খুবির শোক দিবস: কটকা ট্রাজেডিতে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীদের স্মরণ

১৩ মার্চ ২০২৬, ০২:১৯ PM
 কটকা ট্রাজেডিতে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীরা

কটকা ট্রাজেডিতে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীরা © সংগৃহীত

আজ ১৩ মার্চ। ২২ বছর আগের এই দিনে সুন্দরবনের কটকায় সফরে গিয়ে সমুদ্রের পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের নয়জন এবং বুয়েটের দুজনসহ মোট ১১ জন শিক্ষার্থী।

সন্তানসম শিক্ষার্থীদের হারানোর ওই দিনটিকে স্মরণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর দিনটিকে ‘কটকা ট্র্যাজেডি দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।

সেই পরিক্রমায় আজ (শুক্রবার) শোকাবহ আবহে বিভিন্ন আয়োজনের ভেতর দিয়ে হারানো সন্তানদের স্মরণ করছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্টরা।

২০০৪ সালের ১২ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্থাপত্য বিভাগের ৭৮ জন শিক্ষার্থী ও ২০ জন অতিথি খুলনা থেকে সুন্দরবন সফরে যান। ১৩ মার্চ দুপুরে কটকা সমুদ্র সৈকতে গোসলে নেমে ভাটার টানে তলিয়ে যান অনেকে। পরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওই ১১ জনের মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়জন হলেন- আরনাজ রিফাত রূপা, মো. মাহমুদুর রহমান, মাকসুমুল আজিজ মোস্তাজী, আব্দুল্লাহ হেল বাকী, কাজী মুয়ীদ বিন ওয়ালী, মো. কাওসার আহমেদ খান, মুনাদিল রায়হান বিন মাহবুব, মো. আশরাফুজ্জামান এবং মো. তৌহিদুল এনাম। এছাড়া বুয়েটের দুই শিক্ষার্থী ছিলেন সামিউল ও শাকিল।

কী ঘটেছিল সেদিন

২০০৪ সালের ১২ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের ৭৮ জন ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের ২০ জন অতিথি নিয়ে খুলনা থেকে রওনা দেন সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে। সারারাত লঞ্চযাত্রা শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা কটকার নিকটবর্তী বাদামতলী এলাকায় পৌঁছান। বেলা ১টার দিকে তারা গভীর অরণ্য পেরিয়ে কটকা সৈকতে পৌঁছে যান। 

আধোঘুমে কেটে যাওয়া সারারাত ভ্রমনের ক্লান্তি যেন দূর করে দেয় অকুল সমুদ্রের ঢেউ। অনেকে হাটাহাটি করতে শুরু করেন সাগর পাড়ে, কয়েকজন দল বেধে বল খেলছেন হাঁটুপানিতে। কেউবা আবার নেমে পড়েন সমুদ্রে গোসলের জন্য। আনন্দে উল্লাসে মেতে উঠে তারা। 

হঠাৎ কানে এসে পৌঁছায় আত্নচিৎকার। তিন-চার জন শিক্ষার্থী ভাটার স্রোতের কবলে পড়েন। তাদের ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকারে পরিবেশ হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে এক অসহনীয় দৃশ্য। একটু দূরে সাগরের ঢেউয়ের ওপর কালো কালো কয়েকটা মাথা দেখা যাচ্ছে, আর তাদের উঁচু করা বাঁচতে চাওয়া হাতগুলো ভাটার টানে ভেসে যাচ্ছে আরো গভীরে। কিন্তু কারো যেন করার কিচ্ছু নেই। 

কেউ কেউ ছুটে গেলে তাদের দিকে। পাশের কাউকে একটু ওপরে এনেই আবার ছুটে যান অন্যকে উদ্ধারে। কারো চেষ্টা সফল হলেও অনেকেরই উদ্ধার সম্ভব হয়নি। যারা কোনমতে বেঁচে ফিরে এসেছেন, তারা বালুর ওপর শুয়ে পড়ে হাপাচ্ছিলেন, আর বমি করছিলেন। রুপা ও কাউসারকে তারা উদ্ধার করে আনলেও ততক্ষণে তারা আর নেই। চোখের সামনে প্রিয় সহপাঠীদের করুণ মৃত্যুর দৃশ্য দেখে অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

সাগরে ভেসে থাকা মুখগুলো আর দেখা যায়নি। গাছের ডাল আর লুঙ্গি দিয়ে স্ট্রেচার বানিয়ে কাউসার আর রূপাকে নিয়ে সবাই ফিরে আসেন লঞ্চঘাটের দিকে। অসহ্য যন্ত্রণা, চুপচাপ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে সবাই। তখনো কেউ জানে না কতজনকে ফেলে এসেছে তারা। 

লঞ্চে এসে এক এক করে নাম ধরে ডাকা হচ্ছে সবাইকে। খুঁজে না পেলে ধরে নেয়া হচ্ছে তাদেরকে গ্রাস করে নিয়েছে সাগর। শেষে দেখা যায় ৯ জনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাগর গ্রাস করে নিয়েছে ১১টি তরতাজা প্রান। এর মধ্য খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের নয়জন আর বাকি দু’জন বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। 

লঞ্চ চলতে শুরু করল খুলনার দিকে। নীচতলায় দুটি নিথর দেহ চাদরে ঢেকে রাখা। কেউ বসে, কেউ রেলিংয়ে হেলান দিয়ে, কেউ শুয়ে সবাই চুপচাপ। মাঝে মাঝে ডুকরে কেদে উঠছেন কেউ কেউ। এমন পরিবেশ যেন সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ নেই।

যাদের হারিয়ে এসেছিলেন

 তৌহিদুল এনাম (অপু): চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া অপু (পৈত্রিক নিবাস ফেনী) মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল, ঢাকা ও ঢাকা আইডিয়াল কলেজ শেষে ভর্তি হয় খুবির স্থাপত্য ডিসিপ্লিনে। চমৎকার আবৃতি করতেন। লেখালেখিও করতেন। খুবির প্রথম নাট্য সংগঠন নৃ-নাট্যের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম সদস্য।

আব্দুল্লাহ-হেল বাকী: খুলনা পাবলিক কলেজে স্কুল এবং খুলনা সুন্দরবন কলেজে শিক্ষা শেষে খুবির স্থাপত্য ডিসিপ্লিনে ভর্তি হন। ভালো ছড়া লিখতে পারতেন। বই পড়া ও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন।

কাজী মুয়ীদ ওয়ালি (কুশল): আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা তে স্কুল জীবন পরে কোডা কলেজ অব অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট কলেজ শেষে খুবিতে। ভালো ছবি আকতে পারতেন, বই পড়তেন। মেডিটেশন করতেন নিয়মিত।

মো. মাহমুদুর রহমান (রাসেল): চট্টগ্রাম কলিজিয়েট স্কুল ও চট্টগ্রাম হাজী মো. মহসীন কলেজ শেষে খুবিতে। জন্মস্থান চাঁদপুর। টেবিল টেনিস খেলা পছন্দ করতেন। 

মো. আশরাফুজ্জামান তোহা: স্কুল-কলেজ কাটিয়েছেন হারম্যান মাইনার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মিরপুর, ঢাকাতে। জন্মস্থান ছিল যশোরে। ভাল গাইতেন এবং গীটার বাজাতেন।

আরনাজ রিফাত রূপা: জন্ম ঢাকায়। স্কুল কেটেছে কাকলী বিদ্যালয় এবং কলেজ বদরুন্নেছা কলেজ, আজিমপুর ঢাকায়। ভালো রান্না পারতেন, অন্যকে রেধে খাওয়াতে পছন্দ করতেন।

মাকসুমমুল আজিজ মোস্তাজী (নিপুন): জন্ম দিনাজপুরে। স্কুল কেটেছে দিনাজপুর জিলা স্কুলে পরে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে। সর্বদা হাশিখুশি থাকতেন। ভালো কবিতা আবৃতি করতেন ও লিখতেন। বিতর্ক ও আড্ডায় তার জুড়ি ছিল না। 

মো. কাউসার আহমেদ খান: স্কুল বনানী বিদ্যা নিকেতনে পরে পাবনা ক্যাডেট কলেজ। জন্ম ঢাকায়। কম্পিউটারে গেমস খেলতে পছন্দ করতেন। স্বল্পভাষী ছিলেন, বই পড়তেন আর ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতেন।

মুনাদিল রায়হান বিন মাহবুব শুভ: জন্মস্থান যশোরে। স্কুল-কলেজ কেটেছে দাউদ পাবলিক স্কুল ও কলেজ, যশোরে। বই পড়তেন খেলাধূলা করতেন। ঘুরে বেড়ানো ছিল তার শখ।

শামসুল আরেফিন শাকিল: বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশুনা করতেন। স্কুল কেটেছে টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরে নটরডেম কলেজে। তিমি ছিলেন ভ্রমণপ্রিয়। দেশের প্রায় ৪০টি জেলা ভ্রমণ করেছেন। অকাতরে বন্ধুদের সুখে-দুখে পাশে দাঁড়াতেন। কটকা সৈকতে দুর্ঘটনায় ১১জনকে উদ্দেশ্য করে টঙ্গীতে তাঁর বাবা একটা স্মৃতিসৌধ করেছেন।

সামিউল হাসান খান: আইডিয়াল প্রি-ক্যাডেট স্কুল কলেজ, ঢাকা ও নটরডেম কলেজ শেষে পড়াশুনা করতেন বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে। জন্মস্থান ঢাকায়। সাধারণ জ্ঞান ভাল পারতেন, বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় অংশ নিতেন। কবিতা লিখতেন।

প্রতিবছর এ দিনটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সকাল ১০টায় কটকা স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, বাদ জুম্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দোয়া মাহফিল এবং সন্ধ্যায় এতিমদের সাথে ইফতার ও নৈশভোজ।

ক্রিকেটারদের জন্য নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে বিসিবি, ইঙ্গিত দিলেন ত…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রাজি…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
ঢাবিতে শিবিরের দেওয়া এসি বন্ধ করে দিয়ে প্রশাসন বলছে ‘অননুমো…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
একই রাস্তা সকালে উদ্বোধন করলেন জামায়াতের এমপি, বিকেলে বিএনপ…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের বিরুদ্ধে তৃতীয় স্ত্রীর মামলা
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
৩০০ পরীক্ষার্থীর ২৪৭ জনই ফেল, শিক্ষকদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানি…
  • ০২ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950