খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস © সংগৃহীত
বিকেল চারটা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দিনের পাঠ শেষ করে অনেক শিক্ষার্থী যখন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা বিশ্রামের পরিকল্পনা করছেন, তখন তৃতীয় বর্ষের অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী রাফির (ছদ্মনাম) দিনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তিনি ছুটে যান দৌলতপুরের একটি বাসায়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা টিউশনি শেষ করে রাতে হলে ফিরে আবার বসতে হয় নিজের পড়াশোনায়।
রাফির গল্পটি ব্যতিক্রম নয়। মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট এবং পারিবারিক আর্থিক চাপের কারণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়মিত টিউশনি, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা অন্যান্য খণ্ডকালীন কাজের সঙ্গে যুক্ত। অনেকের কাছে এগুলো কেবল অতিরিক্ত আয়ের উৎস নয়, বরং উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার পূর্বশর্ত।
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘অনেক সময় রাত পর্যন্ত টিউশনি করতে হয়। পরদিন ক্লাসে অ্যাসাইনমেন্ট দিতে না পারলে কারণটা সবাইকে বোঝানো যায় না। অনেকেই মনে করেন দায়িত্বহীনতার জন্য এমন হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য উপার্জন না করলে পড়াশোনা চালানোই কঠিন।’ শুধু টিউশনিই নয়, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের ফলে অনেক শিক্ষার্থী ফ্রিল্যান্সিংকেও আয়ের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নিশাত (ছদ্মনাম) রাতে বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ করেন। তিনি বলেন, রাত জেগে কাজ করার কারণে সকালে ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে এই কাজ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আয়ের প্রয়োজনীয়তা পূরণ হলেও দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে ক্লাসে উপস্থিতি, পরীক্ষার প্রস্তুতি, গবেষণা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণে প্রভাব পড়ে।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবাসন সংকট। বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার ২৩১ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ২ হাজার ৯১৪টি। ফলে প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। ছাত্রদের ক্ষেত্রে আবাসনের ঘাটতি আরও বেশি। উল্লেখযোগ্য অংশকে প্রতিদিন ক্যাম্পাস ও শহরের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যাতায়াত করতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ক্লাসে ভালো করা অনেক শিক্ষার্থীকেই পরে বিভিন্ন আর্থিক কারণে পিছিয়ে যেতে দেখি। ব্যক্তিগতভাবে অনেক শিক্ষক সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আরও সমন্বিত সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।’
আরও পড়ুন: চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা হবে বাধ্যতামূলক, থাকবে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি, শিক্ষক-সহকারী (টিএ), গবেষণা প্রকল্পে সহকারী (আরএ) এবং কিছু সীমিত একাডেমিক কর্মসুযোগ রয়েছে। তবে এসব সুযোগ সংখ্যায় সীমিত এবং সাধারণত নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। ফলে প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বর্ষের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিত আয়ের বিকল্প হিসেবে টিউশনি বা ক্যাম্পাসের বাইরের কাজই প্রধান ভরসা হয়ে থাকে।
শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, প্রশাসনিক সহায়তা, গবেষণা প্রকল্প, ক্যাফেটেরিয়া, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কিংবা বিভিন্ন দপ্তরে স্টুডেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট বা ক্যাম্পাস জবভিত্তিক খণ্ডকালীন কর্মসূচি চালু করা গেলে একদিকে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে কাজের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে তাদের যাতায়াতের সময় কমবে এবং একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করাও সহজ হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসভিত্তিক পার্ট টাইম কর্মসংস্থান শুধু আর্থিক সহায়তাই নয় বরং নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জনেরও একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আজও নিজেদের শিক্ষাজীবন ধরে রাখতে প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। তাদের এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয় বরং উচ্চশিক্ষায় আর্থিক সহায়তা, আবাসন এবং শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তার দিকেও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।