আলোকিত বাংলাদেশ ও ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের গোলটেবিল

প্রাথমিকে যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের ভিত মজবুত হবে

৩০ এপ্রিল ২০১৮, ১০:২৫ AM

চলতি বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে শতভাগ সৃজনশীল বা যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নে পরীক্ষা নেবে সরকার। এতে শিক্ষার্থীদের ভিত আরও মজবুদ হবে। তারা মুখস্থবিদ্যা পরিহারের পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা যথাযথ প্রশিক্ষিত না হলে শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হতে পারে।

রোববার দুুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে ‘প্রাথমিক শিক্ষায় যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন প্রাথমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা। দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন (ইউনিক-২ প্রকল্প) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) মহাপরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ভালো একটি শিক্ষাক্রম করেছে কিন্তু মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। নেপ ২০১২ সাল থেকে প্রাথমিকে যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন শুরু করলেও সেটি লিখিত পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গঠনমূলক মূল্যায়ন না থাকায় সেটির সমস্যা হতো, তবে সম্প্রতি এনসিটিবি এ উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে করে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা কাটবে বলে মনে করি। 

তিনি বলেন, আমাদের বড় দুর্বলতা হচ্ছে, বাচ্চাদের শিক্ষার্থী না বানিয়ে পরীক্ষার্থী বানানো। এ ক্ষেত্রে অভিভাবককেও সচেতন হতে হবে। তারা জিপিএ-৫ আশা করেন, কিন্তু সমাপনী শেষে সন্তান কী শিখতে পেরেছে; তারা সেটা মূল্যায়ন করেন না।

মো. শাহ আলম বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মূল্যায়ন নিয়ে কাজ করে নেপ। ১০ শতাংশ দিয়ে ২০১২ সালে যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন শুরু করে নেপ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালে সেটি ৮০ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। তবে সরকারের সিদ্ধান্তে এ বছর সেটি শতভাগ হবে। আর বহুনির্বাচনী প্রশ্ন বাদ দেওয়া হবে। এর আগে জাতীয় কর্মশালার ভিত্তিতে একটি প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছি, পরে অবশ্যই সেটি পরিমার্জিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, শিক্ষার মূল ভিত্তি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। আমাদের সবার উদ্দেশ্য বাচ্চাদের সঠিক এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে তারা আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে। এটা সরকারের একটি বড় প্রতিশ্রুতি। তাই এখানে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এছাড়া সরকারের সবচেয়ে বড় সেক্টর প্রাথমিক শিক্ষা, এখানে সরকার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ করে থাকে। 

তিনি আরও বলেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়নে যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন কাজ করছে নেপ। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন। নেপে একটি প্রশিক্ষণের আয়োজনও করে মিশন। বিষয়টি আমরাও গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। আজকের বৈঠকে যে আলোচনা হবে এবং সুপারিশ করা হবে, আগামীতে এসব বিবেচনায় করবে নেপ। দেশে অনেক বেসরকারি সংস্থা প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করে। তবে আজকের এ ধরনের উদ্যোগ আগে কাউকে নিতে দেখিনি। এজন্য ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনকে ধন্যবাদ।

প্রাথমিক শিক্ষায় যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের অভিজ্ঞতা উপস্থাপনকালে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের (ইউনিক-২ প্রকল্প) বেসিক এডুকেশন কো-অর্ডিনেটর ছালেহা আক্তার বলেন, ২০১২ সাল থেকে মিশন যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করে আসছে। শোনা, বলা, পড়া ও লেখাÑ এ চারটি দক্ষতাকেই মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। এটি এনসিটিবির নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।

সূচনা বক্তব্যে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের নির্বাহী পরিচালক ড. এম এহছানুর রহমান বলেন, চলতি বছর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) বাদ দিয়ে শতভাগ যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হবে। এজন্য চলতি বছরের এপ্রিলে একটি পরিপত্র জারি করেছে নেপ। ২০১২ সালে যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন শুরু করে নেপ। এরপর থেকে ধাপে ধাপে ২০১৮ সালে তা শতভাগ হয়। 

তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন (ইউনিক-২ প্রকল্প) যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন করে যাচ্ছে। এ পরিপত্র জারি হওয়ার পর এটিকে আমরা একটি ভালো সুযোগ বলে মনে করি। আজকের এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারব। এটি জাতীয়ভাবেও একটি কন্ট্রিবিউশন হবে। ড. এম এহছানুর রহমান বলেন, আমরা নেপ থেকেও অনেক কিছু শিখেছি। তাদের সঙ্গে কর্মশালা করেছি, অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান করেছি। এ রকম পর্যায়ের মধ্য দিয়ে আমরা আজ একটি জায়গায় এসে একত্রিত হয়েছি। এখানে উপস্থিতদের আলোচনার ভিত্তিতে আগামী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে প্রশ্নপত্র কাঠামো প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীদেরও যথাযথ মূল্যায়ন হবে বলে মনে করি। 

স্বাগত বক্তব্যে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের যুগ্ম সম্পাদক কাজী আলী রেজা বলেন, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের একটি প্রতিষ্ঠান দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ। এ পত্রিকাটি শিগগির ৬ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। এটি সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের রেটিংয়ের মধ্যে দেশের বাংলা জাতীয় দৈনিকে ১২তম অবস্থানে রয়েছে। প্রকৃত অর্থে এটির অবস্থান ৪ অথবা ৫ নম্বরে। এ দৈনিকের সেøাগানÑ ‘উন্নয়নের মূল ধারায় আলোকিত বাংলাদেশ’। এ পত্রিকাটি সরকার-এনজিও কিংবা ব্যক্তিগত উন্নয়ন কর্মকা-কে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। 

তিনি বলেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়ন হয় না আর প্রাথমিক শিক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আজকের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে যা আলোচনা হবে, তা চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে যেতে আমরা সহায়তা করব। সেক্ষেত্রে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে আলোকিত বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত আকারে সবার বক্তব্য সেখানে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হবে।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইস্টিটিউটের অধ্যাপক এম নাজমুল হক বলেন, স্কুলগুলোকে দায়িত্ব দিতে হবে, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের সুযোগ পায়। এজন্য ৫০ শতাংশ নম্বর স্কুলের জন্য এবং বাকি ৫০ শতাংশ কেন্দ্রীয়ভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। সেক্ষেত্রে স্কুল ও কেন্দ্রীয় দুই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই শুধু উত্তীর্ণ  বলে স্বীকৃতি দিতে হবে। আমাদের যে অর্জনীয় ২৯টি যোগ্যতা আছেÑ সেগুলো যথাযথ অর্জনের জন্য ছাত্র-শিক্ষকের যে অনুপাত, তা সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসতে হবে। 

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম বলেন, আমাদের এখনকার যে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, তাতে আমরা আসলে শিক্ষার্থী নয় বরং পরীক্ষার্থী সৃষ্টি করছি। এতে চলমান মূল্যায়নে কোনো ধরনের মূল্যায়ন হচ্ছে না। পাঠ্যবইগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পাঠ্যবইগুলো দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের বইগুলো অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু বইগুলোয় সঠিক বানান ঠিক করা হয়নি, কিছু কবিতায়ও নেই সঠিক যতিচিহ্ন। এছাড়া আমরা পাঠ্যবইয়ে শিখনফল যুক্ত করে দিয়েছি কিন্তু যারা এসব পাঠদান করেন কিংবা মূল্যায়ন করবেন, তারা এসব বিষয়ে জানেন কিনা- এটা নিশ্চিত করতে হবে। এনসিটিবির কাজ হচ্ছে উন্নত পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষা উপকরণ প্রণয়ন করা কিন্তু যারা এসব পড়াবেন বা মূল্যায়ন করবেন তাদেরও উন্নতমানের হতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

সিলেট বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ডেপুটি ডিরেক্টর তাহমিনা খাতুন বলেন, শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ তৈরি করার জন্য যেসব অর্জনীয় গুণাবলী আছে, সেগুলো অর্জন করা দরকার। সেক্ষেত্রে তারা কী শিখছে- শুধু এটা মূল্যায়ন করলেই হবে না বরং পাশাপাশি তারা কী যোগ্যতা অর্জন করছে, তা মূল্যায়ন করতে হবে। তিনি মন্তব্য করে বলেন, যেহেতু শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষকরা পড়ান, তাই তাদের মূল্যায়নও শিক্ষকরাই করবেন। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জ্ঞানমূলক অংশ এবং শিক্ষার্থী সে বিষয়টি গভীরভাবে পড়েছে কিনা, তা যাচাই করতে নৈর্ব্যক্তিক থাকার ব্যাপারেও মতামত দেন তিনি।

এডিডি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর শফিকুল ইসলাম বলেন, যেহেতু একটি শিশুর প্রাথমিক সামাজিকীকরণের বিষয়গুলো শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরিবার থেকে, তাই প্রতিটি পরিবার ও প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের সামাজিকীকরণের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এজন্য শিক্ষকদের ব্যবস্থাপনা এবং পিতা-মাতার অবদানও বিবেচনা করা দরকার।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের এলাকাভিত্তিক জ্ঞানও দিতে হবে। আমাদের ক্ষেত্রে এটা না হওয়ায় বড় রকমের গ্যাপ নিয়েই বড় ধরনের পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। এছাড়া আমাদের যে ‘স্কোরিং সিস্টেম’ তা যথেষ্ট নয়। এতে শিক্ষার্থীদের কাছে ‘পিএসসি’ পরীক্ষা মানেই একটি যন্ত্রণার বিষয়। এর মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণ করতে পারছি না। পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার উদ্দেশ্য যে ২৯টি যোগ্যতা অর্জনের কথা, তা চলমান পদ্ধতির পরীক্ষায় যাচাই করতে পারছি না। এজন্য এ ব্যবস্থাও পরিবর্তন করা দরকার। 

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের নির্বাহী পরিচালক ড. এম এহছানুর রহমানের সঞ্চালনায় মুক্ত আলোচনায় আরও অংশ নেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এডুকেশন প্রোগ্রামের প্রধান মুর্শিদা আক্তার, ব্র্যাকের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল ইসলাম, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য (পাঠ্যবই) অধ্যাপক ড. মিয়া এনামুল হক সিদ্দিক, ঢাকাস্থ ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম অফিসার শিরিন আক্তার, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী গবেষণা কর্মকর্তা মাহফুজা খাতুন, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের ডিরেক্টর অব প্রোগ্রাম ড. খাজা শামশুল হুদা, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সিনেডের সিইও শাহনেওয়াজ খান প্রমুখ। এছাড়া গোলটেবিল বৈঠকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের (ইউনিক-২) প্রকল্প পরিচালক গোলাম ফারুক হামিম।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ফল আবার প্রকাশের সিদ্ধান্ত
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রাথমিকের কারিকুলামে যুক্ত হতে পারে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে বিভিন্ন গ্রেডে চ…
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
খাগড়াছড়িতে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন, টিকার আওতায় আসবে ৭৯ হাজার…
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
শেষ মুহূর্তে একাদশে ফেরার ‘গল্প’ জানালেন শরিফুল
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
জুনায়েদ-রাফে-ইরা-হাসিবদের বরণ করল এনসিপি
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬