হৃদ্যতাপূর্ণ বার্তা প্রেরণে চিঠির যুগ; আধুনিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে 

২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৪ PM
বৃত্ত কুবির আঁকা চিঠি চত্ত্বর

বৃত্ত কুবির আঁকা চিঠি চত্ত্বর © টিডিসি ফটো

একসময় খবর আসত খামে ভরে। কাগজের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকত অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা আর অদ্ভুত এক সুখ। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি মানেই ছিল সম্পর্ক দূরে থেকেও কাছে আসা। আজ সেই ঘণ্টা আর শোনা যায় না। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নোটিফিকেশন আমাদের জানিয়ে দেয় মেসেজ এসেছে। কিন্তু তাতে থাকে না হৃদয়ের টান।

চিঠি ছিল সময়কে ধরে রাখার এক শৈল্পিক সৃষ্টি। কলমের কালি শুকাতে শুকাতে, শুকিয়ে যেত মনখানাও। চিঠি লিখতে সময় লাগত, ভাবতে হতো, শব্দ বাছতে হতো, ভুল হলে কেটে আবার লিখতে হতো। সেই ভুলগুলোই আজ সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি। এখন একটি ভুল মানেই ‘ডিলিট’।

কবি বুদ্ধ দেব বসু বলেছিলেন, স্মৃতির রঙিন কাঁচের ভিতরে অতীত রোমন্থন করা হয় ভালোবাসা নিয়ে চিঠিতে ছিল ভুল বানান, কাটা দাগ, এলোমেলো হাতের লেখা কিন্তু সেখানেই ছিল হৃদ্যতা। এখন ভাষা নিখুঁত তবে অনুভূতিগুলো রোবটিক।

ইলেক্ট্রো মেসেজ আমাদের যোগাযোগকে দ্রুত করেছে, তবে হারিয়ে যাচ্ছে ভালোবাসা মাখানো হাতে লেখা চিঠি। ‘ভালো আছি’ লেখার আগে আর কেউ জানালার ধারে বসে তেপান্তরের মাঠের দিকে চেয়ে ভাবেন না, আসলে ভালো থাকা মানে কী! ইমোজির হাসি আছে, কিন্তু চোখের কোণে জমে থাকা জলের ফোঁটা পড়ে আর চিঠির পাতা ভিজে না। ‘লাভ ইউ’ এখন দুই সেকেন্ডের কাজ, অথচ একসময় এই তিনটি শব্দ লিখতে মানুষের হৃদয় কেঁপে উঠত।

চিঠিতে ছিল স্পর্শ, কাগজে লেগে থাকত প্রেরকের হাতের উষ্ণতা। কেউ কেউ চিঠির ভেতরে শুকনো ফুল রাখত, কেউ পারফিউমের হালকা ঘ্রাণ। হুমায়ুনের লেখা 'দেয়াল' উপন্যাসে যখন অবন্তিকে তার মা ইসাবেলা ইউরোপ থেকে চিঠি পাঠাতো তখন সেখানে থাকতো মায়ের হাতের স্পর্শ, শরীরের ঘ্রাণ এবং ভালোবাসা। সেই চিঠি বহুবার পড়া হতো, ভাঁজ খুলে আবার ভাঁজ করা হতো, বুকের ভেতর রেখে দেওয়া হতো প্রতিটি শব্দ। 

আজকের মেসেজগুলো কোথায় থাকে? ইনবক্সে? নাকি হার্ডডিস্কের কোনো অচেনা ফোল্ডারে, একদিন হঠাৎ মুছে যায়। হোয়াটসঅ্যাপের এনক্রিপ্টেড সিস্টেমের কারণে কত-শত আবেগ অনুভূতি মুছে যায় এক ঝলকেই।

সুহাসিনীর প্রেম পত্র, মায়ের আদরের চিঠি, প্রবাসীর দীর্ঘশ্বাস ভরা চিঠি কিংবা যুদ্ধের ময়দান থেকে সোলজারের লেখা শেষ চিঠি— এসবই ছিল একটি প্রাণের সাথে আরেকটি প্রাণের হৃদ্যতার ইতিহাস। কবি আল মাহমুদ লিখেতো তার বন্ধু শামসুর রহমানকে, নজরুল লিখতো বিচ্ছেদ হওয়া প্রিয়ষী নাসরিনকে আবার কবি ফররুখ লিখেছে ভয়ংকর সুন্দরতম নদী পদ্মাকে উদ্দেশ্য করে। 

একটা সময় ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা মনের অব্যক্ত কথা প্রকাশ করতো চিঠিতে। গভীর রজনীতে হলে বসে, টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে, খাতার পাতা ছিঁড়ে লেখা হতো দীর্ঘ চিঠি। পরীক্ষার টেনশন, বন্ধুত্বের অভিমান, প্রথম প্রেমের সংকোচ সব জায়গা পেত কাগজে। এখন সেসব অনুভূতি আটকে যায় টাইপিং বক্সে, যেখানে শব্দের জায়গা কম, ধৈর্য আরও কম।

আজকের বিশ্ববিদ্যালয়জীবন ভীষণ ব্যস্ত। অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, পার্টটাইম কাজ, রাজনীতি, সব মিলিয়ে সময় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চিঠি কি সময় নিত, নাকি সময় তৈরি করত!

চিঠি লিখতে বসা মানেই ছিল নিজেকে থামানো। আর আমরা থামতে ভুলে গেছি। ব্যস্ততার আবর্তে নিজেকে বেষ্টিত না করে মনকে মুক্ত পাখির মতো ছেড়ে দেয়া যেতো চিঠি লিখার সময়ে। একদা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা টিউশন থেকে ফিরে এসে ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহ নিয়ে জীবন সংগ্রামের গল্প লিখে পাঠাতো তার মায়ের কাছে, প্রিয় মানুষটির কাছে। একটা চিঠির জন্য থাকতো দীর্ঘ অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার মধ্যেই তৈরি হতো বিশ্বাস, দায়িত্ব, অনুভূতি।

কুবিতে আছে চিঠিচত্তর। যেখানে 'বৃত্ত কুবি' এঁকেছে 'প্রতিদিন চিঠি দিও'। লাল রঙের ডাক বক্সটা অপেক্ষা করছে প্রতিনিয়ত। ইলেক্ট্রো মেসেজ সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করতে পারে না; তা কেবল আপডেট হয়, সংরক্ষিত হয় না হৃদয়ে। তবু সময়ের দোষ দিয়ে সব দায় এড়ানো যায় না। আমরা নিজেরাই চিঠি লেখা ভুলে গেছি। ব্যস্ততার অজুহাতে অনুভূতিকে ছোট করে এনেছি স্ক্রিনের মাপে। অথচ, একটি চিঠি লেখা মানেই নিজেকে স্থির করা, মনকে শোনা, কাউকে গুরুত্ব দেওয়া।

হয়ত চিঠি আর ফিরে আসবে না আগের মতো। ডাকবাক্সগুলো জং ধরবে, খামের জায়গা নেবে ইনবক্স। কিন্তু চিঠির সাথে মানুষের বন্ধন রয়ে যাবে অমলিন। 

একদিন যদি কেউ আবার কলম হাতে নেয়, সাদা কাগজে লিখে ফেলে, 'তোমাকে অনেক দিন ধরে মনে পড়ছে' — তখন সব যান্ত্রিকতা ছেড়ে আবারও ডুব দিতে হবে সেই নস্টালজিয়ায়।

প্রাথমিকে এক বিদ্যালয়ের ৫৩ পরীক্ষার্থীর ৫২ জনই বৃত্তি পেল
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী, কার হাতে উঠছে এবারের বিশ্বকা…
  • ১৩ জুলাই ২০২৬
দুই স্ত্রী নিয়ে ইয়াবাসহ স্বামী আটক, ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদ…
  • ১২ জুলাই ২০২৬
জুলাইকে ব্যঙ্গ করে এবার চবি অধ্যাপকের পোস্ট
  • ১২ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপ হারায় কোচকে বরখাস্ত করল সেনেগাল
  • ১২ জুলাই ২০২৬
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড মহারণ: কী বলছে অপ্টা সুপারকম্পিউটার?
  • ১২ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence