© লোগো
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘিরে বিতর্কিত নেতাদের বেড়েছে দৌড়ঝাঁপ, সক্রিয় হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। শীর্ষ পদপ্রত্যাশীদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে রয়েছে নানান অভিযোগ। নামের পাশে ভুয়া ‘সহ-সম্পাদক’ সহ বিভিন্ন পদ বসিয়ে আসন্ন কমিটিতে শীর্ষপদ ভাগিয়ে নিতে ছুটছেন তারা। ধর্ণা দিচ্ছেন এলাকাভিত্তিক কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে। এছাড়াও চাঁদাবাজ, ভর্তি বাণিজ্যের সাথে জড়িত, অস্ত্র মামালার আসামী ও রাজনীতিতে নতুন এসেই শীর্ষপদ পেতে ছুটছেন বিভিন্ন মহলে।
ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, নারীঘটিত ঘটনার জেরে জবি শাখা ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারী ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করে তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটি। ওই সংঘর্ষের ঘটনায় বিস্ফোরক ও অস্ত্র মামলার ৩ নাম্বার আসামি ছিলেন আশরাফুল ইসলাম টিটন। গত কমিটির শীর্ষ পদপ্রত্যাশীও ছিলেন এই নেতা। ওই মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক উল্লেখ করে, মামলা থেকে জামিন পেয়েছেন বলে জানান তিনি। কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের অনুসারী হিসেবে সর্বশেষ সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক পদও পান তিনি।
এছাড়াও ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের অনুসারী হিসেবে এগিয়ে আছেন আক্তার হোসেন, অঞ্জন চৌধুরী পিংকু, শাহবাজ হোসাইন বর্ষণ, আব্দুল্লাহ শাহীন এবং আসাদুজ্জামান প্রমুখ।
এদের মধ্যে আব্দুল্লাহ শাহীন ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে সক্রিয় হোন ২০১৭ সালের পর। তার বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তবে নিজেকে তাবলীগ জামাতের সাবেক কর্মী বলে স্বীকার করেন। ক্যাম্পাসে কর্মীবান্ধব কোনো কর্মসূচিতে না থেকেও গত কমিটিতে সহ সভাপতি পদ পান তিনি। নিজেকে জাহাঙ্গীর কবির নানকের আশির্বাদপুষ্ট দাবি করা ছাত্রলীগের এই নেতা শীর্ষপদ পেতে বেশ আশাবাদী। সদ্য সাবেক শাখা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক শাহবাজ হোসাইন বর্ষণ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য ইকবাল হোসেন অপু এমপির ভাগ্নে। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও তরিক-রাসেল কমিটিতে সিন্ডিকেটের জোরে গুরুত্বপূর্ণ এ পদে আসীন হন তিনি। আগামী কমিটিতেও শীর্ষপদের দৌঁড়ে এগিয়ে আছেন এই ছাত্রনেতা।
জয়-লেখকের দায়িত্ব পাওয়ার পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন অঞ্জন চৌধুরী পিংকু। নিজেকে সাবেক উপ দপ্তর সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে শিক্ষার্থীদের কাছেও তিনি একদমই অপরিচিত মুখ। শোভন-রাব্বানী কমিটির বলয়ে ক্যাম্পাসে শক্ত অবস্থানে ছিলেন মাদারীপুরের আক্তার হোসাইন ও আসাদুজ্জামান। ওই কমিটি বিলুপ্তির পর আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন আক্তার হোসাইন। আসাদুজ্জামানের কর্মীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পত্রিকা পোড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে শীর্ষপদ পাওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী তৃণমূল থেকে উঠে আসা তরুণ এই ছাত্রনেতা।
কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের আনুসারী হিসেবে পদপ্রত্যাশী আছেন ইব্রাহীম ফরাজী, নাহিদ পারভেজ, সৈয়দ শাকিল, আল আমিন শেখ এবং জামাল উদ্দিন প্রমুখ। এদের মধ্যে জামাল উদ্দিন গত বছরের ২০ জুলাই ছাত্রলীগের সম্মেলনের সঞ্চালক ছিলেন। সম্মেলন চলাকালীন সময়ে এক ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু হলেও তিনি সেটি গোপন করেন। তাৎক্ষণিক কোন ব্যবস্থাও গ্রহণ করেননি। এছাড়াও ক্যাম্পাসের মাদকসেবী, অস্ত্র মামলার আসামী, চাঁদাবাজ কর্মীদের নিজ গ্রুপে টেনে বিশাল বাহিনী নিয়ে শোডাউন করেন।
কর্মী-সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাকিল। ক্যাম্পাসের অধিকাংশ চাঁদাবাজ, অস্ত্র মামলার আসামী ও ইয়াবাসেবী হিসেবে পরিচিত কর্মীরা তার আশ্রয়ে রাজনীতি করেন। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে রামদা হাতে পদ প্রত্যাশী এই নেতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে নিয়মিত ভাইরাল। তার পেছনে রয়েছেন আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা।
তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, ক্যাম্পাসে আমার কর্মীদের মধ্যে কয়েকজন এসব কাজের সাথে জড়িত সেটার অভিযোগ আমি পেয়েছি। আমি তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছি। এখনও যদি কেউ কোনো অপরাধের সাথে জড়িত থাকে আমি তাদের সাথে কথা বলবো।
সাবেক কমিটির উপ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক নাহিদ পারভেজও আছেন শীর্ষপদের আলোচনায়। এই নেতা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। দীর্ঘদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকলেও নিজ অঞ্চল থেকে ছাত্রলীগ সভাপতি হওয়ায় শোভন-রাব্বানী কমিটিতে আবার সক্রিয় হন।
জানা গেছে, এই নেতা গত কমিটিতে কোন পদ না পেলেও তার আগে শরিফ-সিরাজ কমিটিতে সহ-সম্পাদক ছিলেন; অথচ নিজেকে পরিচয় দেন সাবেক উপ-মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে। তার গ্রুপের কর্মীদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের টিএসসি ও আশপাশের দোকান থেকে চাঁদাবাজি ও মালামাল লুটের অভিযোগ আছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ‘বিএনপি ও মির্জা ফখরুলের প্রীতি’র দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে থাকাকালীন মেস থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ করেন ছাত্রলীগের সাবেক কয়েক নেতা। এ বিষয়ে জানতে তার ব্যাক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আল আমীন শেখ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক হারুন-অর-রশিদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের অনুসারী। শাখা ছাত্রলীগের সাবেক এই সহ-সভাপতি শীর্ষপদ বাগে আনতে আওয়ামীলীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের কাছে নিয়মিত ধর্ণা দিচ্ছেন।
শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইব্রাহিম ফরাজি যুবলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। শোভন-রাব্বানী কমিটিতে রাব্বানীর ‘মাই ম্যান’ হিসেবে পরিচিত এই নেতা কমিটি বিলুপ্তির পর রাতারাতি ভোল পাল্টে বর্তমান সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের গ্রুপে রাজনীতি শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার তাৎক্ষণিক এমন প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হোসনে মোবারক রিসাদ তরিক-রাসেল কমিটি গঠনের ১৫ দিনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসিতে চাঁদাবাজি ও মারামারির অভিযোগে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত হন।
শরিফ-সিরাজ কমিটির এক্সটেনশন পদ নিয়ে একাধিক নেতা নিজেদের পদ প্রত্যাশী হিসেবে প্রচারণা করছেন। সহ সম্পাদক ও বিভিন্ন উপ-সম্পাদক পদের চিঠি ইস্যু দেখিয়ে সম্মেলনও করেছেন।
এ বিষয়ে জবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, শরিফ-সিরাজ কমিটিতে এরকম অনেককেই চিঠি ইস্যু করে বিধিবহির্ভূত পদ দেয়া হয়। তখন কেন্দ্রীয় কমিটি তাদের অনুমতি ছাড়া ইস্যুকৃত সব পদকে অবৈধ ঘোষণা করেন। রাজনীতি না করেও অনেকেই তখন বিভিন্ন পদ পেয়েছে।
এ বিষয়ে জবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এফ এম শরিফুল ইসলাম বলেন, আমাদের হল না থাকায় অনেক নেতাকর্মী পদ থেকে বঞ্চিত হয়। এক কমিটিতে পদ দিয়ে সবাইকে মূল্যায়ন করা যায় না। আমরা তৎকালিন কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে কথা বলেই অনেক জনকে চিঠি দিয়েছি। এখন শুনছি, কেউ কেউ সাক্ষর জাল করে ভূয়া পদ দেখিয়ে পদপ্রত্যাশী হয়েছে। এদের অনেককেই আমরা চিনি না।