শেনজেন ভিসা থাকলে ঘুরতে পারবেন ইউরোপের ২৭ দেশে © সংগৃহীত
বিদেশ ভ্রমণের স্বপ্ন অনেকেই দেখেন, কিন্তু ভিসা প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় অনেক সময় সেই স্বপ্নে ভাটা পড়ে। তবে ইউরোপ ভ্রমণের জন্য রয়েছে এক অসাধারণ সমাধান—শেনজেন ভিসা। এই একটি ভিসা নিয়ে আপনি ভ্রমণ করতে পারেন ইউরোপের ২৭টি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে, আলাদা করে প্রতিটি দেশের জন্য ভিসা নিতে হবে না।
‘শেনজেন ভিসা’ অন্যান্য সাধারণ ভিসার তুলনায় আলাদা, কারণ এটি একটি ভিসা নিয়েই ইউরোপের ২৭টি দেশ ভ্রমণ করার সুযোগ দেয়। এসব দেশ নিজ নিজভাবে স্বাধীন হলেও, ভিসা নীতিতে তারা একতাবদ্ধ। তাই শেনজেনভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ভিসা পেলে বাকি ২৬টি দেশেও অনায়াসে যাতায়াত করা যায়, আলাদা ভিসার প্রয়োজন হয় না।
শেনজেন ভিসার পরিচিতি
ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি একীভূত অঞ্চল তৈরি করে সবার যাতায়াত সহজ করা লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে লুক্সেমবার্গের শেনজেন শহরে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তির ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছে শেনজেন এলাকা এবং শেনজেন ভিসা। ইউরোপের অধিকাংশ এলাকা এই শেনজেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই ভিসা নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য বেড়ানো বা ব্যবসা সংক্রান্ত প্রয়োজনে ইউরোপ ঘুরে আসা যায়।
শেনজেন অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ৪৪-৪৫ কোটি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ অভ্যন্তরীণ সীমান্ত অতিক্রম করে কাজ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অংশ নেয়। শেনজেন চুক্তির ফলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়েছে, তবে শেনজেন এলাকার বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার রয়েছে।
আরও পড়ুন: জেনে নিন বিশ্বসেরা ১০ ফুল-ফ্রি স্কলারশিপ সম্পর্কে
শেনজেনভুক্ত দেশগুলো হলো
অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, চেকিয়া (Czechia), ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ইতালি, লাতভিয়া, লিচেনস্টাইন, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন এবং সুইজারল্যান্ড।
কীভাবে শেনজেন ভিসা পাবেন
অনলাইনে আবেদন করা যায়। আবেদন করতে এবং বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা অনুমোদিত ভিসা আবেদন কেন্দ্রের (যেমন VFS Global) ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করতে হবে।
বি.দ্র: আবেদন ফর্মটি সতর্কতার সঙ্গে পূরণ করতে হবে। কোনো ঘর ফাঁকা রাখা যাবে না এবং তথ্যে ভুল থাকা যাবে না। এমন হলে ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হতে পারে। আবেদন ফরমে অবশ্যই তারিখ ও স্বাক্ষর থাকতে হবে।
শেনজেন ভিসা ফি
শেনজেন ভিসা পাওয়ার স্ট্যান্ডার্ড ফি ৯০ ইউরো। এই ফি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। ছয় থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য ভিসা ফি ৪৫ ইউরো। ছয় বছরের নিচের শিশুদের ভিসা ফি লাগে না।
আরও পড়ুন: জেনে নিন ইউরোপের সেরা ১০ স্কলারশিপ সম্পর্কে
মনে রাখবেন
*ভিসা ফি দূতাবাস বা ভিসা আবেদন কেন্দ্রের নির্ধারিত পদ্ধতিতে (নগদ/কার্ড) পরিশোধযোগ্য।
*ফি জমা দেওয়ার পর তা ফেরতযোগ্য নয়, এমনকি ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও।
বাংলাদেশ থেকে শেনজেন ভিসা পাওয়ার উপায়
বাংলাদেশে যে শেনজেনভুক্ত দেশগুলোর দূতাবাস বা অনুমোদিত ভিসা সেন্টার রয়েছে, সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট প্রধান গন্তব্য দেশের জন্য আবেদন করতে হবে। সাধারণত যে দেশে সবচেয়ে বেশি সময় অবস্থান করবেন, সেই দেশের দূতাবাসে আবেদন করতে হয়।
আরও পড়ুন: জেনে নিন মধ্যপ্রাচ্যের ১১ স্কলারশিপ সম্পর্কে
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
১. ভিসা আবেদনের সাথে যে যে কাগজপত্র জমা দিতে হবে
*ভ্রমণ শেষে অন্তত ৩ মাস মেয়াদ থাকবে এমন পাসপোর্ট জমা দিতে হবে;
*দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড);
*পাসপোর্টের ব্যক্তিগত তথ্যের পৃষ্ঠাগুলোর পরিষ্কার ফটোকপি;
*প্রতিটি কাগজের মূল কপির সঙ্গে একটি করে ফটোকপি জমা দিতে হবে;
*প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইংরেজি অথবা সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষায় অনুবাদ করে জমা দিতে হতে পারে;
*স্বাস্থ্য বিমা করতে হবে (ন্যূনতম ৩০ হাজার ইউরো কভারেজ);
২. ভ্রমণ ভিসার ক্ষেত্রে
*ভ্রমণ পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য;
*সাধারণত বিগত ৬ মাসের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বিবরণ;
*হোটেল বুকিং বা আবাসনের প্রমাণ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে);
*ম্যারেজ সার্টিফিকেট, বার্থ সার্টিফিকেট এবং সন্তান-সন্ততির তথ্য (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে);
আরও পড়ুন: স্টুডেন্ট ভিসা রিফিউজড হচ্ছে যে পাঁচ ভুলে
৩. বিজনেস ভিসার ক্ষেত্রে
*প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে অফিশিয়াল চিঠি;
*আমন্ত্রণপত্র (ইংরেজি বা সংশ্লিষ্ট ভাষায়);
*ট্রেড লাইসেন্স ও কোম্পানির ব্যাংক হিসাব বিবরণী;
*সার্টিফিকেট অব ইনকর্পোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানি দলিল (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে);
*বাংলাদেশ ও বিদেশে লেনদেনের তথ্য (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে);
*বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্টল বরাদ্দপত্র বা এক্সিবিটর পাস;
৪. কারও সাথে দেখা করার ক্ষেত্রে
*আমন্ত্রণকারী ব্যক্তির স্বাক্ষরিত গ্যারান্টর/ইনভাইটেশন ফরম;
*বিগত ৬ মাসের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বিবরণ;
*সম্পর্কের প্রমাণপত্র;
*ফ্লাইট রিজার্ভেশন;
*আবাসনের প্রমাণ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে);
আরও পড়ুন: আইইএলটিএস ছাড়াই আবেদন করা যাবে যেসব স্কলারশিপে
৫. শিশুদের ক্ষেত্রে
*বাবা-মা বা বৈধ অভিভাবকের অনুমতিপত্র;
*ভিসা আবেদনের সময় অভিভাবকের উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে;
৬. এয়ারপোর্ট ট্রানজিট ভিসার ক্ষেত্রে
*চূড়ান্ত গন্তব্য দেশের ভিসা (যদি প্রযোজ্য হয়);
*ফ্লাইট রিজার্ভেশন;
বি.দ্র: ট্রানজিট ভিসার ক্ষেত্রে সাধারণত স্বাস্থ্যবিমা প্রয়োজন হয় না;
ভিসা ইন্টারভিউ
শেনজেনভুক্ত দেশগুলোর দূতাবাস আবেদনকারীর সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে পারে। এই সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করতে হবে।