শিক্ষকতা একটা মহান পেশা। শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। তারা সুশিক্ষায় শিক্ষিত। তাদের হাত ধরেই মূলত আমরা জ্ঞানের মহাসাগর পাড়ি দেই। শিক্ষার আলো মানুষের মনকে আলোকিত করে এবং মানুষের গুণাবলিকে বিকশিত করে। শিক্ষকরা তাদের জ্ঞান, মেধা, দূরদর্শিতা, ধৈর্যশীলতা ও সততার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধাপে ধাপে গড়ে তোলেন। তারাই একটি জাতিকে গড়ে তুলে সমাজকে পাল্টে দিতে পারেন। মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা জীবনের সব ক্ষেত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষকরা শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষা দেন তা কিন্তু নয়। তারা জীবনের সর্বক্ষেত্রে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন।
বাল্যকাল থেকে শুনে আসছি শিক্ষকরা সমাজের সবচেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষ আজ শিক্ষক সমাজ। জাতি গড়ার কারিগর বলা হয় যাদের তাদের সাথে করা হয় বেইমানি। তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু না দিয়ে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়। আবার আমাদের দেশের বড় বড় জ্ঞানীগুণীরা কোন ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ালেখা না পারলে বলে শিক্ষকরা পড়ায় না কিন্তু তাদের কখনও ভাবে না শিক্ষকরা কেমন জীবন যাপন করে তারা কিভাবে চলে। শুধু মুখ দিয়ে কথার ফুলঝুরি ফোটায়।
শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি লাভ করতে পারেনা, যে জাতি যত বেশী শিক্ষিত সে জাতি তত বেশী উন্নত – এসব প্রবাদগুলো যাকে ঘিরে রচিত হয়েছে তিনি হলেন ‘শিক্ষক’। জন্মের পর একটা শিশুর অন্তর থাকে সাদা কাগজের মতো আর মাতা-পিতার কাছ থেকে প্রাক-পূর্ব প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে এ সাদা অন্তরে কিছুটা কালি পড়ে। এরপর প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে একেবারে কর্মজীবন এমনকি মৃত্যুকালীন সময়ের পূর্ব পর্যন্ত শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে থেকে তার অন্তরাটা অভিজ্ঞতায় ভরপুর করে তুলে।
আবার শিক্ষকের কাছ থেকে শিখে আমরা আজ কথা বলতে পারি, পৃথিবীকে বুঝতে পারছি, জানতে পারছি সমাজকে, উপলব্ধি করতে পারি ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, উচিৎ-অনুচিত প্রভৃতি পরিশেষে শানিত করেছি আমাদের মেধা আর মননকে। সমাজকে আলোকিত করার, সমাজ থেকে যাবতীয় কু-সংস্কার, কু-প্রথা, অন্ধকার দূর করে এই মহান শিক্ষকেরা। এ দিকে লক্ষ্য রেখেই মনে হয় এশিয়ার মিসাইল ম্যান খ্যাত সদ্য প্রয়াত ভারতের রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন-বাবা, মা, আর শিক্ষক এই তিনজন সমাজে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শিক্ষকদের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই মনে এ কথাটা বলেছিলেন আর বলবেন নাই বা কেন একজন শিক্ষার্থী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ ঘন্টাই যে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকে একথাটা আমরা অস্বীকার করতে পারিনা; এসময়ে একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষক থেকে চাল-চরণ, আচার- আচরণ, কথা-কাজ, পোশাক-পরিচ্ছেদ, স্টাইল প্রভৃতি অনুকরণ করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এতো কিছুর পর আজ পেশা জীবনে সবচেয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত আর নির্যাতিত এবং অপমানিত সম্প্রদায়ের নাম শিক্ষক সমাজ। কিন্তু কেন এই শিক্ষকরা আজ অবহেলিত কিংবা বঞ্চিত?
আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের পদোন্নতি না থাকাটা শিক্ষক লাঞ্ছনার অন্যতম এক কারণ কেননা যে শিক্ষকের বয়স ৪৫ বছর তাকে যে রকম ৩ টি স্তরভেদে ৫টি ক্লাস নিতে হয় ২২ বছরের এক টকবকে যুবক নতুন যোগদান করলেও একই পরিসমাণ ক্লাস নিতে হয় এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই তরুণ শিক্ষকের দিকে একটু খেয়াল থাকে কেননা, তার রুপ, যৌবন, আধুনিক কথাবার্তা, সবই যেকোনো শিক্ষার্থীকে আকর্ষণ করে ফলে বৃদ্ধ শিক্ষকের ক্লাসে তাদের মন বসেনা এবং অনেক সময় দেখা যায় ক্লাস নেওয়া নিয়ে তরুণ ও প্রবীণ এইসব শিক্ষকের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্ধ থাকে। পরিলক্ষিত হয় পরিশেষে, শিক্ষার্থীরা তরুণ শিক্ষকের সাথে সুর মিলায় অতএব, প্রবীণ শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হওয়ার খোরাক যোগায়। তাছাড়া যদি পদোন্নতির পথটা বন্ধুর না হয়ে মসৃণ হতো তাহলে এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতো না।
শিক্ষকতা সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন পদ। একজন মানুষের জীবনে তার পিতা-মাতার পরই সর্বোচ্চ আসনে শিক্ষকদের স্থান। দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত মহামান্য রাষ্ট্রপতিও যদি তাঁর শিক্ষককে সামনে দেখেন, তখন শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন। আর সেই শিক্ষকগণই আজ সমাজে বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ও অবহেলিত।
তাই উন্নয়নশীল বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল কলাকুশলীদের প্রতি সবিনয় অনুরোধ শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন, তবেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
লেখক: প্রধান শিক্ষক (৩৬ তম বিসিএস নন-ক্যাডার)
পূর্ব তেঁতুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঝিনাইদহ