বাংলাদেশে টেক্সটাইল শিল্পে পরিবেশবান্ধব নতুন দিগন্তের সূচনা বুটেক্সের গবেষকদের

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০২ AM
বুটেক্সের গবেষকবৃন্দ

বুটেক্সের গবেষকবৃন্দ © টিডিসি ফটো

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি টেক্সটাইল শিল্প। তবে এই শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে শিল্প-কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানি বা ‘ইফ্লুয়েন্ট’ দেশের নদী-নালা, খাল-বিল ও সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিকভাবে যখন এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির সন্ধান চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) একদল গবেষক দেখিয়েছেন সম্ভাবনাময় নতুন দিক।

টেক্সটাইল খাতে ব্যবহৃত রঙের মধ্যে ক্ষতিকর এজো ডাইয়ের ব্যবহার প্রায় ৮০ শতাংশ। ডায়িং প্রক্রিয়া শেষে এ ডাই-যুক্ত বর্জ্য পানি সরাসরি পরিবেশে নিঃসৃত হয়, যা নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট করে, মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি করে, কৃষিজমির উর্বরতা কমায় এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বহু বছর ধরে বিশ্বজুড়ে এজো ডাই দূষণ নিয়ন্ত্রণে গবেষণা হলেও কার্যকর ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সমাধান খুব সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে বুটেক্সের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু মোহাম্মদ আজমল মোর্শেদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বুটেক্সের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় ক্ষতিকর এজো ডাইকে একটি বিশেষ কেটালিস্ট ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ভেঙে বর্ণহীন ও তুলনামূলকভাবে অক্ষতিকর অ্যারোমেটিক অ্যামিন ও অ্যালকোহলে রূপান্তর করা হয়। উৎপাদিত উপাদানগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে প্রসাধনী ও ওষুধ শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব, যা বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের একটি কার্যকর উদাহরণ।

এই গবেষণায় সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মোতাকাব্বির হাসান। গবেষক দলে আরও ছিলেন বুটেক্সের ইয়ার্ন ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৬ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. রফিকুল ইসলাম, টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইস্তেখারুল অনয়, রসায়ন বিভাগের ল্যাবের কারিগরি কর্মকর্তা মো. কামারুজ্জামান এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইন্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলোজি'র টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী  জীবন কুমার মোহান্তা (স্নাতকোত্তর)।

গবেষণা উদ্যোগটির মূল পরিকল্পনা ও প্রেরণা আসে ড. আজমল মোর্শেদের কাছ থেকেই। টেক্সটাইল শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দেশে এজো ডাইয়ের ডিগ্রেডেশন ও পুনঃব্যবহার নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা আগে তেমন দেখা যায়নি। গবেষক দলটি ডাইয়ের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে একটি কার্যকর প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করে, যা পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি শিল্পে টেকসই কাঁচামাল ব্যবহারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

গবেষণায় ‘ফেন্টন অ্যাডভান্সড অক্সিডেশন প্রসেস’ প্রয়োগের মাধ্যমে বর্জ্য শোধন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রার সারফ্যাক্ট্যান্ট ব্যবহারে পানি শোধনের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. মোতাকাব্বির হাসান বলেন, "আমরা দেখিয়েছি যে 'ফেন্টন অ্যাডভান্সড অক্সিডেশন প্রসেস' ব্যবহার করে বর্জ্য শোধন প্রক্রিয়াকে আরও কয়েক গুণ শক্তিশালী করা সম্ভব। নির্দিষ্ট মাত্রার সারফ্যাক্ট্যান্ট ব্যবহারের ফলে পানি শোধন করার দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।

কেমিস্ট্রি বিভাগের টেকনিক্যাল অফিসার মো: কামরুজ্জামান যোগ করেন, ডাই ডিগ্রেডেশন কাইনেটিকস এর ওপর এই কাজটি একেবারেই নতুন। বুটেক্সের কেমিস্ট্রি ল্যাবেই গবেষণার অধিকাংশ বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

তবে এই গবেষণার পথটি গবেষকদের জন্য সহজ ছিল না। এ বিষয়ে বুটেক্সের ইয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, শিল্প-কারখানা থেকে বর্জ্য নমুনা সংগ্রহে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠানের অনীহা দেখা যায়। পাশাপাশি ল্যাব সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু পরীক্ষার জন্য নমুনা বাইরে বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমাদের নিরলস প্রচেষ্টায় কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

গবেষক দলের বুটেক্সের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইস্তেখারুল অনয় বলেন, যথাযথ দিকনির্দেশনা, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও গবেষণার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বুটেক্সের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। তার মতে, সীমিত সুবিধার মধ্যেও মানসম্মত গবেষণা করা সম্ভব।

ডুয়েটের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও গবেষক দলের সদস্য জীবন কুমার মোহান্তা মনে করেন, এ ধরনের গবেষণা দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে। স্বল্প সুবিধার মধ্যে ভালো গবেষণা অসম্ভব নয়। বর্তমান প্রকল্পটি তারই একটি উদাহরণ।

ড. আবু মোহাম্মদ আজমল মোর্শেদ বলেন, এই কাজের সাফল্য দেশে গবেষণার মান বৃদ্ধিতে নতুন দিক খুলবে। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ দিলে এ দেশের টেক্সটাইল খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

গবেষণার এই সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পেয়েছে। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি (এসিএস)-এর জার্নাল এসিএস ওমেগা-তে ১৬ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রটি গত ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। যা দেশের টেক্সটাইল গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বুটেক্স গবেষকদের এই সাফল্য প্রমাণ করে বাংলাদেশের গবেষণা সক্ষমতা ও মেধা আন্তর্জাতিক মানে প্রতিযোগিতা করার যোগ্য। তবে এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে শিক্ষা ও গবেষণা কাঠামোয় আরও বিনিয়োগ, আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং শিল্প-একাডেমিয়া সমন্বয় জোরদার করা জরুরি।

বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ও প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগই পারে আগামীর দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে। যারা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

 

ট্যাগ: বুটেক্স
জুলাইয়ের কৃতিত্ব কোনো দলের নয়, জনগণের সম্মিলিত অর্জন: জ্বাল…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
জামায়াত-বিএনপিতে থাকা শরিকসহ ৭ ইসলামী দলের নতুন জোটের আভাস,…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
ময়মনসিংহে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
দোয়া করেও কেন পূরণ হয় না সব চাওয়া? কোরআন-হাদিসের আলোকে ব্যা…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ডস ব্যানার কাণ্ডে নড়েচড়ে বসছে ফিফা
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence