প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
শবে কদর মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ রাত হিসেবে বিবেচিত। শবে কদরের ফজিলত সরাসরি পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। আর শবে বরাতের মাহাত্ম্য সরাসরি কোরআনে উল্লেখ না থাকলেও বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে এ রাতের ফজিলত প্রমাণিত হয়েছে। এ রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে রাত জেগে নফল ইবাদত করার ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের ঢল নামে। অনেকেই নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও বিভিন্ন ইবাদতে সময় অতিবাহিত করেন।
শুধু এ দুটি রাতই নয়, ইসলামে আরও কয়েকটি রাতকে ফজিলতপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাপ্তাহিক জুমার রাত এবং দুই ঈদের রাতও গুরুত্বপূর্ণ বলে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। এ বিষয়ে হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন, “পাঁচটি রাত এমন আছে, যেসব রাতে করা দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না—জুমার রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শাবান মাসের ১৪ তারিখের রাত এবং দুই ঈদের রাত।” (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৯২৭)।
এ ছাড়া খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) আদি ইবনে আরতাতকে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন, “বছরের চারটি রাত অবশ্যই লক্ষ রাখবে। কারণ ওই রাতগুলোতে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় রজব মাসের প্রথম রাত, শাবান মাসের ১৪ তারিখের রাত, ঈদুল ফিতরের রাত এবং ঈদুল আজহার রাত।” (আত-তালখিসুল হাবির, ইবনে হাজার, ২/১৯১)।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, সাপ্তাহিক জুমার রাত কিংবা দুই ঈদের রাতে নফল ইবাদতের জন্য মসজিদে মানুষের উপস্থিতি খুব বেশি না থাকলেও শবে কদর ও শবে বরাতের রাতে মসজিদগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকে। অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত নফল ইবাদতে মগ্ন থাকেন। আবার তরুণ-যুবকদের অনেককে রাতভর ঘুরে বেড়াতেও দেখা যায়। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকার পর অনেকেই শেষ প্রহরে ঘুমিয়ে পড়েন এবং ফজরের ফরজ নামাজ আদায়ে তেমন গুরুত্ব দিতে দেখা যায় না।
ইসলামি শিক্ষায় ফজিলতপূর্ণ রাতে নফল ইবাদত করার পর ফরজ নামাজ আদায় না করাকে অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার ফরজ ইবাদতের হিসাব নেবেন। নফল ইবাদত মূলত ফরজ ইবাদতের ঘাটতি পূরণের জন্য কাজে আসে।
এ বিষয়ে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, “কিয়ামতের দিন বান্দার সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে তার সালাতের। যদি তার সালাত সঠিক হয়, তবে সে সফলকাম হবে এবং নাজাত পাবে। আর যদি সালাত নষ্ট হয়ে যায়, তবে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি ফরজ সালাতে কোনো ঘাটতি থাকে, তবে আল্লাহ বলবেন দেখো, আমার বান্দার কোনো নফল আমল আছে কি না। তখন সেই নফল দ্বারা ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে। এরপর তার অন্যান্য আমল সম্পর্কেও একইভাবে বিচার করা হবে।” (আবু দাউদ, হাদিস: ৮৬৪)।
এই হাদিস নফল ইবাদতের ফজিলত তুলে ধরার পাশাপাশি ফরজ ইবাদতের গুরুত্বের কথাও স্পষ্ট করে। ফরজ ইবাদতে অবহেলা করলে আল্লাহ তায়ালার কঠিন শাস্তির কথাও কোরআনে উল্লেখ রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নবী ও হেদায়েতপ্রাপ্তদের পর এমন এক অপদার্থ বংশধর এল, যারা নামাজ নষ্ট করল এবং প্রবৃত্তির অনুসারী হলো। সুতরাং তারা ‘গাই’ নামক জাহান্নামের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোনো ধরনের জুলুম করা হবে না।” (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৯–৬০)।
কোরআনের আরেক আয়াতে কেয়ামতের দিনের একটি দৃশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে জাহান্নামবাসীদের জিজ্ঞাসা করা হবে ‘কেন তোমরা সাকার নামক জাহান্নামে এলে?’ তারা বলবে, “আমরা তো নামাজি ছিলাম না এবং আমরা মিসকিনদের খাবার দিতাম না। বরং আমরা সমালোচনাকারীদের সঙ্গে সমালোচনায় নিমগ্ন থাকতাম। এমনকি আমরা প্রতিদান দিবস (কেয়ামত) অস্বীকার করতাম। এভাবেই হঠাৎ আমাদের মৃত্যু এসে গেল।” (সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত: ৩৮–৪৭)।
কোরআনের সতর্কবার্তার পাশাপাশি হাদিসেও ফরজ নামাজ ত্যাগকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোনো ব্যক্তি এবং কুফর ও শিরকের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ত্যাগ করা। যে নামাজ ছেড়ে দিল, সে কাফের হয়ে গেল (অর্থাৎ কাফেরের মতো কাজ করল)।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮২)।
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, “আমাদের এবং কাফেরদের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ। যে নামাজ ত্যাগ করল, সে কাফের হয়ে গেল।” (তিরমিজি, হাদিস: ২৬২১)।
তাই ইসলামি শিক্ষায় নফল ইবাদতের পাশাপাশি ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায়ের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে নফল ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে ফরজ ইবাদতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে তা যথাযথভাবে পালনের তাওফিক দান করুন এটাই মুসলমানদের প্রত্যাশা। আমিন।