পাঠক শূন্যতায় ধুলো জমেছে জবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে

লাইব্রেরি
জবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি  © টিডিসি ফটো

বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেষে গড়ে ওঠা পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজটি ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হলেও এখনো সমৃদ্ধ হয়নি এর লাইব্রেরি। বরং দিন যত যাচ্ছে ততই লাইব্রেরি তার খেই হারিয়ে ফেলছে। নেই পাঠকের আনাগোনা। ফলে পাঠক শূন্যতায় ধুলো জমছে দিন দিন। অন্যদিকে ক্যাটালগের বই দীর্ঘদিন কেউ স্পর্শ না করায় সেখানেও জমেছে ধুলো। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের হাতের নাগালে বই নেয়ার জন্য ডিজিটাল ই-লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হলেও কারিগরি জটিলতায় তাও কাজে আসছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ভর করেছে পাঠক শূন্যতা। 

সরজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা যায় লাইব্রেরিতে কোন পাঠক নেই। লাইব্রেরিতে ঢুকতেই সবার আগে চোখে পড়ে বইয়ের ক্যাটালগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের সিলেবাস ঘেটে ক্যাটালগে মাস্টার্সের ১ম সেমিষ্টারের বিশ্বসাহিত্য-১ কোর্সের  বুদ্ধদেব বসু রচিত কবি রবীন্দ্রনাথ রেফারেন্স বই, সেমিষ্টারের সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য সমালোচনা কোর্সের কবীর চৌধুরী রচিত সাহিত্যকোষ বই, মাষ্টার্স ২য় বর্ষের ১ম সেমিস্টারের বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস কোর্সের জন্য বিশ্বজিৎ ঘোষ রচিত বাংলাদেশের সাহিত্য বইসহ কোর্স তিনটির কোন রেফারেন্স বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। লাইব্রেরির পাঠকসংখ্যার বই ঘেটে দেখা যায়, গত ৩ তিন মাসে মোট ১ হাজার ৩৭৬ জন শিক্ষার্থী এসেছে লাইব্রেরিতে । লাইব্রেরিতে আসা শিক্ষকদের সংখ্যাও খুব কম। তারা এসে নির্দিষ্ট বই পান না। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের গনযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, লাইব্রেরিতে রেফারেন্স বই পাওয়া যায় না। তাই লাইব্রেরিতে যাওয়া হয় না। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাইলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জাকারিয়া মিয়া বলেন, লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ বই ও জার্নাল নেই। ল্যাপটপ গুলো কাজ করতে অনেক সময় নেয়। গবেষণার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত বই ও সুবিধা পাওয়া যায় না। তাই লাইব্রেরিতে যাওয়া হয় না। 

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে শিক্ষার্থীরা বই খাতা পত্র নিয়ে ঢুকতে পারে না। তাদেরকে বই ও ল্যাপটপ নিয়ে ঢুকতে দিতে হবে। সিলেবাসভুক্ত বইয়ের সংখ্যা খুবই কম, তা বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক প্রয়োজনে নোট রেফারেন্স প্রয়োজন, এজন্য একটি কমনরুমও লাইব্রেরিতে দরকার। যাতে সেখানে তারা নোট করতে পারে। এছাড়া শিক্ষকদের জন্য গবেষণার সুষম পরিবেশ তৈরি করতে হবে; যেন সকল বিষয়াবলী মুহূর্তেই পাওয়া যায়। 

আরও পড়ুন: পা-য়ে ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, পা দিয়েই হতে চান জজ

তথ্য সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৫০টি আসন। তবে লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠালগ্নে আসন সংখ্যা আরও বেশি ছিল। ২০১৬ সালে লাইব্রেরির জায়গায় কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সেমিনার ও ল্যাবের জন্য ছেড়ে দিলে লাইব্রেরির আসন সংখ্যা কমে যায়। এ লাইব্রেরিতে এখন ২০ হাজার বই আছে। প্রতিষ্ঠালগ্নের সময় লাইব্রেরিতে বই ছিল ১৮ হাজার। যা তৎকালীন কলেজের সিলেবাসের বই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ১৬ বছরে লাইব্রেরি বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র দুই হাজার। 

জানা যায়, লাইব্রেরির জন্য বার্ষিক বাজেট ২০ লাখ টাকা। কিন্তু এ বাজেটের টাকা লাইব্রেরিতে আসে না। লাইব্রেরির বই কেনার এ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটের সেমিনারের বই কেনার জন্য দেয়া হয়। এসব সেমিনারে বই কেনার পরে বই কিনে তিন ভাগের দুই ভাগ বই লাইব্রেরিতে দেয়ার রীতি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগগুলোর সেমিনারে বই ঘাটতি থাকায় বই কেনার পরে লাইব্রেরিতে দেয়া হয় না। 

এ বিষয়ে বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. পারভীন আক্তার জেমী বলেন, প্রতিবছর বিভাগের সেমিনারের বই কেনার জন্য মাত্র ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এই টাকায় বই কিনে তিন ভাগের দুইভাগ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দিতে হয়। একটা বিভাগের জন্য খুবই কম পরিমান টাকা এটা। এই টাকাটা শুধুমাত্র বিভাগের জন্য হলেও কম হয়ে যায়। রেফারেন্স বইয়ের অনেক দাম। 

একাধিক শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষকদের বই কেনার জন্য বছরে মাত্র দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়। পেনশনের টাকা উত্তোলনের সময় অডিটে আপত্তি তোলা হয়। তারা বলেন, এটা বন্ধ করে শিক্ষকদের বইয়ের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো উচিৎ।

আরও পড়ুন: জাবির প্রস্তাবিত সিন্ডকেট সদস্যের তালিকায় বিতর্কিত দুই শিক্ষক

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিয়ান এনামুল হক বলেন, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে যে পরিমান বই,জার্নাল থাকার কথা তার তুলনায় আমাদের একেবারেই কম পরিমান আছে। 

ই-লাইব্রেরির বেহাল দশা
দেশের বেশির ভাগ পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জ্ঞান চর্চার জন্য অটোমেশন এ্যান্ড ডিজিটালাইজেশন ব্যবস্থা থাকলেও ভাড়ে ভবানি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিটি অটোমেশন এ্যান্ড ডিজিটালাইজেশন করতে ইতোপূর্বে দুইটা ডিজিটালাইজেশন কমিটি গঠন করে দ্বায়িত্ব দেওয়া হলেও কাজের পরিমান শূন্য। লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে একাধিক বার অটোমেশনসহ অন্যান্য প্রোজেক্টের প্রস্তাবনা দিলেও সফল হয় নি কোন কমিটি। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন তারা অটোমেশন এ্যান্ড ডিজিটালাইজেশন করার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তাবনা করে রিপোর্ট জমা দেয় সাবেক উপাচার্যের নিকট। কিন্তু সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাজেট পাশ না করলে কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

২০১৫ সালের ২৩ মার্চ উদ্বোধন হয় ই-লাইব্রেরি। ই-লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সাত বছর পেরিয়ে গেলোও নেই পর্যাপ্ত পরিমান বই ও জার্নাল। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে এ যাবৎ কালীন মোট ই-বুক আছে ১ লাখ ৬৬ হাজার এবং ই-জার্নালের সংখ্যা ৪৬ হাজার। এবং এসকল ই-বুকের মেয়াদ আছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। কিন্তু এ লাইব্রেরিতেও পাঠকসংখ্যা নেই। গত তিন বছরে ই-লাইব্রেরিতে আসা শিক্ষার্থীদের কোন তথ্য নেই। এবছর মার্চে ৫৮ জন এবং ফেব্রুয়ারীতে ৬ জন শিক্ষার্থী লাইব্রেরিতে এসেছে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ই-লাইব্রেরি ব্যবহারের নিয়ম জানেন না। ফলে তারা লাইব্রেরির কম্পিউটারে অন্যান্য কাজ সারেন। এদিকে ই-লাইব্রেরির ১০০টি ল্যাপটপের মধ্যে ২০টি একদম নষ্ট। বাকিগুলোরও বেহালদশা। কোনটা অন হয় কোনটা অন হয় না। ২০১৭-২০১৮ বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল্যাপটপগুলো দেওয়া হয়।

বর্তমান লাইব্রেরি অটোমেশন এ্যান্ড ডিজিটালাইজেশন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সেলিম বলেন, আগে কি হয়েছে বা এতদিন যাবৎ কেনো ডিজিটাল হয় নি আমি জানিনা না। আমি দায়িত্ব পাবার পরপরই কমিটির সবাইকে নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছি। ইতোমধ্যে আমরা কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল লাইব্রেরির নমুনা দেখেছি। ইনশাআল্লাহ ভালো কিছুই হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড.পরিমল বালা বলেন, বর্তমান সময়ে অবশ্যই কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিকে অটোমেশন এ্যান্ড ডিজিটালাইজেশন করা জরুরি। এদিকটাতে আমরা পিছিয়ে আছি। খুব দ্রুতই এটা বাস্তবায়ন করলে  শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণাকাজ সহজ হবে। পাশাপাশি লাইব্রেরিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বান্ধব করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় বইয়ের পরিমান বৃদ্ধি করতে হবে।

এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক বলেন, এটা অনেক বড় একটা বিষয়। এতদিনে হয়নি এখন সব হবে ।


x