লীনা সুলতানা © টিডিসি সম্পাদিত
ছোটবেলা থেকেই লীনা সুলতানার স্বপ্ন ছিল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। পরিবারের ইচ্ছায় রাজশাহীতে এসে সেই স্বপ্নের পথে পরিবর্তন এলেও শেষ পর্যন্ত সেই রাজশাহী থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে তার বিচারক জীবনের নতুন অধ্যায়। মায়ের ইচ্ছা ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্নে পরিণত করে দীর্ঘ প্রস্তুতি, ব্যর্থতা ও চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও লক্ষ্য থেকে সরে যাননি লীনা। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে পূরণ করেছেন সেই স্বপ্ন। তার এই পথচলা, প্রস্তুতি, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
১৮তম বিজেএসসি পরীক্ষায় আপনি সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। আপনাকে অভিনন্দন। আপনার জন্ম ও শৈশবকাল সম্পর্কে জানতে চাই।
আমার জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায়। তবে আমার জন্মস্থানটি এখন আর আগের অবস্থায় নেই। যমুনা নদীর ভাঙনে সেটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তাই জন্মস্থান হিসেবে কাজীপুরের কথা বললেও, আমার শৈশবের প্রকৃত স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সঙ্গে।
আরও পড়ুন: মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন, নীলার ছয় বছরের লড়াই আর একটি থিসিস ডিফেন্সের গল্প
আমার আব্বু উল্লাপাড়ায় চাকরি করতেন। তার চাকরির সুবাদেই ছোটবেলা থেকে আমি উল্লাপাড়ায় বড় হয়েছি। আমার শৈশবের প্রায় সব স্মৃতি স্কুল, কলেজ, বন্ধু-বান্ধব এবং পারিবারিক জীবনের সবটুকু সময় উল্লাপাড়াকে ঘিরেই।
এখন তো আপনি সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এই অনুভূতিটা কেমন?
সিভিল জজ হিসেবে উত্তীর্ণ হওয়ার অনুভূতিটা আসলে কোনো শব্দ দিয়ে বা কোনো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ফলাফল প্রকাশের পর বেশ কিছুক্ষণ আমি একেবারে চুপচাপ বসে ছিলাম। অনেক সময় আমরা কোনো একটি স্বপ্নপূরণের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করি। কিন্তু যখন সেই স্বপ্নটা সত্যি হয়ে যায়, তখন আনন্দটাকে কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারি না। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই হয়েছিল। হয়ত জীবনের সবচেয়ে সেরা অনুভূতিগুলোর একটি ছিল সেটি।
বিচারক হওয়ার স্বপ্নের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
ছোটবেলা থেকেই দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর প্রতি আমার অনেক আগ্রহ ছিল। সেই থেকেই ছোটবেলায় আমার স্বপ্ন ছিল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু পরিবারের আপত্তির কারণে পরবর্তীতে রাজশাহীতে এসেছিলাম মেডিকেলে কোচিং করতে। তখন স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। আর আজ সেই রাজশাহী থেকেই আমি একজন সিভিল জজ হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। সত্যিই, জীবন কতটা আনপ্রেডিক্টেবল!
আমার বিচারক হওয়ার স্বপ্নের শুরুটা মূলত আমার আম্মুর ইচ্ছা থেকে। ল-তে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আম্মু আমাকে এই কথাটাই বলতেন। ধীরে ধীরে আম্মুর সেই ইচ্ছাটাই আমার নিজের স্বপ্নে পরিণত হয়। এরপর বিচারক হওয়ার লক্ষ্যেই আমি নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করি।
বিচারক হওয়ার পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি?
আমার এই পথচলায় সবচেয়ে বেশি অবদান আমার মা-বাবা ও শিক্ষকদের। তাদের পাশাপাশি আমার কিছু কাছের মানুষ ও বন্ধুদের অবদানও কোনোভাবেই অস্বীকার করার মতো নয়। বিশেষ করে কঠিন সময়গুলোতে তারা আমাকে যে মানসিক সমর্থন দিয়েছেন, সেটা আমার জন্য অনেক বড় শক্তি ছিল।

আপনার সাফল্যের পেছনে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে?
আমার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি কাজ করেছে বলে আমি মনে করি, তা হলো আমি খুব সহজে হতাশ হইনি। ব্যর্থতা এসেছে, কঠিন সময়ও গেছে, কিন্তু কখনোই নিজেকে ভেঙে পড়তে দিইনি। সবসময় চেষ্টা করেছি মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি সামলাতে এবং ধৈর্য ধরে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছি এবং প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি।
পড়াশোনা শেষ করার পর আমি নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে যোগ দিই। চাকরির পাশাপাশি আমি আমার প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়েছি। আমার মনে হয়, সারাদিন ঘরে বসে পড়াশোনা করলেই শুধু সফল হওয়া সম্ভব বিষয়টা এমন নয়। সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনাও করা যায় এবং নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।
এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও আমি শুধু পড়াশোনা নিয়েই থাকিনি। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপভোগ করেছি। আমার বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপভোগ করা এবং নিজের ক্যারিয়ারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া—দুটো একসঙ্গে করা সম্ভব। শুধু নিজের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।
কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন? দিনে কত ঘণ্টা করে পড়াশোনা করেছেন?
আমি যেহেতু পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরিতে যোগদান করেছিলাম, তাই আমার প্রস্তুতিটা ছিল চাকরির পাশাপাশি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট কত ঘণ্টা পড়েছি এভাবে আসলে হিসাব করিনি। বরং চেষ্টা করেছি, যতটুকু সময় পেয়েছি, সেটুকু সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে।
আমি মনে করি, কারও জন্য দিনে আট-দশ ঘণ্টা পড়া কার্যকর হতে পারে, আবার কেউ কম সময় পড়েও ভালো প্রস্তুতি নিতে পারেন। মূল বিষয় হলো নিজের সময় ও সামর্থ্য অনুযায়ী একটি কার্যকর রুটিন তৈরি করা এবং সেটি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা।
কতবার ভাইভা দিয়েছেন এবং কততম ভাইভাতে সফল হয়েছেন?
আমি মোট দুইবার ভাইভা দিয়েছি এবং সৌভাগ্যবশত দ্বিতীয়বার সফল হয়েছি।
যারা বিচারক হতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
যারা বিচারক হতে চান, তাদের প্রথমেই আমি বলব, নিজের জন্য উপযুক্ত পড়াশোনার কৌশলটা নিজেকেই খুঁজে বের করতে হবে। প্রত্যেক মানুষের পড়ার ধরন ও স্ট্র্যাটেজি একরকম নয়। একজনের জন্য যে পদ্ধতিটি কার্যকর, অন্যজনের জন্য সেটি একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। তবে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিগত বছরের প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো মূল বই থেকে ভালোভাবে ও বিস্তারিত পড়তে হবে।
আরও পড়ুন: ডাক্তার হবার ব্যর্থতা থেকে বিচারকের স্বপ্ন, বিজেএসের প্রথম ভাইভাতেই সফল আয়েশা
পাশাপাশি পুরো প্রস্তুতির সময় মাথা ঠান্ডা রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সময় স্থির থাকতে হবে। রিটেন পরীক্ষার আগে নিজের পড়াশোনাটা যথাসম্ভব গুছিয়ে নিতে হবে এবং ভাইভার সময় নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যর্থতা এলে হতাশ না হয়ে আবার চেষ্টা করতে হবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে।
বিচারক হিসেবে দেশের জন্য আপনি কী অবদান রাখতে চান?
আমি চাই, আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সততা, নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার সঙ্গে পালন করতে। আমার কাছে বিচারক হওয়া শুধু একটি পদ বা পেশা নয়; এটি মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার, অধিকার নিশ্চিত করার একটি বড় দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব যেন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারি এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।