খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গল্লামারী বধ্যভূমি স্মৃতি জাদুঘর’ © টিডিসি ফটো
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত নির্মম গণহত্যা ও নির্যাতনের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নির্মিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গল্লামারী বধ্যভূমি স্মৃতি জাদুঘর’ নির্মাণ ও হস্তান্তরের প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো উদ্বোধন করা হয়নি। প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৫ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জাদুঘর বর্তমানে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি চালু না হওয়ায় শিক্ষক, গবেষক ও সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা ও উদ্যোগ নিয়ে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনিক ভবনের পাশের পুরোনো টিনশেড স্থাপনাটিই ছিল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতনকেন্দ্র ও বধ্যভূমি। মুক্তিকামী মানুষদের ধরে এনে সেখানে নির্যাতন, হত্যা এবং নারী নির্যাতনের মতো নৃশংস ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল বলে জানা যায়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক মুনতাসির মামুন তার কিশোর মুক্তিযুদ্ধ কোষ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর গল্লামারী খাল ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ ট্রাক ভর্তি মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয়, ওই এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
এই ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০২২ সালের মে মাসে তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. মাহমুদ হোসেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতিতে টর্চার সেলটিকে ‘গল্লামারী বধ্যভূমি স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। একই বছরের জুলাই মাসে চুক্তির মাধ্যমে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে মেসার্স আনিসা এন্টারপ্রাইজ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা যায়, জাদুঘরের ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৬ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫৫ টাকা। পরে ল্যান্ডস্কেপিং কাজের জন্য ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে ব্যয় হয় ৬১ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যশোরের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ল্যান্ডস্কেপিংয়ের কাজ পায় এবং ২০২৪ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। সব মিলিয়ে প্রকল্পে ব্যয় হয় ১ কোটি ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৫ টাকা।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, জাদুঘরের মূল ফটকে ঝুলছে তালা। চারপাশে নীরবতা, দর্শনার্থীশূন্য পরিবেশ। প্রদর্শনী কক্ষগুলোও এখনো খালি পড়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের ছবি, দলিল ও স্মৃতিচিহ্ন প্রদর্শনের পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রদর্শনী সামগ্রী স্থাপন করা হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে অব্যবহৃত থাকায় স্থাপনাটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাদুঘরের নকশাকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক এস এম নাজিমউদ্দিন বলেন, পুরোনো টিনশেড ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই ভাবনা থেকেই এমন একটি নকশা তৈরি করা হয়, যেখানে ১৯৭১ সালের নির্যাতন ও বেদনার প্রতীকী উপস্থাপন ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন ছবি ও স্মৃতিচিহ্ন প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। জাদুঘরটি প্রায় প্রস্তুত। এখন শুধু কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের অপেক্ষা।
তিনি আরও বলেন, যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে স্থাপনাটি অন্তত ৫০ বছর টেকসই থাকবে।
খুলনা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির গভীর সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হারুণ চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালে এই ভবনটি ছিল একটি বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্র। হাজার হাজার মানুষ সেখানে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, জাদুঘরটি দ্রুত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। প্রয়োজনে একজন কিউরেটর নিয়োগ দিয়ে খুলনা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকালীন ছবি, দলিল ও নিদর্শন সংগ্রহ করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও পাঠচর্চার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মো. সাইফুল আলম বাদশা বলেন, ল্যান্ডস্কেপিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এখন প্রদর্শনীর জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ বসানো হলেই জাদুঘরটি চালু করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে যেকোনো সময় এটি উদ্বোধন করতে পারবে।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠার দুই বছর পরও জাদুঘরটি উদ্বোধন না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, বিষয়টি আমাকে আগে জানানো হয়নি। সেখানে কতটুকু কাজ হয়েছে সেটিও আমি ভেতরে গিয়ে দেখিনি। আমরা বিষয়টি দেখবো, কীভাবে কী করা যায়।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবশ্যই সংরক্ষণ করা হবে। সেখানে একটি লাইব্রেরি স্থাপনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। ফাইল পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর বছরের পর বছর তালাবদ্ধ পড়ে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহল। তাদের মতে, কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও যদি সেটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত না হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।