ভুক্তভোগী আবু নাসের © সংগৃহীত
তেলাপোকার মতো চাপ দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি পাওয়া বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার সভাপতি আবু নাসেরের দলীয় পদ মুলতবি করেছে ছাত্রশিবির। একই সঙ্গে তার সাথীপদও বাতিল করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বরিশাল মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি আতিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক নোটিশে নেতাকর্মীদের এই তথ্য জানানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, ‘সম্মানিত দায়িত্বশীল ভাই, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আশা করি মহান আল্লাহর মেহেরবানিতে সুস্থতার সাথে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আজ আপনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবহিত করছি। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে দীর্ঘদিন যাবৎ দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শনের দায়ে সংগঠনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বরিশাল মহানগরীর নিম্নোক্ত ভাইয়ের দায়িত্ব মুলতবি ও সাথিপদ বাতিল করা হয়েছে।’
এতে আরও বলা হয়, ‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই ভাইকে ক্ষমা করে দিন এবং যথাযথভাবে সংশোধিত হয়ে পুনরায় দ্বীনি আন্দোলনে ভূমিকা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।’
এর আগে গতকাল বুধবার (১ জুলাই) বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার ষান্মাসিক প্রতিবেদন সময়মতো না দেওয়ায় এই হুমকি পেয়েছিলেন আবু নাসের। মহানগর ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সম্পাদক শাহেদ খান তাকে এই হুমকি দেন। এ নিয়ে বুধবার রাতে মহানগর ছাত্রশিবির সভাপতি আতিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে শাহেদ খানের সদস্যপদ মুলতবি হতে পারে বলে জানিয়েছিলেন। তবে এরই মধ্যে সাথীপদ বাতিল হলো ভুক্তভোগী আবু নাসেরের। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে বরিশাল মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি আতিকুল ইসলামের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে আবু নাসেরের বাড়ি দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি গ্রামে। তার বাবা মাওলানা আতাউর রহমান সরকার খানসামা উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমীর। আবু নাসেরের ভাই মুজাহিদুল ইসলাম ২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর দিনাজপুরের রানীরবন্দরে এক মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ছাত্রশিবির তাকে সংগঠনটির ১৪১তম ‘শহীদ’ হিসেবে প্রতিবছর স্মরণ করে।
সাথীপদ বাতিল ও দলীয় পদ মুলতবির পর দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগী আবু নাসের। একই সঙ্গে ন্যায়বিচার না পেলে হত্যাচেষ্টার মামলা করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে দেয়া ফেসবুক পোস্টে আবু নাসের লিখেছেন, ‘আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে আমার ৭ম সেমিস্টার শেষ হয়। ইন্টার্নশিপের জন্য আমি ঢাকা আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তৎকালীন মহানগর সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম ভাই এবং কলেজ সম্পাদক ও ক্যাম্পাস অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক ওয়ালিদ আনসারী ভাই আমাকে সাংগঠনিক নানা বাস্তবতার কথা বলে বরিশালেই থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বরিশালে আমার ডিপার্টমেন্টের ইন্টার্নশিপের ভালো সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র সংগঠনের স্বার্থ বিবেচনা করে আমি নিজের ক্যারিয়ারের ক্ষতি মেনে নিয়ে বরিশালেই থেকে যাই এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পর আমি যখন ছুটি চাই, তখন তৎকালীন মহানগর সভাপতি হাসান নাঈম ভাই নানা রকম ইমোশনাল কথা বলে আমাকে আটকাতে চান।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি রাজি না হওয়ায় ওয়ালিদ আনসারী ভাই আমাকে বোঝানোর দায়িত্ব নেন। বরিশাল বিবির পুকুর পাড়ে কথা বলার সময় আমি তাকে পরিষ্কারভাবে জানাই। বলি, ভাই, আপনি আমার পারিবারিক সমস্যাগুলো জানেন। আব্বা চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেছেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি আর আমার কোনো খরচ বহন করতে পারবেন না। তখন ওয়ালিদ ভাই আমাকে আশ্বস্ত করে বলেন, তুমি আর কয়টা দিন থাকো, আমি মহানগর সভাপতির সাথে কথা বলে তোমার খাবার খরচের ব্যবস্থা করে দেব। নিচ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার মতো উপযুক্ত কেউ তৈরি না হওয়ায় এবং তাদের আশ্বাসে ভরসা করে আমি আবারও থেকে যাই।’
পারিবারিক বিপর্যয় ও নেতৃত্বের চরম অমানবিকতার তথ্য তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, এরই মধ্যে ঢাকা নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে আমার মায়ের মাথায় একটি বড় অপারেশন হয়। আমি ঢাকায় মায়ের পাশে থাকি এবং পরবর্তীতে আম্মাকে দিনাজপুর রেখে আবার বরিশালে ফিরে আসি। বরিশালে আসার পর আমার পকেটে খাওয়ার মতো কোনো টাকা ছিল না। আসার তিন-চার দিন পর মহানগর সভাপতি হাসান নাঈম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে আমার খরচের টাকা চাইলে তিনি বলেন, পরে দেব। কয়েকবার চাওয়ার পরও যখন কোনো টাকা পাইনি, তখন আবারও দেখা করে তাগাদা দিলে তিনি অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলেন: এক বিষয় বারবার বলা ভালো দেখায় না।
লজ্জায় ও ক্ষোভে পরবর্তী মাসের খরচ আমি আর কখনোই চাইনি উল্লেখ করে আবু নাসের লিখেছেন, পকেটে টাকা না থাকায় টানা তিন দিন মাত্র একবেলা ভাত খেয়ে এবং বাকি বেলা মুড়ি খেয়ে দিন পার করেছি। এই চরম অবহেলা ও কষ্টের পর আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বাড়িতে চলে যাই।
সাম্প্রতিক ঘটনা ও শাহেদ খানের আচরণের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, বাড়িতে থাকলেও আমি সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাইনি। থানা সেক্রেটারি মাহফুজের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে বাড়ি থেকেই একটি অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। বিগত কয়েকদিন আমি ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় থাকায় থানা সেক্রেটারি মাহফুজকে বলি যেন সে মহানগরীর সাহিত্য সম্পাদক শাহেদ খান ভাইয়ের মাধ্যমে কিছু কুরআন শরীফ অর্ডার করে (কুইজের পুরস্কার বিতরণের জন্য)। কিন্তু মাহফুজ যোগাযোগ করলে শাহেদ খান ভাই অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, তোমার সভাপতি যেন বরিশাল না আসে, তোমরা কোনো প্রোগ্রাম রাখতে পারবা না।
আবু নাসের লিখেছেন, মাহফুজের মুখে এই কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। আমি শাহেদ ভাইকে মেসেজ দিয়ে জানতে চাই— ভাই, আপনি আমাকে বরিশালে আসতে যে নিষেধ করলেন, কেন বললেন এই কথা? আপনি কি বরিশাল লিজ নিয়েছেন? তিনি মেসেজের কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি সরকারি ফোন নম্বর থেকে আমাকে কল করেন এবং অত্যন্ত উচ্চবাচ্যে ও অশালীন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। আমি তাকে শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি চরম উত্তেজিত হয়ে আমাকে লক্ষ্য করে বলেন— এই ব্যাটা, তুই চিনিস না আমি কে? তোরে তুড়ি মাইরা উড়াইয়া দিমু! তুই কী হইয়া গেছস? তোরে তেলাপোকার মতো পিষে মাইরা ফালামু।
ভুক্তভোগী আরও লিখেছেন, তিনি আমার বাবাকে জড়িয়ে অত্যন্ত বাজে ও কুরুচিপূর্ণ কথা বলেন এবং আমাকে ‘পাগলের বাচ্চা’ বলে গালি দেন।
আমার বাবা আতাউর রহমান, যিনি দীর্ঘদিন খানসামা উপজেলার আমির ছিলেন এবং এলাকায় একজন অত্যন্ত সম্মানিত মানুষ। আমার বাবার নামে এবং আমার উদ্দেশ্যে করা এমন অসভ্য ও অসহনশীল আচরণ আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমার ফোনে অটো-কল রেকর্ড চালু থাকায় এই পুরো কথোপকথনটি রেকর্ড হয়ে আছে। যখন আমি দ্বিতীয়বার এই অডিওটি শুনি, আমি আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পড়ি।
মহানগর শিবির নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তিনি লিখেছেন, অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, আমি এই বিষয়টি মহানগরীর ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের কেন জানালাম না? না জানানোর কারণ হলো, বরিশাল মহানগরীর বর্তমান দায়িত্বশীলদের মানসিকতা আমি খুব ভালো করেই জানি। তাদের কোনো বিষয় গায়ে লাগে না, কোনো সমস্যা সুষ্ঠু সমাধান করার মানসিকতা তাদের নেই। এর আগেও তারা বহু স্পর্শকাতর বিষয় ধামাচাপা দিয়েছেন। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই আমি সরাসরি এই বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছি।