খুবির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের ভাবনা
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থী © টিডিসি সম্পাদিত
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ক্যাম্পাসে প্রতিদিনের ক্লাস, সেমিনার আর সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাংলা ও ইংরেজির ব্যবহারই প্রধান। কিন্তু এই পরিচিত ভাষার ভিড়ে কিছু শিক্ষার্থীর মনে নীরবে প্রশ্ন জাগে তাদের নিজস্ব মাতৃভাষার অবস্থান কোথায়? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে কিংবা নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খুবির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করেন, মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে অধ্যয়নরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীরা জানান, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের মাতৃভাষা শেখা বা চর্চার সুযোগ সীমিত। ফলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
আইন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী জন জিদান টুডু বলেন, ‘আমি সাঁওতাল পরিবারে বড় হয়েছি। বাসায় সাঁওতালি ভাষায় কথা বলি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পুরোপুরি বাংলা ও ইংরেজিতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক সময় মনে হয়, আমার নিজের ভাষায় ভাবার সুযোগটাও যেন কমে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ভাষা শেখার জন্য যদি কোনো ঐচ্ছিক কোর্স বা সাংস্কৃতিক কর্মশালা থাকত, তাহলে আমরা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকতে পারতাম।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রহিলা চিং মারমা বলেন, ‘আমি বাসায় মারমা ভাষায় কথা বলি, কিন্তু শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে বাংলায়। ফলে দুই ভাষার মাঝখানে এক ধরনের ভারসাম্য রাখতে হয়।’
তার মতে, মাতৃভাষা মানুষকে নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা নিজের ভাষায় গান গাই বা গল্প বলি, তখন একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি বিভিন্ন মাতৃভাষার শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাষাভিত্তিক অনুষ্ঠান হতো, তাহলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া আরও বাড়ত।’
অন্যদিকে, ড্রয়িং এন্ড পেন্টমেকিং ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী পুষ্পিতা ত্রিপুরা মনে করেন, ভাষা রক্ষার দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির নয়, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমরা বন্ধুদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ত্রিপুরা ভাষায় কথা বলি। কিন্তু লিখিত চর্চা নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষা দিবস বা ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়মিত হতো, তাহলে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়ত।’
ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে একটি সংস্কৃতির ইতিহাস ও জ্ঞানভান্ডারের বিলুপ্তি। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বেশ কয়েকটি ভাষা প্রজন্মান্তরে কম ব্যবহার হওয়ায় সংকটে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি তুলে ধরলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষার চর্চা এখনো সীমিত পরিসরে। শিক্ষার্থীদের মতে, প্রশাসনিক সহায়তা ও পাঠ্যক্রমভিত্তিক উদ্যোগ থাকলে ভাষা সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
মাতৃভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি একটি জাতিগোষ্ঠীর স্মৃতি, অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের ধারক। খুবির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীরা চান, তাদের ভাষাও যেন ক্যাম্পাসের বানান সঠিক নয় বহুভাষিক বাস্তবতায় সমান মর্যাদা পায়। ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষা পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ও হয়ে উঠবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক।