প্রতীকী ছবি © এআই সম্পাদিত ছবি
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী বা আয়ভিত্তিক কাজে যুক্ত। একই সঙ্গে পুরুষের তুলনায় নারীর আয় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কম। প্রায় সব খাতেই নারী-পুরুষের এ মজুরি বৈষম্য বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান
প্রবণতা, কারণ ও নীতিগত করণীয় শীর্ষক প্রতিবেদনটি গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি। তবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এ বৈষম্যের হার কিছুটা কম।
আইএলও বলছে, শুধু শিক্ষা, পেশা ও খাতের ভিন্নতা দিয়ে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানের বড় অংশ ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং মজুরি নির্ধারণের দুর্বলতা, কম মজুরির কাজে নারীদের বেশি অংশগ্রহণ, গৃহস্থালির কাজের বাড়তি চাপ এবং সামগ্রিকভাবে কম মজুরির শ্রমবাজারের মতো কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কারণ এ বৈষম্যের পেছনে ভূমিকা রাখছে।
কর্মসংস্থানেও বড় ব্যবধান
২০২৩ সালে বাংলাদেশে পুরুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হারের ব্যবধান ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
কর্মরত নারীদের মাত্র ১৯ শতাংশ মজুরিভিত্তিক কর্মী। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৪৮ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী হলেও তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী বা অন্যান্য আয়ভিত্তিক কাজে যুক্ত।
নারীরা তুলনামূলকভাবে কম মজুরির পেশায় বেশি কাজ করেন। তাদের মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের ৪১ শতাংশ উৎপাদন খাতে, ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি কাজে এবং ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে। পুরুষদের ক্ষেত্রে উৎপাদন খাতে এ হার ২৩ শতাংশ।
ব্যবস্থাপনা পর্যায়েও নারীর অংশগ্রহণ কম। দেশের ব্যবস্থাপনা পদে কর্মরতদের মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ নারী। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার গড়ে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বিশ্বে ৩০ শতাংশ।
গৃহস্থালির কাজেও নারীর বাড়তি চাপ
আইএলওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গৃহস্থালির কাজে বেশি সময় দেওয়ার কারণে নারীদের উচ্চ মজুরির কাজ নেওয়া এবং ক্যারিয়ারে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
বাইরে কাজ করার পাশাপাশি নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ সময় মাত্র ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা। কর্মক্ষেত্রে পুরুষরা সপ্তাহে গড়ে ৫১ দশমিক ৯ ঘণ্টা এবং নারীরা ৪৬ ঘণ্টা কাজ করেন।
আরও দেখুন: নদীতে নেই ইলিশ, কিন্তু জেলেদের আছে ঋণের কিস্তি, চোখে দুশ্চিন্তার ঢেউ
কর্মজীবী নারীদের ৭৭ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৯০ শতাংশ।
সমমজুরি নিশ্চিত করার সুপারিশ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান শুধু একই কাজের জন্য ভিন্ন মজুরির কারণে তৈরি হচ্ছে না। নারীরা যেসব কাজে বেশি অংশগ্রহণ করেন, সেসব কাজের মূল্যায়নে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত রয়েছে কি না, বর্তমান মজুরি নির্ধারণ ব্যবস্থায় তা স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা হয় না।
এ অবস্থার পরিবর্তনে আইএলও একই ধরনের কাজের জন্য সমান মজুরির নীতি কার্যকর করা, কাজের মূল্যায়নে নিরপেক্ষ পদ্ধতি চালু এবং ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে লিঙ্গবৈষম্য বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটির বিধান পুনর্বিবেচনা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধ নিশ্চিত করা এবং শ্রম পরিদর্শন ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মজুরির এই বৈষম্য মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
তিনি বলেন, কৃষিসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক সব খাতেই এ ধরনের মজুরি বৈষম্য রয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ঘোষণা দিয়ে পুরুষ শ্রমিকের অর্ধেক মজুরি নারী শ্রমিককে দেওয়া হয়। এ বৈষম্যের কারণে নারীরা পারিবারিকভাবেও নিগৃহীত হন।
মজুরি বৈষম্য কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে একটি জাতীয় মজুরি কাঠামো গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি শ্রমিকদের তথ্য ব্যাংক ও পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা এবং জেলা পর্যায়ে শ্রমবিষয়ক অভিযোগের প্রতিকার দিতে সরকারি নির্দিষ্ট দপ্তর প্রতিষ্ঠার সুপারিশের কথাও জানান তিনি।