ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে ছাত্র সংসদ হলো

০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৫১ PM , আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৩৯ PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) © টিডিসি সম্পাদিত

[২০১৯ সালে প্রয়াত লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর একটি নিবন্ধে (‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে ছাত্র সংসদ হলো’) তুলে ধরেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের শুরুর ইতিহাস। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরই, ২৩ সেপ্টেম্বর মুসলিম হল ইউনিয়ন গঠিত হয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা হল ইউনিয়ন ও জগন্নাথ হল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে গঠিত হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন’। পরে ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)’। তার সেই নিবন্ধটি এখানে কিছুটা সংশোধন ও পরিমার্জন করে প্রকাশ করা হলো।]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর সংগঠনের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বহু বছর যাবৎ বহু দিক থেকে ডাকসু নির্বাচনের দাবি উঠেছে। দীর্ঘদিন কী কারণে নির্বাচন হয়নি তা যারা জানে, তাদের বলার প্রয়োজন নেই এবং যারা জানে না তাদের না জানানোই ভালো।

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হলে সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অথবা জাতির খুব যে কিছু আসে–যায় তা নয়। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন কোনো শিল্পকলকারখানার সিবিএ নির্বাচনের মতো নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি অতিগুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন সংগঠন; এ সংগঠন বহু বছর জাতীয় জীবনে অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেছে। যে ভূমিকা জাতীয় রাজনীতিবিদদের পালন করার কথা, তা পালন করেছেন ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে আমাদের অহংকার, তাতে ডাকসু নেতাদের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও সূচনা করেন ডাকসুর নেতারাই। স্বাধীনতার আগে ও পরে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, বা স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে ডাকসু নেতাদের ভূমিকা জাতির ইতিহাসে লেখা আছে। অথচ সেই সংগঠনের নির্বাচন হলো না ২৮ বছরেও। সে জন্য ছাত্রছাত্রীরা দায়ী, না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দায়ী, নাকি সরকার দায়ী—তা আমাদের মতো নাগরিকদের যাঁদের ছেলেমেয়েরা সেখানে পড়ালেখা করে, তাঁদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু দায় কাউকে না কাউকে নিতেই হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদগুলোর ইতিহাস অতি গৌরবের। উপমহাদেশে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ছিল সবচেয়ে সুসংগঠিত। সেটি গঠনের পেছনে যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, তিনি সেখানকার ইতিহাসের তরুণ শিক্ষক আহমদ ফজলুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি ইতিহাসের রিডার হিসেবে যোগ দেন এবং নিযুক্ত হন মুসলিম হলের প্রভোস্ট। তাঁকে উপাচার্য ফিলিপ জে হার্টগ ভেবে দেখতে অনুরোধ করেন আলীগড়ের মতো ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকায় গঠন করা যায় কি না। তিনি দেড় মাসের মধ্যে তাঁর হলের ছাত্র সংসদ গঠনের উদ্যোগ নেন। সেটার নাম দেন তিনি ‘মুসলিম হল ইউনিয়ন সোসাইটি’। এক বছর পর ‘সোসাইটি’ শব্দটি বাদ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র সংসদটি গঠিত হয়েছিল নিখুঁত গণতান্ত্রিক উপায়ে। প্যানেল ছিল তিনটি। সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনজন: আবদুল আজিজ, রহিমউদ্দিন শাহ ও সৈয়দ আলী। সাধারণ সম্পাদক পদে মিজানুর রহমান, নেফাজউদ্দিন খান ও আশরাফ উদ্দিন আহমদ। কারচুপি শব্দটি তখন বাংলা ভাষায় ছিল না। নির্বাচনে বিজয়ী হন ভিপি পদে আবদুল আজিজ এবং সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান। তাঁরা উভয়েই কর্মজীবনেও সফল মানুষ ছিলেন। আবদুল আজিজ আয়কর কমিশনার হিসেবে ১৯৫৭ সালে অবসর নেন। মিজানুর রহমান ছিলেন ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান। তাঁরা উভয়েই ছিলেন কুমিল্লার অধিবাসী। আবদুল আজিজ মুরাদনগরের এবং মিজানুর রহমান বাঞ্ছারামপুরের। মুসলিম হল ইউনিয়নে অনেক বছর ‘কুমিল্লা গ্রুপে’র প্রাধান্য ছিল।

১৯২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মুসলিম হল ইউনিয়নের অভিষেক হয়। পূর্ব বাংলার ইতিহাসে সে এক স্মরণীয় ঘটনা। সভাপতিত্ব করেন পদাধিকারবলে ইউনিয়ন সভাপতি এ এফ রহমান এবং প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য হার্টগ। আশ্বিন মাসের নির্মেঘ আকাশ ছিল জোছনাপ্লাবিত। সম্পাদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম আনন্দঘন অনুষ্ঠানটি শেষ হতে ‘রাত প্রায় সাড়ে ১০টা’ বেজে যায়। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছিলেন হাউস টিউটর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ইতিহাস বিভাগের প্রধান রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং ঢাকা হলের প্রভোস্ট জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ। কাঁলাচাদ গন্ধবণিকের দোকানের খাঁটি ছানার সব মিষ্টি অভিষেক অনুষ্ঠানে সদ্ব্যবহার করা হয়। যাঁরা পরাজিত হয়েছিলেন, মিষ্টির ভাগ থেকে তাঁরা বঞ্চিত হননি।

কয়েক মাস পরে গঠিত হয় জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের উদ্যোগে ঢাকা হল ইউনিয়ন এবং রমেশচন্দ্র মজুমদার ও নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের উদ্যোগে জগন্নাথ হল ইউনিয়ন। ১৯২২-২৩ সালে মুসলিম হল ইউনিয়নের ভিপি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর। সিরাজুল ইসলাম ছিলেন জেলা ও সেশন জজ, অবসর নেন অতিরিক্ত আইনসচিব হিসেবে। তাঁর ছোট ছেলে পদার্থবিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম।

তিনটি হল ইউনিয়ন গঠিত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয় একটু দেরিতে। সভাপতি পদাধিকারবলে উপাচার্য হার্টগ। প্রথমবার ১৯২৪-২৫ সালে সম্পাদক ছিলেন জে এন সেনগুপ্ত, পরের বছর অবনীভূষণ রুদ্র। ১৯২৯-৩০ সালে সেক্রেটারি নির্বাচিত হন আতাউর রহমান খান, পরে মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নামকরণ হয় ১৯৫৩-৫৪ সালে। প্রথম ভিপি ছিলেন এস এ বারি এবং জেনারেল সেক্রেটারি জুলমাত আলী খান। দুজনই বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।

প্রথম দুই দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ এবং হল ইউনিয়নগুলোর কাজ ছিল জ্ঞানচর্চা, আত্ম–উন্নতির উপায় উদ্ভাবন এবং সমাজসেবামূলক। তারা সান্ধ্য বিদ্যালয় পরিচালনা করেছে। খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করেছে। দরিদ্র বস্তিবাসীর মধ্যে সেবামূলক কাজ করেছে। বন্যা, মহামারির মধ্যে ত্রাণকাজ পরিচালনা করেছে। প্রতি শনিবার হলগুলোতে সন্ধ্যায় আলোচনা সভা হতো। তাতে আলোচনা ও বিতর্ক হতো শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে। জাতীয় রাজনীতির বিষয়ও আলোচনা করা হতো, তবে কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করতেন না নেতারা, যদিও কোনো দলের প্রতি তাঁদের সমর্থন থাকত।

বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যাশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র; সত্য ও ন্যায়ের বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অন্য রকম অবস্থান প্রত্যাশিত নয়। ছাত্র সংসদ তার গৌরবের দিনগুলোতে সব সময় ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী। সরকারের পায়রবি করে জনগণের স্বার্থ রক্ষা কোনো কালে কোনো দেশে সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে মর্যাদাবান ছাত্র সংসদের সামনে দুটি পথের একটি খোলা: প্রতিষ্ঠানের পায়রবি করা অথবা ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ এবং ১৯৯০-এর মতো জনগণের পাশে থাকা।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

চবিতে র‌্যাগিং নিষিদ্ধ, ‘পরিচিতি পর্ব’ করতে লাগবে প্রক্টরের…
  • ২০ মে ২০২৬
শেরপুরের বাজারে অপরিপক্ব লিচুর ছড়াছড়ি, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশ…
  • ২০ মে ২০২৬
আর্থিক স্বচ্ছতা আনতে হিসাববিদদের সেলফ-রেগুলেশনের আহ্বান জান…
  • ২০ মে ২০২৬
ইবি শিক্ষকের আড়াইশ পৃষ্ঠার পিএইচডি থিসিসের মূল্যায়ন রিপোর্ট…
  • ২০ মে ২০২৬
তিন ধাপে নয়, একবারে পে স্কেল চান সরকারি চাকরিজীবীরা
  • ২০ মে ২০২৬
বিদ্যুতের পাইকারি দাম ২১ শতাংশ বাড়াতে চায় পিডিবি
  • ২০ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081