তিতুমীর কলেজ
ছাত্রসংসদের কক্ষে বসে আছেন ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি এবং কয়েকটি ক্লাব সংগঠনের নেতারা। © টিডিসি ছবি
সরকারি তিতুমীর কলেজে প্রায় তিন দশক ধরে ছাত্র সংসদের নির্বাচন নেই। নেই কোন কার্যক্রম। তবে ছাত্র সংসদের জন্য নির্ধারিত কক্ষটি ব্যবহার করছেন কলেজ শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির নেতারা। ৫ আগস্টের আগে কক্ষে বসত কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্র সংসদের কক্ষে ছাত্রদল-ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের বসার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে নতুন সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সরেজমিনে ছাত্র সংসদের কক্ষে গিয়ে দেখা গেছে, কক্ষটি খোলা রয়েছে। সেখানে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। এ সময় তাদের দুজন ভিপি ও জিএসের নির্ধারিত চেয়ারে বসে ছিলেন। ছাত্র সংসদের কক্ষে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বসার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এছাড়া ছাত্র সংসদের কক্ষটি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সে সময় ওই কক্ষে ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নোবেল ইসলাম সূর্য, আহ্বায়ক সদস্য মেহেদী হাসান মাল এবং ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ন আহ্বায়ক মো. ফয়সাল খান বসে ছিলেন। এ ছাড়া কলেজের রেড ক্রিসেন্ট এর দলনেতা ওয়াহিদ ইসলাম অনিককে বসে থাকতে দেখা গেছে।
‘এভাবে বসার অনুমতি মনে হয় নেই। তবে বারবার প্রশাসনকে বলার পর তারা ছাত্র সংসদটি খুলে দিয়েছে। আমি সেখানে বসেছি, যাতে শিক্ষার্থীরা এসে তাদের টাকার হিসাব নিতে পারে এবং পরবর্তীতে নির্বাচন হয়। শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আমি সেখানে বসে ছবি তুলেছি’: মেহেদী হাসান মাল, আহ্বায়ক সদস্য, তিতুমীর কলেজ ছাত্রদল।
জানা যায়, ৫ আগস্টের পূর্বে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্র সংসদের কক্ষটি তাদের রাজনৈতিক অফিস হিসেবে ব্যবহার করত।
সমালোচনা করে শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্র সংসদের কক্ষটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একটি জায়গা। সেখানে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়মিত অবস্থান করা উচিত নয়। ছাত্র সংসদ না থাকলে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। অন্যথায় কোনো একটি সংগঠন কক্ষটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ছাত্রলীগও এটি তাদের অফিস হিসেবে ব্যবহার করত।
ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ন আহ্বায়ক মো. ফয়সাল খান বলেন, এখানে বসার কারণ হলো, সেদিন আমরা মূলত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় আমাদের পরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রম চলবে, নাকি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায়—কোনটি আমাদের জন্য ভালো হবে, তা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। এ কারণেই আমরা সেখানে বসেছিলাম।
এ বিষয়ে ছাত্র সংসদের কক্ষে বসার বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মেহেদী হাসান মাল বলেন, এভাবে বসার অনুমতি মনে হয় নেই। তবে বারবার প্রশাসনকে বলার পর তারা ছাত্র সংসদটি খুলে দিয়েছে। আমি সেখানে বসেছি, যাতে শিক্ষার্থীরা এসে তাদের টাকার হিসাব নিতে পারে এবং পরবর্তীতে নির্বাচন হয়। শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আমি সেখানে বসে ছবি তুলেছি।
কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নোবেল ইসলাম সূর্য বলেন, শিক্ষার্থীদের বসার জন্যই এটি খুলে রাখা হয়েছে। ছাত্র সংসদ নেই বলে যদি গেট বন্ধ থাকত, তাহলে কেউ যেত না। গেট খোলা ছিল, অনেকেই যাচ্ছিলেন। তাই আমরাও গিয়েছি এবং সেখানে বসে রাজনৈতিক আলোচনা করেছি। শুধু আমি নই, আরও অনেকে সেখানে গিয়েছেন।
‘১৯৯৬ সালের পর থেকে নির্বাচন হচ্ছে না, তাই বলে কি রুম বন্ধ থাকবে? শিক্ষার্থীদের একাংশ এসে আমাদের কাছে রুমটি খোলার দাবি জানালে তাদের দাবির ভিত্তিতে আমরা রুমটি খুলে দিয়েছি। রুমটি খোলা থাকলে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করবে এবং রুমটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে’: অধ্যাপক এম এম আতিকুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষক পরিষদ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ ড. ছদরুদ্দিন আহমদ বলেন, এটা আগেও খোলা হতো। নতুন করে আবার খোলা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি সবকিছু জানি না। শিক্ষক পরিষদ সম্পাদক আতিক স্যার ভালো জানেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করো।
শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক অধ্যাপক এম এম আতিকুজ্জামান বলেন, ১৯৯৬ সালের পর থেকে নির্বাচন হচ্ছে না, তাই বলে কি রুম বন্ধ থাকবে? শিক্ষার্থীদের একাংশ এসে আমাদের কাছে রুমটি খোলার দাবি জানালে তাদের দাবির ভিত্তিতে আমরা রুমটি খুলে দিয়েছি। রুমটি খোলা থাকলে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করবে এবং রুমটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে।
প্রসঙ্গত, তিতুমীর কলেজ প্রতিষ্ঠার এক বছর পর থেকেই তিতুমীর কলেজে ছাত্র সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৯-৭০ শিক্ষাবর্ষে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন সিরাজউদ্দৌলা এবং জিএস হন মফিজুল ইসলাম। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দলীয় প্রভাবের কারণে ছাত্র সংসদের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। কয়েক বছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা ধারাবাহিকভাবে চালু থাকেনি। ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র সংসদের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে প্রায় তিন দশক ধরে তিতুমীর কলেজে আর কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্র সংসদের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নেই।