ভুয়া ভাউচারে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ, দুইমাসেও ব্যবস্থা নেয়নি ইবি কর্তৃপক্ষ © টিডিসি ফটো
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন এবং সাংবাদিক সংগঠনের সাথে মতবিনিময় সভার নামে ভুয়া বিলের ভাউচার দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ইবি ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের দুমাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি ইবি প্রশাসনকে।
জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন গ্রিন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ২ মে গণমাধ্যমে ‘ভুয়া বিল-ভাউচারে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র উপদেষ্টার লাখ টাকা আত্মসাৎ!’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষকদের এহেন কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ প্রশাসন বিষয়টি তদন্তে কোনো ব্যবস্থা নেননি।
জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইবির আপ্যায়ন বাজেট ছিল ১৩ লাখ টাকা। তবে প্রশাসনের অস্বাভাবিক আপ্যায়ন ব্যয়ে মাত্র ৫ মাসেই শূন্য হয়ে যায় আপ্যায়ন বাজেট। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় গতবছরের ১ জুলাই থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দপ্তরের নামে উত্তোলনকৃত আপ্যায়ন বিল যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের নামে এই অফিসের আপ্যায়ন বিল উঠেছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩২০ টাকা। যার অধিকাংশ আপ্যায়ন বিলই তোলা হয়েছে ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে আয়োজিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সাথে মতবিনিময় সভার নামে।
তথ্য মতে, গত ২২ সেপ্টেম্বর জুলাই বর্ষপূর্তি উদ্যাপন উপলক্ষ্যে ছাত্র সংগঠনের সাথে মতবিনিময় সভার বিল বাবদ ২২ হাজার ৫০ টাকা, ২৫ অক্টোবর সাংবাদিক ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় সভা বাবদ আপ্যায়ন বিলে ২২ হাজার ৫০ টাকা, এরই এক সপ্তাহ পর ২ নভেম্বরে ৩টি সভা বাবদ আপ্যায়ন বিল বাবদ ২১ হাজার ৬০০ টাকা, একই দিনে আবারও ৩টি সভার আপ্যায়ন বিল বাবদ ২১ হাজার ৪২০ টাকা, ১৭ নভেম্বর তারিখে একইসাথে ছাত্র সংগঠনের সাথে ৩টি সভার আপ্যায়ন বিল বাবদ ২২ হাজার ১৪০ টাকা এবং অর্থনীতি ও জিওগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় বাবদ ২২ হাজার ৫০ টাকা আপ্যায়ন বিল তোলা হয়েছে।
এসব বিলে ক্যাম্পাসের মেইন গেটের ইবি স্ন্যাকস দোকানের প্যাকেট প্রতি ৩০০ টাকা মূল্যের বিরিয়ানি খাওয়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া যেসব সভায় বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়নি, সেসব সভায় ঝাল চত্বরের অভি ক্যাফের ২০০ টাকা মূল্যের নাস্তার প্যাকেট দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হলেও বাস্তবে এসবের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
কিন্তু অজানা কারণে এসব ভুয়া বিল ভাউচারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পরেও প্রশাসনে দেখা গেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। উপরন্তু, প্রশাসনের এসব বিল ভাউচারের এরকম সুনির্দিষ্ট তথ্য কীভাবে সাংবাদিকের হাতে গেলো, তা জানতে চেয়ে একাউন্টস অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ডেকে ক্ষোভ ঝেড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম। এসময় পরবর্তীতে স্পর্শকাতর কোনো তথ্য ফাঁস হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তাদের শাসানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এদিকে, ছাত্রসংগঠনের নামে এ ধরনের বিল ভাউচারের সত্যতা নেই বলে তখনি নিশ্চিত করেছিলেন ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতারা। ভুয়া ভাউচারে অর্থ উত্তোলনের ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন ছাত্রনেতারা।
জানতে চাইলে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন রাহাত বলেন, সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় পরে আমি আমার জায়গা থেকে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছিলাম। যদি সংবাদের সত্যতা থাকতো তাহলে অভিযোগের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হতো, আর সংবাদটি মিথ্যা হলে সাংবাদিকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া যেতো। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপই দেখা যায়নি।
শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে আমরা কোনো মতবিনিময় সভা করিনি সেটা আমরা আগেই বলেছি। আমাদের নামে ভাউচারে বিল তোলার বিষয়টি জানার পর আমরা যথাযথ ব্যবস্থা চেয়েছিলাম কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে শুনিনি। কেন নেওয়া হয়নি সেটাও জানি না।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিউজটি প্রশাসনের নজরে এসেছে কিনা জানি না। তবে আমার নজরে এসেছে, আমি দেখেছি। তিনি বলেন, সেখানে আসলে কি হয়েছে তা যাচাই করার সুযোগটা কি? আগের ভাইস চ্যান্সেলরকে আমি বলেছিলাম যে একটি কমিটি করে দেন, বিষয়টি তদন্ত হোক, কিন্তু তিনি তা করেননি। আর বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর স্যারকে এ বিষয়ে কিছু বলিনি। ভিসি স্যার চাইলে ব্যবস্থা নেবেন।