই পছন্দমতো কোন কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলতে পারে। কারও লাইক, শেয়ারও কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা নাই। এই ক্ষমতা শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির আছে যারা নিজস্ব নীতিমালা এবং ইন্টারনাল প্রসেস অনুযায়ী কাজ করে। হ্যাঁ, সেটির সাথে ভূরাজনীতির সম্পর্ক আছে।
৪। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গেজেটেড অর্ডিন্যান্সগুলোর বেশিরভাগই সেলফ কন্ট্রাডিক্টরি এবং অবাস্তব। এগুলো বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। এগুলো নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে ইন্ডাস্ট্রি এবং জনগনের কাছে ব্যাপক প্রশ্ন এবং সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে।
৫। না, এনটিএমসি বিলুপ্ত হয়নি। বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি অর্ডিন্যান্সের যেই খসড়া অন্তর্বর্তী সরকার করে দিয়ে গিয়েছে, তা দিয়ে নতুন সার্ভেলেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি হবে এবং আপাদমস্তকভাবে টেলিকম সেক্টরের ক্ষতি হবে। মাঝখান দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলো আগের মতই কাজ করবে, নজরদারি করবে, কিন্তু পুরো দোষ গিয়ে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের উপর গিয়ে পড়বে।
৬। না, টেলিকম কোম্পানিগুলো একজোট হয়ে টেলিটকের বিরুদ্ধে কাজ করছে না। টেলিটকের কোন ইফেক্টিভ ইন্টারনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার নাই, কিন্তু তাকে বাকিদের সাথে কম্পিট না করিয়ে নানা সুযোগসুবিধা দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। টেলিটককে সরকারি অফিসের মত না চালিয়ে কার্যকর করে সাজানো উচিৎ।
৭। হ্যাঁ, স্পেকট্রামের জন্য অকশন এবং প্রতিযোগিতা ভয়ংকর। বাংলাদেশে লো-ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রাম ঠিকভাবে অ্যালোকেট করা হলে আমাদের গ্রামগঞ্জের ইন্টারনেট সুবিধা অনেকখানি বেড়ে যাবে। স্টারলিংকের মত ঝলমলে নতুন এবং লোক দেখানো প্রযুক্তি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি না করে আমাদের অব্যবহৃত ব্যান্ডইউথ কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ।
৮। না, স্টারলিংক দিয়ে ইন্টারনেট বন্ধ ঠেকানো সম্ভব না।
৯। না, শুধু হাইটেক পার্ক এবং ডেটা সেন্টার দিয়ে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব না। বিদেশী কোম্পানিদের জোর করে দেশের ভেতর উপাত্ত রাখা সম্ভব না। উপাত্ত লাইব্রেরির মত কাজ করে না যে দেশে থাকলেই সেখান থেকে অনেক চাঞ্চল্যকর কিছু পাওয়া যাবে না। প্রচুর গবেষণায় দেখা গিয়েছে ডাটা সেন্টার দিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না, বরং দেশের আউটসোর্সিং ইন্ডাস্ট্রিকে সুযোগসুবিধা দিয়ে ডেটা প্রসেসিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে আরও পারদর্শী করতে পারলে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ হতে পারে।
১০। হ্যাঁ, প্রযুক্তিবিদ, প্রযুক্তি গবেষক এবং প্রযুক্তি নীতিমালা বিশেষজ্ঞ—এই তিনটি আলাদা পেশা। একজন ডেটা সায়েন্টিস্ট হলেই তিনি ভালো ডেটা গভর্ন্যান্স নীতিমালা তৈরি করতে পারবেন, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। আইন বা নীতিমালার খসড়া তৈরির একেবারে শুরু থেকেই প্রকৃত প্রযুক্তি নীতিমালা বিশেষজ্ঞদের এবং সংশ্লিষ্ট খাতের ভুক্তভোগীদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা জরুরি। অন্তত ৪-৬ মাস সময় নিয়ে অর্থবহ পাবলিক কনসাল্টেশন করা উচিত। নিজের পরিচিত গন্ডির সাথে বসে সেটিকে স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন বলে চালিয়ে না দিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সাথে কথা বলুন। প্রযুক্তি মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, তাই আলোচনা যত উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক হবে, নীতিমালাও তত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হবে।