আটক ছাত্রলীগ কর্মী মুনতাছির মারজু © টিডিসি সম্পাদিত
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকায় মুনতাছির মারজু নামে এক শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। আজ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এএফ রহমান হল থেকে তাকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়ার পর সেখান থেকে হাটহাজারী থানায় প্রেরণ করা হয়।
আটক মুনতাছির মারজু রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী। তাকে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করার জন্য ছাত্রলীগ থেকে ‘নিযুক্ত’ করা হয়েছিল। ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথনের সূত্রে এসব তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
চবি প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে চাকসু নেতৃবৃন্দ মোটরসাইকেলে চড়ে ক্যাম্পাসে টহল দেওয়ার একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন। পরে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের চবি শাখার সাবেক সহ-সভাপতি আবরার শাহরিয়ার সেই পোস্টের স্ক্রিনশট নিয়ে নিজ টাইমলাইনে পোস্ট দেন। পোস্টের ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘যে বাইকে শোডাউন দাও, সে বাইকের চাবি আমাদের হাতে; যে হলে থাকো, সে হলে যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে আমাদেরই ইশারায়!’
ওই পোস্টে আটক মুনতাছির লাভ রিঅ্যাক্ট দেওয়ায় তাকে সন্দেহ করা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপরে তার মুঠোফোন থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা আবরার শাহরিয়ারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে উঠে আসে তাকে সাংবাদিক হিসেবে অ্যাসাইন করার তথ্যও।
একটি ভয়েস ম্যাসেজে আবরার শাহরিয়ার মুনতাছির মারজুকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘মেহেদী (মেহেদী হাসান ইমন, সমকাল পত্রিকার চবি প্রতিনিধি) একটা ছোট ভাই আছে, সাংবাদিক। তুমি চিনলেও চিনতে পারো। ওর নাম্বার দিচ্ছি। ওর সাথে দেখা কইরো। আর ওর সাথে আগের পরিচয় আছে কিনা, পরিচয় না থাকলেও কোনো প্রবলেম নাই। আমার রেফারেন্সটা দিবা। ওর সাথে দেখা করে কথা বইলো, আড্ডা-টাড্ডা দিও সাংবাদিকতার বিষয়টা নিয়ে।’
পরে কিছু না বললেও মেহেদী বুঝতে পারবেন—এমন ইঙ্গিত দেন আবরার শাহরিয়ার। বলেন, ‘তোমার কিছু বলা লাগবে না। জাস্ট দেখা করবা, দেখা করে কথা বলবা, এই আর কি, নরমাল। ক্যাম্পাসে যা হয় আর কি সিনিয়র-জুনিয়র।’
আটক মুনতাছিরের বিভাগের সিনিয়র ও ২০২০-২০২১ সেশনের শিক্ষার্থী শাহিন আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মুনতাছিরকে প্রথমে হল সংসদে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাকে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তখন তার ফোন চেক করা হয়। এরপর চাকসুর মোনায়েম শরীফ ভাই আসেন।
চাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক মোনায়েম শরীফ বলেন, মুনতাছিরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও তার ফোনে আবরার শাহরিয়ারের সঙ্গে কথোপকথন প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে ষড়যন্ত্রমূলক বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরে তাকে প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়া হলে প্রক্টর এসব তথ্য ও প্রমাণ দেখে পুলিশকে জানান।
আটক মুনতাছির মারজু দাবি করে বলেন, ছাত্রলীগের কোনো কমিটিতে আমার নাম নেই এবং আমি কখনো ছাত্রলীগ করিনি। আবরার শাহরিয়ারের সঙ্গে জুলাইয়ের আগে থেকে আমার যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আমার সঙ্গে কথা হতো। কোনো রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে আমি অংশ নেইনি।
চবি প্রক্টর কামরুল হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীরা মুনতাছিরকে আটক করে তার ফোন চেক করেন এবং পরে বিভিন্ন কথোপকথনের বিষয়টি প্রশাসনকে জানায়। প্রশাসনও বিষয়টি দেখেছে। যেহেতু বিষয়টি ফৌজদারি ও আইনগত, তাই পুলিশকে জানানো হয়েছে। পুলিশ তাকে আইনগত কার্যক্রমের জন্য নিয়ে গেছে।
রাত সাড়ে ৮টায় মুঠোফোনে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে হাটহাজারি থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) জাহিদুর রহমান বলেন, আমি ঢাকায় আছি, তবে আমি জেনেছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতায় একজন আটক করে থানায় আনা হয়েছে। তার বিষয়ে এখনও মামলা হয়নি। কেউ বাদী হয়ে মামলা করেনি, তবে তাকে থানায় আনা হয়েছে। সে এখন থানায় আছে।
এদিকে সাংবাদিকতা শিখতে যোগাযোগ করতে বলা ‘ছোটভাই’ মেহেদী হাসান ইমন দৈনিক সমকাল পত্রিকার চবি প্রতিনিধি। তিনি আগে ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে তিনি সাবেক চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী ‘৬৯’ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই গ্রুপের নেতা ও চবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপুর সাথে কয়েকটি কর্মসূচিতে তাকে দেখা গেছে।
সাংবাদিকতা শেখানো প্রসঙ্গে এবং ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মেহেদী হাসান ইমন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি সাংবাদিক হিসেবে অনেক ধরনের মানুষের সাথেই আমার পরিচয় এবং যোগাযোগ আছে। ছাত্রলীগ নেতা হলেও আবরার শাহরিয়ারও আমার একজন সোর্স। ওই হিসেবে তার সাথে পরিচয়।
নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীকে সাংবাদিকতা শেখানোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মুনতাছির আমার কাছে এসেছিল সাংবাদিকতা শেখার জন্য। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন সাংবাদিকতা করতে চাও। সে জানাল টাকার জন্য সাংবাদিকতা করবে। আমি বলেছি, এটা সাংবাদিকতার এথিক্সের সাথে যায় না। আমি তোমাকে মেন্টরিং করতে পারব না। তবে সে ছাত্রলীগ কর্মী এবং আবরার শাহরিয়ার তাকে পাঠিয়েছিল, এটা আজকেই জানলাম।